জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
দীর্ঘ এক দশক আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল হিসেবে বিশ্বমানের নতুন ক্যাম্পাস পেতে যাচ্ছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা। ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত আবাসিক হলসহ নানা মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে আসছেন। এ আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ সবার; যা সফল করতে দিতে হয়েছে রক্ত, খেতে হয়েছে পুলিশি রাবার বুলেট।
ইতিহাস অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যমতে, ব্রিটিশ আমল থেকে শিক্ষার আলো ছড়ানো প্রতিষ্ঠানটি ১৮৫৮ সালে ঢাকা ব্রাম্ম স্কুল নামে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৮৭২ সালে বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী তার বাবার নামে জগন্নাথ স্কুল নামকরণ করেন। ১৮৮৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি দ্বিতীয় শ্রেণীর কলেজ ও ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণীর কলেজে রুপান্তরিত হয়। সে সময় ঢাকায় উচ্চ শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হওয়ায় এ প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয় এবং তখন এ প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী গ্রন্থগারের বইপুস্তক ও জার্নাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়। পরে ১৯৪৯ সালে আবার এ প্রতিষ্ঠানে স্নাতক পাঠ্যক্রম শুরু হয়। অবশেষে ২০০৫ সালে জাতীয় সংসদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ পাশের মাধ্যমে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত হয়।
২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তরিত হলেও এখানকার শিক্ষার্থীরা অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেনি। জায়গার সংকটের কারণে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল না শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো আবাসিক হল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আবাসিক সুবিধাসহ যেসকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার কথা ছিল তার বিন্দুমাত্র ভোগ করতে পারেনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী হিসেবেই পার করে দিয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। পড়ালেখার পাশাপাশি নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। আবাসিক সুবিধার জন্য ২০০৯ সালে প্রথম রাস্তায় নামে এ প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। সেই থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করে আসছে শিক্ষার্থী।
জবির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী নাইমুর রহমান নাবিল বলেন, জবি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল এই নতুন ক্যাম্পাস। একজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আবাসিক হল আমাদের জীবন ধারনের মৌলিক চাহিদারও একটি অংশ। এই প্রকল্প অনুমোদন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিতার বিভাগের শিক্ষার্থী নুরে জান্নাত বিনতে নাহার বলেন, আবাসিক হল না থাকায় মেয়েদেরই বেশি সমস্যা সৃষ্টি হয়। বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হল না থাকায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কম। নতুন ক্যাম্পাস হলে জবিতে মেয়ে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা অনেকাংশে বেড়ে যাবে
শুরুটা ২০০৯ সালে
২৭ জানুয়ারি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল আন্দোলন দিবস । ২০০৯ সালে এ প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন ২৭ হাজার শিক্ষার্থী আবাসনের দাবিতে পুরান ঢাকাসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ রাজপথ হল চাই, হল চাই শ্লোগানে প্রকম্পিত করেছিল। ২০০৯ সালের পর থেকে প্রতিবছর ২৭ জানুয়ারি জবির প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো হল আন্দোলন দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। জানা যায়, ২০০৯ সালের এই দিনে হল উদ্ধারের দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়। আন্দোলনে পুলিশ ব্যাপক টিয়ার গ্যাস -রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। পুরান ঢাকাসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ রাজপথ ২৯ দিন পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদ রক্ত নে, হল দে শ্লোগানে মুখরিত ছিল। জবিসহ পুরান ঢাকা অচল হয়ে পড়ে। বন্ধ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়। ঐ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। উক্ত ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের দাবি পুরণে বেশ কয়েকটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করে প্রশাসন। সেসময় শুধু আশ্বাস দিয়ে প্রশাসন খালাস পায়।
২০১৪ সালের আন্দোলন
হলের দাবিতে আন্দোলনকারী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গোটা এলাকা। সংঘর্ষে জজকোর্ট, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, রায়সাহেব বাজার, বাংলাবাজার, সদরঘাট, পাটুয়াটুলীসহ আশপাশে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিব্বত হলসহ ১০টি বেদখল হল ফিরে পেতে রাস্তায় নেমে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। দিনভর চলমান এ সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন জবির ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাসির উদ্দিন, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রভাষক আবুল কালাম আজাদ, তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি এফ এম শরিফুল ইসলামসহ ১০ জন। আহত হন অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আলী নূর, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক সিদ্দিকুর রহমান, ফিন্যান্স বিভাগের প্রভাষক মাশরিক হাসান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক আবু সালেহ সেকেন্দার, সহকারী প্রক্টর আবদুর রউফসহ ২ শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী। দিনব্যাপী এ ঘটনায় আহত শিক্ষক- শিক্ষার্থীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয় এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যয়ভার সম্পূর্ণরুপে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বহন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
২০১৬ সালের আন্দোলন
নতুন হল নির্মাণ ও পুরাতন কারাগারের জায়গায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) হল নির্মাণের দাবিতে ২০১৬ সালের ২রা আগস্ট থেকে আবার শুরু হয় আন্দোলন। বামপন্থীদের নেতৃত্বাধীন সাধারণ শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনও প্রায় একমাস যাবত দীর্ঘায়ু হয়। বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম। পুরান ঢাকার গুলিস্তান টু মাওয়া ও সদরঘাট রাস্তাটি একেবারেই অচল হয়ে পরে। তবে ২০১৬ সালের আন্দোলনে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভক্ত সৃষ্টি হয়। একই বিষয়ে ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা আলাদা আলাদা কর্মসূচি পালন করে। তবে ২০১৬ সালের আগস্টের হল আন্দোলনের সময় প্রশাসন ঘোষণা দেন নদীর ওপার কেরানীগঞ্জে ছাত্রদের জন্য এক হাজার আসন বিশিষ্ট হল নির্মাণ কাজের শুরু হবে নতুন বছরের শুরুর দিন থেকেই। তবে তা করতে ব্যর্থ হয়েছে জবি প্রশাসন। এসব নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ পায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। ২০১৬ সালের আন্দোলনের পরিপেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিক ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে ঢাকা জেলার কেরাণীগঞ্জ থানার তেঘরিয়া ইউনিয়নের পশ্চিমদি মৌজায় প্রায় ২০০ একর ভূমির উপর নতুন ক্যাম্পাস নির্মানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
অবশেষে ৯ অক্টোবর ২০১৮ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর সভাপতিত্বে একনেকের ১৪৬তম সভায় ১ হাজার ৯২০ কোটি ৯৪ লক্ষ ৩৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন: ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদিত হয়। সভায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। এ প্রকল্পের আওতায় মাস্টারপ্লান অনুযায়ী নতুন ক্যাম্পাসে একাধিক একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য হল, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আবাসন ব্যবস্থা, চিকিৎসা কেন্দ্র, ক্যাফেটেরিয়া, খেলার মাঠ, সুইমিং পুল, মসজিদ এবং পরিবহণ ও আধুনিক বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সামাগ্রিক বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস এখন আর স্বপ্ন নয় বাস্তবতা। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান সংকুলান দূর হবে। গত ৩ অক্টোবর ভূমি মন্ত্রনালয়ের কাছে এ জায়গার চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে চলতি অক্টোবর থেকে আগামী দুই বছরের মধ্যে কেরানীগঞ্জের এ জায়গার জমি ভরাট, সীমানা প্রাচীর নির্মান, রাস্তা, ব্রীজ, ড্রেনেজ, লেক নির্মাণ, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংযোগের কাজ করা হবে। সাথে সাথে এ প্রকল্পের মাধ্যমে এ জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো একাডেমিক ভবন, হল, টিচার্স বিল্ডিং, টিএসসি নির্মাণের কাজ শুরু হবে।