করোনা পরবর্তী শিক্ষায় যে পরিবর্তন হতে পারে, করণীয় কী?

০৪ জুলাই ২০২১, ০৫:৩৮ PM
করোনা পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেবে

করোনা পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেবে © ফাইল ছবি

করোনায় পৃথিবীর অগ্রযাত্রাকে দুটি ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। আমরা ২০১৯-এর পূর্ববর্তী পৃথিবীর সাথে করোনা পরবর্তী পৃথিবীর মিল কোনদিন খুজে পাবনা। এই পরিবর্তনটা হবে অস্বাভাবিকভাবে ভিন্ন এবং মৌলিক। নতুন অনেক কিছুর জন্য প্রস্তুত হতে হবে মানব জাতীকে এর মধ্যে কিছু পরিবর্তন স্থায়ী হয়ে উঠবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের বিশ্বকে যেভাবে পাল্টে দিয়েছিল তেমনি করোনা দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের চেয়ে ব্যাপক মাত্রায় চেনা জানা বিশ্বকে পাল্টে দিতে পারে। জার্মানির চ্যান্সেলর এঙ্গেলা ম্যার্কেল ১৮ মার্চ দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এক ভাষণে করোনা সংক্রমনকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সবচেয়ে বড় সঙ্কট বলেছেন।

মানব ইতিহাসে একটা চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে শিক্ষাক্ষেত্রে। শিক্ষার্থীদের উপর করা করোনা প্রভাব শীর্ষক ব্র্যাকের এক গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে, করোনার সময়ে প্রায় ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থীকে গৃহস্থলীর কাজ ও পরিবারকে সহযোগিতা করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে ২২ শতাংশ শিক্ষার্থীর পরিবারে খাদ্য সংকট রয়েছে।

অন্যদিকে যাদের পরিবারে খাদ্য সংকট ছিল না এবং কোন রকম আয় বর্ধক কাজ করতে হয়নি সেসব পরিবারের প্রায় ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী গল্প গুজব বা আড্ডাবাজি করে দিন অতিবাহিত করছে। এছাড়া বিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সঠিক নির্দেশনা না পাওয়ায় ৪৪ শতাংশ, পরিবার থেকে সাহায্য না পাওয়ায় ১৯ শতাংশ এবং ঘরে পড়ার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় ১১ শতাংশ শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

মো. শাহ্ নেওয়াজ মজুমদার

ইউনেস্কো ইতিমধ্যেই সতর্ক করে বলেছে করোনা পরবর্তী বিশ্ব আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলি ২০২১ সাল থেকে কাটছাট করবে তাদের শিক্ষা বাজেটে। গোটা বিশ্বেই শিক্ষার বাজেটে প্রায় ৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘাটতি দেখা দেবে।

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বৈশ্বিক মহামারি করোনার মধ্যে একদম থেমে না থাকলেও পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। যেহেতু শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতি ও সাফল্যের উপরই দেশের সামগ্রিক উন্নতি নির্ভরশীল। বিকল্প পদ্ধতি হিসাবে অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা নিয়েও বিভিন্ন কারণে প্রশ্ন রয়েছে।

প্রায় ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী বিভিন্ন কারণে এই ধরনের অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করতে পারেনি। এদের মধ্যে গ্রমাঞ্চলের শিক্ষার্থী, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ও নৃগোষ্ঠির শিক্ষার্থী, আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীরা রয়েছে। সুতরাং আমদের অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয় সমতা আনয়নে পুরোপুরি সক্ষম হয়নি।

সেভ দা সিলড্রেনের একটি আলোচনায় উঠে এসেছে, করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে হয়তো স্কুলেই যাওয়া হবে না প্রায় এক কোটি শিশুর এই ভয়ঙ্কর তথ্যে আমাদের বুকটা ধুক করে কেঁপে উঠে।

এক সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সশরীরে উপস্থিতি ও চিন্তাভাবনা প্রকাশের মূল কেন্দ্র ছিল শ্রেণীকক্ষ। কিন্তু বর্তমান মহামারির ভয়াবহতায় পুরোটাই পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর তবে অদূর ভবিষ্যতে মহামারির অবসানের পর আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নিন্মুক্ত পরিবর্তন সমূহ সাধিত হবে।

অফলাইন ও অনলাইন শিক্ষাক্রমে আমরা চলে আসবো। আমাদের পাঠ্যক্রমের ৬০ শতাংশ অনলাইনে ও বাকি ৪০ শতাংশ অফলাইনে পড়ানো হবে। বেড়ে যাবে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। ছাত্র-ছাত্রীরা বাসায় বসে পড়াশুনায় অভ্যস্ত হয়ে যাবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় মুখস্ত বিদ্যায় খাতায় লিখে ভাল ফলাফলের পরিবর্তে শুরু হবে প্রজেক্ট বেইজ মূল্যায়ন পদ্ধতি।যেখানে থাকবে ছাত্র-ছাত্রীদের মেধা বিকাশের অফুরন্ত সুযোগ আর সাথে থাকছে দুনিয়া জুড়ে তথ্য প্রবাহের আশীর্বাদ।

