আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী © টিডিসি সম্পাদিত
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো তথা পে স্কেল আগামী মাস থেকেই কার্যকর হচ্ছে। যদিও নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে অতিরিক্ত কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তব্যে স্পষ্ট ঘোষণা দেবেন। তাদের ভাষ্য, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে বলা হয়েছে, ‘সরকারি কর্মচারীরা প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোর অধীনে বেতন-ভাতা পেয়ে আসছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই সরকারি কর্মচারীদের জন্য আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট বেতন-ভাতা বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে।’
তবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে অতিরিক্ত কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। প্রস্তাবিত বাজেটে এ খাতে মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্যাডার কর্মকর্তাদের বেতনের জন্য ১৩ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা, কর্মচারীদের বেতনের জন্য ৩০ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতার জন্য ৪৪ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৪ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৮৪ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই নতুন বেতন কাঠামো আংশিকভাবে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মূল বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ কার্যকর করা হতে পারে। তবে অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের গঠিত পে কমিশনের সুপারিশ হুবহু বাস্তবায়ন করা হবে না।
পে কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো পর্যালোচনার জন্য সরকার একটি সচিব কমিটি গঠন করেছে। কমিটি এখনো তাদের চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দেয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সচিব কমিটি প্রস্তাবিত বেতন কাঠামো সংশোধন করে বেতন বৃদ্ধির হার কিছুটা কমানোর সুপারিশ করতে পারে। তবে জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হলেও অর্থের কোনো সংকট হবে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন খাতে রাখা থোক বরাদ্দ এবং অপ্রত্যাশিত ব্যয় খাতের অর্থ ব্যবহার করে নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয় মেটানো হবে। এ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাস্তবায়ন ৩ ধাপেই
পুরো নতুন বেতন কাঠামো একসঙ্গে কার্যকর না করে তা তিনটি অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। আগামী জুলাই মাস থেকেই সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেসিক বেতনের অর্ধেক অংশ পেতে শুরু করবেন। পরবর্তী অর্থবছরে বাকি অর্ধেক বেসিক কার্যকর করা হবে। এরপর ২০২৮-২০২৯ অর্থবছরে নতুন পে-স্কেলের আওতায় নির্ধারিত বিভিন্ন ভাতা ও সুবিধা ধাপে ধাপে চালু করা হবে। সূত্রের তথ্য, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর যে বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হবে, তা মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই নবম পে স্কেলটি এককালীন না করে মোট তিন ধাপে (৩ পর্যায়) বাস্তবায়নের কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।
সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসও জানিয়েছে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণা আসতে পারে। লাইসেন্স, অনুমোদন ও কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনার পাশাপাশি ‘বাংলাবিজ’ নামে একটি সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। অর্থবিভাগ জানিয়েছে, এর মাধ্যমে ব্যবসাসংক্রান্ত সেবাগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আসতে পারে আজকের বাজেটে। এছাড়া বাজেটে দেশের ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য 'ই-হেলথ কার্ড' কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে।তবে এরপরেও দেখার বিষয় হবে যে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার খাতে এখন সরকারকে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সেই চাপ সামলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির গতি ত্বরান্বিত করতে সরকার বাজেটে কী পদক্ষেপ নেয়। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
এসব ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয় বাড়াতে সরকার কী পদক্ষেপ নেয় সেদিকেও দৃষ্টি থাকবে অনেকের।