নোয়াখালিতে ভোটের প্রচারণা © টিডিসি ফটো
ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রচার-প্রচারণাও জমে উঠছে নোয়াখালীতে। জেলার বিভিন্ন আসনের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, এতদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন পরিসরে নোয়াখালী বিভাগের যে দাবি ছিল, সেটি আরো জোরালো হয়ে উঠেছে নির্বাচনের আগে।
রাজনৈতিক দলগুলোও ভোটে জিততে এই দাবিকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনছে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার নোয়াখালীতে একটি নির্বাচনী সমাবেশে জামায়াতের আমির যখন বক্তব্য রাখেন তখন তিনিও ভোটারদের এই দাবির কথা তুলে ধরে তা পূরণের আশ্বাস দেন। এর বাইরেও সাধারণ ভোটারদের অনেকেই বলছিলেন, বিগত সময়ে নির্বাচনে জিতে অনেকেই মন্ত্রী কিংবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। কিন্তু তারা এলাকার উন্নয়নে খুব একটা নজর দেননি।
ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, বেকারত্বের সমস্যাসহ নানা অভিযোগের কথা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিও ছিল অনেকের। ভোটারদের সমর্থন পেতে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন প্রার্থীরা, তখন এসব দাবিকেই সামনে আনছেন ভোটাররা।
এদিকে, আগে থেকেই বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নোয়াখালী জেলা। দলের মধ্যে কোন্দল ও দুটি আসনে বিদ্রোহী থাকলেও দলটির নেতাদের আশা এবারের নির্বাচনে জেলার সবগুলো আসনেই জয় পাবে দলটি।
অন্যদিকে, জামায়াত এনসিপি জোটও জোর প্রস্তুতি নিয়েছে নির্বাচন ঘিরে। শেষ পর্যন্ত সুষ্ঠু ভোট হলে এবারের নির্বাচনে চমক দেখাতে চায় জামায়াত জোট।
মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলের দাবি
প্রথমবারের মতো ভোটার হয়েছেন নোয়াখালী সদর উপজেলার কলেজ ছাত্রী সুমনা আক্তার তমা। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছিলেন, নোয়াখালীর এই জনপদে দিনে দিনে বাড়ছে মাদকের প্রভাব, সেই সাথে নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।
মিজ তমা বলছিলেন, এই মাদকের প্রভাবে একদিকে যেমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়েছে, সেই সাথে অনিরাপদ হয়েছে নারীদের চলাফেরা। যার ফলে ধর্ষণসহ বেড়েছে নানা অপকর্ম। 'জীবনের প্রথম ভোট আমি এমন একজনকে দিতে চাই যিনি কি-না সন্ত্রাসমুক্ত ও নারীর জন্য নিরাপদ এলাকা গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন', বলছিলেন মিজ তমা।
এলাকার ভোটারদের অনেকেই প্রায় একবাক্যে এই সমস্যাগুলোর কথা তুলে ধরেছেন। খোয়াখালীতে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেন নূরজাহান বেগম রিনি। তার মতেও, এখন নোয়াখালীর সবচেয়ে বড় সংকট হলো মাদক।
'এখানে মাদক একদম ওপেন সিক্রেট হয়ে গেছে। ইয়াবা-গাজা এত সহজে পাওয়া যায় যা যুব সমাজকে প্রায় ধংস করে দিয়েছে এবং খুব সহজে টাকা রোজগারের পথও এখন মাদক,' বলছিলেন তিনি।
সেই সাথে আরো একটি সংকটের কথা বেশ উদ্বেগের সাথেই তুলে ধরেছেন মিজ রিনি। তিনি বলছিলেন, এই এলাকার অনেক নারী ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। সম্প্রতি গার্মেন্টস বন্ধসহ ছাঁটাইয়ের কারণে অনেক নারীই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আর তাদের কেউ কেউ ঝুঁকে পড়েছেন দেহ ব্যবসার পথে।
তাদের জন্য কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করা না গেলে সংকট বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। প্রার্থীদেরও বিষয়গুলোতে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান।
জোরালো হচ্ছে নোয়াখালী বিভাগের দাবি
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার পর যে জুলাই সনদ তৈরি করেছে সেখানে কুমিল্লা ও ফরিদপুরকে বিভাগ ঘোষণার প্রস্তাবও করেছে।
এই বিষয়টি জুলাই সনদে যুক্ত হওয়ার পর সনদ স্বাক্ষরের দিন, ঢাকায় বিক্ষোভও করতে দেখা গেছে নোয়াখালী বিভাগের দাবিতে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিভিন্ন ধরনের প্রচার প্রচারণা ও হাস্যরসও দেখা গেছে। তবে, এবারের নির্বাচনের আগেও সেই বিভাগ চাই দাবি আরো জোরালো হয়েছে ভোটারদের কাছ থেকে। নোয়াখালীর বিভিন্ন আসনের ভোটারদের সাথে কথা বললে তারাও একবাক্যে বলছেন, যে দলই ভোটে জিতুক, তারা যেন নোয়াখালী বিভাগের দাবি পূরণ করেন।
তরুণ ব্যবসায়ী ইয়াসিন আরাফাতের সাথে কথা হয় শহরের প্রেসক্লাব এলাকায়। তিনি বলছিলেন, "দীর্ঘদিন ধরে আমাদের প্রাণের দাবি নোয়াখালীকে বিভাগ করার। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই দাবি পূরণে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো শক্ত অবস্থান আমরা দেখি নাই'।