করোনা পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থায় পেরেনটিং এডুকেশনের গুরুত্ব বাড়বে অথ্যাৎ বাসায় বাবা মা’রা হবে ছাত্র-ছাত্রীদের অন্যতম বড় প্রশিক্ষক। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলেজেন্সির ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা হবে আন্তর্জাতিক মানের, আমাদের শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে।

করোনা পরবর্তী আমাদের করণীয় সমূহ-

শিক্ষক প্রশিক্ষন: শিক্ষক হলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ। বর্তমান সমস্যা মোকাবেলায় তাদেরকে দক্ষ আধুনিক ডিজিটাল রিসোর্স তৈরী করার ক্ষমতা সম্ভলিত প্রশিক্ষন। তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ও আধুনিক এডুকেশন টুলস ব্যবহারে শিক্ষক গনের দক্ষতা বৃদ্ধি মূলক প্রশিক্ষন নিশ্চিত করতে হবে।

কারিকুলাম পূনঃসংস্করন: বর্তমানে প্রয়োজন কমিউনিটি বেইজড বা ক্রাউড সোর্স কারিকুলাম যার মাধ্যমে যার যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু কারিকুলামে অন্তর্ভূক্ত করবে। দক্ষতা ভিত্তিক ও মেধার বিকাশ ও সেলফ ডেভেলফমেন্ট মুলক নানা কার্যক্রম কারিকুলামে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।

এডুকেশনাল রিসোর্স: প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, তাই প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা উপকরন হিসাবে ইলেকট্রনিক ডিভাইজ প্রদান নিশ্চিত ব্যবস্থা করতে হবে। স্বল্পমূল্যে শিক্ষার্থীদেরকে ইন্টারনেট সুবিধা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ইন্টারনেট প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা: আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে আরও সুদৃঢ় ও আত্বপ্রত্যয়ী হওয়ার জন্য মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা প্রয়োজন। সর্বপরি প্রজেক্ট বেইজ লার্নিং সিস্টেমে শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভূক্ত করা।

পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ: করোনাকালীন সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্নয়। উভয়ে মিলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও আগামীকে মোকাবেলার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

মিশ্র শিক্ষার প্রবর্তন: করোনা পরবর্তী জগতে ৪০ শতাংশ পাঠ অফলাইনে গতানুগতিক পন্থায় দেওয়া হবে বাকি ৬০ শতাংশ অনলাইন ভিত্তিক হবে। এতে একজন ছাত্রের বুদ্ধিগত বিকাশ সম্ভব। করোনা পরবর্তী পৃথিবী অনলাইন শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেবে।

দূরশিক্ষন ব্যবস্থা: ছাত্ররা ঘরে বসেই পড়াশুনা করবে নানা অভিনব পন্থা অবলম্বন করে। তাই ভবিষ্যতে কাজ ও পড়াশুনা একাধারে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে এবং দূরশিক্ষনে বিপ্লব সাধিত হবে।

আমরা দেখতে পাচ্ছি আগামী দিনে ছাত্র ছাত্রীরা মুখস্ত বিদ্যার উপর ভর করে ভালো ফলাফল করতে পারবে না। ভবিষ্যতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষার ক্ষেত্র খুবই গুরুত্তপূর্ন হয়ে উঠবে। পরিক্ষার প্রশ্ন সমূহ বিশ্লেষনাত্বক হবে এবং ছাত্র ছাত্রীদের আরও সৃজনশীল করে তুলবে।

সেজন্য আমাদের প্রয়োজন শিক্ষা বান্ধব বাজেট। বর্তমানে আমদের দেশে জিডিপির ২.২ শতাংশ বরাদ্ধ করা হয় শিক্ষায় যা অপ্রতুল। বর্তমানের শিক্ষায় এই বৈষম্য দূর করার জন্য সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেট আরো বাড়াতে হবে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে তৈরি করতে হবে এডুকেশন ফান্ডিং। এই করোনা মহামারি আমদেরকে যেভাবে সমস্যায় ফেলেছে তেমনিভাবে উত্তোরনের অনেক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।

শিক্ষা ও অর্থ ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে জাতীয়ভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা উপকরন নিশ্চিত করনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করে সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। সে জন্য সবার সমন্বিত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা খুবই জরুরি। সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই আমরা সফলতা পাবো ও শিক্ষা বৈষম্য অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

লেখক: হেড অফ অপারেশন, ড্যাফোডিল ইনষ্টিটিউট অব আইটি, চট্টগ্রাম

ঈদযাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন হাসনাত আবদুল্লাহ
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ভোলার ইলিশা ঘাটে চরম পরিবহন সংকট, ভাড়া গুণতে হচ্ছে ৫-৬ গুণ
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ভোলায় সিএনজি-পিকআপ সংঘর্ষে প্রাণ গেল চালকের, আহত ৫
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বাড়তি ভাড়ায় ভোগান্তি যাত্রীদের
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভাবির দায়ের কোপে দেবর নিহত
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
ঈদের আনন্দ এবং আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতা
  • ১৯ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence