লাল তালিকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
দেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, প্রশাসনিক জটিলতা ও মানদণ্ড ঘাটতির মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে লাল তারকা চিহ্নিত তালিকা ও পর্যবেক্ষণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে। বিশেষ করে ভর্তি মৌসুমে এসব তালিকা হালনাগাদ করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কেন দেওয়া হয় লাল তারকা চিহ্ন
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, মূলত কমিশন অনুমোদনবিহীন প্রোগ্রাম পরিচালনা, অনুমোদন ছাড়া ভবন বা ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো, ট্রাস্টি বোর্ডের মালিকানা সংক্রান্ত মামলা, অতিরিক্ত আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি, দীর্ঘদিন শীর্ষ প্রশাসনিক পদ শূন্য থাকা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অডিট প্রতিবেদন দাখিল না করার মতো কারণেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে লাল তালিকা বা বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। এছাড়া লাল তারকা প্রদান করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য সতর্কতা দেওয়া হয়।
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী ৬ কারণে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে লাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কারণগুলো হলো, কমিশন অননুমোদিত প্রোগ্রাম/কোর্স পরিচালনা করলে; কমিশন অননুমোদিত ভবন/ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলে; ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের মালিকানা সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে মামলা থাকলে; কমিশন অনুমোদিত আসন সংখ্যার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করলে; যেসকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ মাসের অধিক সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতি ও আচার্য কর্তৃক নিযুক্ত উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ না থাকলে; সর্বশেষ ২ বছর আইনের ৪৫ ধারা মোতাবেক পরবর্তী আর্থিক বৎসরের ৩১ মার্চের মধ্যে সরকার কর্তৃক মনোনীত অডিট ফার্ম কর্তৃক নিরীক্ষিত প্রতিবেদন কমিশনে প্রেরণ না করলে।
এক তারকা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়
ইউজিসির পর্যবেক্ষণ তালিকায় এক তারকা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি থাকায় তাদের এ তালিকায় রাখা হয়েছে।
ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কমিশনের অনুমোদন ছাড়া ভবন বা ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। ইউজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ক্যাম্পাসের বাইরে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত শর্তের পরিপন্থী। এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে এক তারকা চিহ্নিত করা হয়েছে। ইউজিসির তথ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয়েটিতে বর্তমানে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে, দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রপতি ও আচার্য কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ (ট্রেজারার) নেই। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রো-ভিসি) পদও শূন্য রয়েছে। ইউজিসির মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও একাডেমিক প্রশাসনের জন্য এসব গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকা সুশাসন ও কার্যকর পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব কারণেই প্রতিষ্ঠানটিকে এক তারকা দেওয়া হয়েছে।
দুই তারকা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়
দুই তারকা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এবং কুইন্স ইউনিভার্সিটি। ইউজিসি জানায়, কুইন্স ইউনিভার্সিটি ২০১৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন পেলেও নির্ধারিত এক বছরের মধ্যে সব শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে ভর্তিতে সতর্কতা জারি করে ইউজিসি। সাময়িক অনুমতিপত্রের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে আচার্য কর্তৃক নিয়োগ করা উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ না থাকা, নিয়োগ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় মনোনীত অডিট ফার্ম দ্বারা অডিট না হওয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ গঠনে জটিলতা ও মামলাও চলমান থাকায় এই সতর্কতা দেয় কমিশন। তবে গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. মো: আমানউল্ল্যাহ ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবে মেজর জেনারেল সাহেদুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া। মূলত ইউজিসির তালিকা হালনাগাদের পর এই নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। ইউজিসির তথ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রয়েছে।
তিন তারকা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়
ইউজিসির সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পর্যবেক্ষণে থাকা তিন তারকা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা এবং আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক, আইনি ও একাডেমিক বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইউজিসি জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব ও মামলা চলমান রয়েছে। এছাড়া কমিশন অনুমোদিত আসনসংখ্যার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ১১ ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণ জমিতে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে ব্যর্থ হয়েও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে তিন তারকা দেওয়া হয়েছে।
ইবাইস ইউনিভার্সিটির ধানমন্ডির একটি ঠিকানা একসময় হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে কমিশনের ওয়েবসাইটে অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ওই স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা শেষ হওয়ার পর ঠিকানাটি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইউজিসি অনুমোদিত কোনো ক্যাম্পাস বা ঠিকানা নেই। ফলে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বৈধ অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনার পর বিশ্ববিদ্যালয়টির ঠিকানা ও একাডেমিক প্রোগ্রামের তথ্য কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের জন্য বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ইউজিসি এখনো বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পুনরায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেয়নি।
অন্যদিকে, সাময়িক অনুমতির শর্ত পূরণ এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার ২০০৬ সালে আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি বন্ধ ঘোষণা করে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির কোনো অনুমোদিত ক্যাম্পাস বা বৈধ প্রশাসন নেই। বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি) নিয়ে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং রাষ্ট্রপতি ও আচার্য কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য, প্রো-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষও নেই। ইউজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কারণ এবং সাময়িক অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম পরিচালনার আইনগত ভিত্তি আর অবশিষ্ট নেই।
নতুন ভর্তি বন্ধ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে
ইউজিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি এবং গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সব প্রোগ্রামে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি সম্পূর্ণভাবে স্থগিত থাকবে। কমিশনের পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। ইউজিসি জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় দুটির বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট-সংক্রান্ত অভিযোগ, ওয়েবসাইট ডোমেইন পরিবর্তন, অবকাঠামো এবং সার্বিক প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন ভর্তি বন্ধ থাকবে। তবে আগে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হবে।
অনুমোদন পেয়েও শুরু হয়নি শিক্ষা কার্যক্রম
সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পরও কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী, অনুমোদনের সাত বছরের মধ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে হয়। তবে সেই সময়সীমা অতিক্রম করেও ২০১৬ সালে অনুমোদন পাওয়া রূপায়ণ এ. কে. এম. শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ২০১৮ সালে অনুমোদন পাওয়া শাহ মখদুম ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটি এখনো একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এছাড়া ২০২০ সালের ১৬ জুন অনুমোদন পাওয়া মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এর ক্ষেত্রেও কার্যক্রম শুরুর নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার পথে।
ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে একাধিকবার তাগিদ দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। ফলে অনুমোদন পাওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল কাগজে-কলমেই রয়েছে; শিক্ষার্থী ভর্তি বা একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
ইউজিসির অবস্থান
লাল তারকা চিহ্নিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কিছু গুরুতর প্রশাসনিক ও একাডেমিক সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অবস্থান থেকে তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন বা নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা কম। যদি লাল তারকা চিহ্নিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নির্ধারিত সমস্যাগুলো সমাধান করতে সক্ষম হয় এবং কমিশনের শর্তসমূহ পূরণ করে, তাহলে ভবিষ্যতে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, তবে আপাতত এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে কমিশনের অবস্থান হলো, লাল তারকা চিহ্ন দেওয়ার কারণগুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি জটিল হিসেবেই বিবেচিত থাকবে এবং কোনো চূড়ান্ত রিভিউ বা পরিবর্তন তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়।