এমন দাবিতে নোয়াখালীর বিভিন্ন জায়গায় এবং রাজধানী ঢাকা শহরেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে। কিন্তু সেই দাবি পূরণ না হওয়া ভোটারদেরও এ নিয়ে আক্ষেপ আছে। শিক্ষার্থী মুরশিদুর রহমান নামের এক তরুণ ভোটার বিবিসি বাংলাকে বলেন, 'নোয়াখালী মানুষের সবার আগে একটাই দাবি নোয়াখালী বিভাগ। এটা আমাদের প্রাণের দাবি। এই দাবি মানতে হবে যেই জিতুন নির্বাচনে'।
যেহেতু এই দাবিটি নির্বাচনের আগে বেশ জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে সে কারণে প্রার্থীদের অনেকেই এ নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
নোয়াখালী সদর আসনের বিএনপির প্রার্থী ও দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মো. শাহজাহান বিবিসি বাংলাকে বলেন, 'এটা গণমানুষের দাবি। এই দাবির সাথে আমরাও একমত, দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নাই'। গত শুক্রবার এই জেলায় নির্বাচনী জনসভা করেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি একটি কাগজে লেখা এলাকাবাসীর ছয়টি দাবির কথা উল্লেখ করেন। সেখানে প্রথমেই ছিল নোয়াখালী বিভাগ দাবি।
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন তাদের দল ক্ষমতায় গেলে এই দাবি পূরণে গুরুত্ব দেবে তার দল।
জেলা জামায়াতের আমির মো. ইসহাক খন্দকার বিবিসি বাংলাকে বলেন, 'আমরা বিভাগের ব্যাপারে মানববন্ধন করেছি। আমাদের পরিকল্পনায় আছে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নোয়াখালী বিভাগ করবো ইনশাআল্লাহ'।
জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী দুটি দলই
নয়টি উপজেলা ও আটটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নোয়াখালী জেলার ছয়টি আসন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সবগুলো আসনেই বিএনপি হাড্ডাহাডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে বিএনপি ও জামায়াত এনসিপি জোটের মধ্যে।
গত নভেম্বরে দলীয় মনোনয়ন ঘোষণা করে বিএনপি। এরপর কয়েকটি আসনে বঞ্চিত প্রার্থীদের সমর্থকদের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ ও নানা প্রতিবাদ কর্মসূচিও দেখা যায়। শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি অসন্তোষ দমানো যায়নি। যে কারণে ছয়টি আসনের মধ্যে নোয়াখালী-২ ও নোয়াখালী-৬ আসনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী হয়েছেন দুইজন।
যেটি নির্বাচনের মাঠে বিএনপির জন্য কিছুটা দুশ্চিন্তার বলেও মনে করছেন ভোটারদের কেউ কেউ। যদিও বিএনপির দাবি, অনেক আগে থেকেই নোয়াখালীতে শক্ত অবস্থান রয়েছে দলটির। যে কারণে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন যারা করবেন তারাই ভালো করবেন নির্বাচনে।
নোয়াখালী সদর আসনের বিএনপির প্রার্থী ও দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মো. শাহজাহান বিবিসি বাংলাকে বলেন, 'ভোট যদি সুষ্ঠু হয়, কোনো ধরনের রিগিং না হয়, কোনো রকম যদি বিশৃঙ্খলা না হয়, তাহলে নোয়াখালীর ছয়টা আসনই অতীতের মতো বিএনপিই জিতবে বলে আশা করি'।
শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর থেকে ভোটের মাঠে জোরেশোরে কাজ করছে জামায়াতে ইসলামী। যদিও জোটবদ্ধ নির্বাচনের কারণে দুইটি আসন ছাড় দিতে হয়েছে এনসিপির প্রার্থীদের। তবে এই জেলায় আওয়ামী লীগের একটি শক্তিশালী ভোট ব্যাংকও রয়েছে। সেই ভোটাররা ভোটের ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মনে করেন এলাকার অনেকেই।
নোয়াখালী-২ আসনে বিএনপি নেতা জয়নুল আবেদীন ফারুকের বিপরীতে প্রার্থী হয়েছেন এনসিপির সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া মজুমদার। আর নোয়াখালী-৬ আসনে প্রার্থী হয়েছেন এনসিপি নেতা আব্দুল হান্নান মাসউদ।
বাকি চারটি আসনেও নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে। জেলা জামায়াতের আমির ও সদর আসনের প্রার্থী মো. ইসহাক খন্দকারের কাছে প্রশ্ন ছিল, বিএনপির শক্ত এই ঘাটিতে নির্বাচনে কতটা সুবিধা করতে পারবে জামায়াত?
জবাবে মি. খন্দকার বলছিলেন, 'আমরা জোটবদ্ধ নির্বাচন করে বিএনপির বাক্সে ভোট দিয়েছি বলেই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখন আমরা তো আলাদা নির্বাচন করছি। নির্বাচনে নেমে যে সারা পাচ্ছি তাতে মনে হচ্ছে ছয়টি আসনেই জিততে পারে জামায়াত এনসিপি জোটের প্রার্থীরা'।
বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি ছাড়াও এবারের নির্বাচনে নোয়াখালীর বিভিন্ন আসন থেকে ভোটে লড়ছেন ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, জেএসডি, বাংলাদেশ কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।