মাহাদি আমিন © সংগৃহীত
ভোট চাইতে গিয়ে একটি দল ধর্মীয় অনুভূতির অপব্যবহার, জান্নাতের প্রলোভন, কোরআন শরিফে শপথ করানো, এমনকি বিকাশ নম্বরে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, ফলে যারা নিজেরাই টাকা দিয়ে ভোটারদের ভোট কেনার চেষ্টা করে যাচ্ছে, আবার তারাই যখন দুর্নীতির গল্প শোনায়, সেটি তাদের তথাকথিত সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বিকালে গুলশানে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি, একটি নির্বাচনী জনসভায় একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান বগুড়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও বগুড়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন। বাস্তবতা হলো, এই দুইটি বিষয়ই ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনুমোদিত এবং এ লক্ষ্যে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কার্যকর রয়েছে। বিদ্যমান এরকম একটি সিদ্ধান্তকে নতুন প্রতিশ্রুতি হিসেবে উপস্থাপন করে বগুড়াবাসীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা নতুন করে ফ্যাসিবাদী আমলের পুরোনো মিথ্যা ও প্রতারণামূলক ‘দুর্নীতির বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’বয়ান প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছেন। অথচ এটি জাতীয়ভাবে প্রমাণিত যে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতির হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি যখন সরকার গঠন করে তখন একটি প্রতিষ্ঠানের সূচকে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ০.৪, যা ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত শাসনক্ষমতায় থাকা তৎকালীন রাজনৈতিক দলটির দুর্নীতির প্রতিফলন। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির প্রতি বিএনপির জিরো টলারেন্স এবং সুশাসনের ফলে এটি ক্রমশঃ উন্নত হয়।
মাহদী আরও বলেন, সর্বশেষ বিএনপি ২০০৬ সালে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব ছাড়ার সময় স্কোর ২.০-তে উন্নীত হয়। অতএব যে দল ধারাবাহিকভাবে দুর্নীতি দমনে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছে, এমনকি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন পর্যন্ত গঠন করেছে, তাদের বিরুদ্ধে এটি পরিকল্পিত অপপ্রচার। একটি বিষয় খুবই বিস্ময়কর যে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত উক্ত দলটি নিজেই সরকারের অংশ ছিল। তাদের দুইজন মন্ত্রী ও বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য ছিলেন। সরকারে থাকা অবস্থায় তখন এ বিষয়ে আমরা তাদের কোনো মন্তব্য শোনা যায়নি। কিন্তু বর্তমানে তারা নির্বাচনী মাঠে এসে ফ্যাসিবাদী প্রোপাগাণ্ডার এই ধারাবাহিকতাকে ধরে রেখেছে। আমরা দলটির এই ভূমিকাকে রাজনৈতিক দ্বিচারিতা হিসেবে দেখছি।
তিনি বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের গতকালের নির্বাচনী সফরে ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও উত্তরার বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে ধানের শীষের পক্ষে এক ঐতিহাসিক গণজোয়ার সৃষ্টি করেছেন। বিপুল জনসমাগমের কারণে সফরসূচিতে কিছুটা বিলম্ব ঘটেছে। তবুও গভীর রাত পর্যন্ত সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও উৎসবমুখর উপস্থিতি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে তারেক রহমানই আজ বাংলাদেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এই অভূতপূর্ব জনসমর্থন একটি গণতান্ত্রিক, সমতাভিত্তিক ও কল্যাণমুখি রাষ্ট্রগঠনে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নতুন করে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
মাহদী বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে নির্বাচন কমিশন একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আহ্বান জানিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশন উল্লেখ করেছে যে, নির্বাচনী প্রচারণার আড়ালে কতিপয় ব্যক্তি ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংগ্রহের বিষয়টি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নজরে এসেছে। কিন্তু ‘জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন আইন ২০১০’অনুযায়ী, অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বহন কিংবা হস্তান্তর করা যাবে না। এছাড়া 'সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫'-এর বিধি-৪ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল, প্রার্থী কিংবা তার পক্ষে অন্য কেউ নির্বাচনী এলাকায় বসবাসকারী ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানে কোনোপ্রকার চাঁদা, অনুদান বা উপহার প্রদান করতে বা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন না। এসব কার্যক্রম বিধি অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমরা কমিশনের এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছি এবং এই বিষয়ে তাদের কর্মযজ্ঞ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে আমরা জানতে পেরেছি নওগাঁর সাপাহার উপজেলার একটি মসজিদের মুয়াজ্জিন আল আমিন চৌধুরীকে ধানের শীষের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার কারণে একটি দলের নেতাকর্মীদের চাপে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এটি নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের জঘন্য দৃষ্টান্ত। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই এবং অবিলম্বে তাকে পুনর্বহালের দাবি করছি।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে সিলেটে সেই দলের একজন প্রার্থীর বক্তব্যে শোনা যাচ্ছে, নির্বাচিত হলে তাকে জিজ্ঞাসা না করে কারও বাড়িতে যেতে পারবে না পুলিশ। এটি নিঃসন্দেহে অসাংবিধানিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। একজন সংসদ সদস্য প্রার্থী এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ কীভাবে পান, তা নিয়ে প্রশ্নের উদ্রেক হয়। বিএনপি বিশ্বাস করে ন্যয়বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থে কাউকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করা সমীচীন নয়। কিন্তু তাই বলে গ্রেফতার করতে হলে কোনো একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর অনুমতি নেওয়া লাগবে-এ ধরণের বক্তব্য কর্তৃত্ববাদী মনোভাবেরই শামিল। আমরা এ বিষয়ে যথাবিহিত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।