ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং ও বাস্তবতা

২৬ অক্টোবর ২০২০, ০৪:১২ PM
ড. মোহাম্মদ শাহ্‌ মিরান

ড. মোহাম্মদ শাহ্‌ মিরান © ফাইল ফটো

১৯২১ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যাকে বাংলাদেশের বাতিঘর বলা চলে। এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতা, সম্মানিত শিক্ষক, আমলা এবং বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত দক্ষ জনশক্তি তৈরি করছে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই শতবর্ষী বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থী ছিলেন।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় অতীত এবং ঐতিহ্য। স্বাধীনতা আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আছে অনন্য অবদান, যা বিশ্বের কোনো প্রতিষ্ঠানের নেই। আজকাল প্রায়ই আলোচনা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মান এবং ঐতিহ্য আগের অবস্থানে নেই। বিশেষভাবে প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং প্রকাশিত হলে শুরু হয় আলোচনা এবং সমালোচনা। যদিও র‌্যাঙ্কিংয়ের সূচক নিয়ে ততটা পর্যালোচনা হয় না। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ২০২১ সালের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং, যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান আছে গত বছরের মতো। এ বছর করোনার কারণে সূচকে তেমন পরিবর্তন হয়নি।

বর্তমানে বিশ্বের কয়েকটি সংস্থা প্রতিবছর বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাঙ্কিং প্রকাশ করে থাকে। যাদের মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কুয়াকুয়ারেলি সাইমন্ডস (কিউএস) এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশনের করা ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিং। দুই সংস্থার র‌্যাঙ্কিং নির্ধারণের প্রধান সূচক প্রায় একই কিন্তু ফলাফলে ভিন্নতা রয়েছে। যেমন অতি সম্প্রতি কিউএস র‌্যাঙ্কিং অনুযায়ী ২০২১ সালে শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) কিন্তু টাইমস সাময়িকী অনুযায়ী তাদের অবস্থান পঞ্চম। টাইমসের তথ্যমতে, ২০২১ সালে তালিকায় প্রথমে আছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু কিউএস অনুসারে পঞ্চম। কিউএসের তালিকায় ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১-১০০০ কিন্তু টাইমসের তথ্যমতে ১০০০ প্লাস। যদিও বিষয়ভিত্তিক র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের কিছু বিষয় যেমন অর্থনীতি, ব্যবসায় প্রশাসন এবং কম্পিউটার সায়েন্স সারাবিশ্বে ৩৫০-৫০০-এর মধ্যে আছে। টাইমস হায়ার এডুকেশনের করা ১৪০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২০২১ সালে ভারতের ৬৩টি, পাকিস্তানের ১৭টি, বাংলাদেশের ২টি, শ্রীলঙ্কার ২টি এবং নেপালের ১টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। তবে ভারতের কয়েকটি, পাকিস্তানের ২টি এবং শ্রীলঙ্কার ১টি ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান একই।

টাইমস হায়ার এডুকেশনের র‌্যাঙ্কিংয়ে প্রধান সূচক (৩০%), প্রকাশনায় উদ্ধৃতি (৩০%), আন্তর্জাতিক পরিচিতি (৭.৫%) এবং প্রাতিষ্ঠানিক বা শিল্প আয় (২.৫%)। কিউএস পদ্ধতিতে প্রায় একই, সেখানে অতিরিক্ত দেখা হয় চাকরির বাজারে সুনাম। টাইমস সাময়িকীর ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া ডাটা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০২১ সালে টিচিংয়ে ১৫.৩%, গবেষণায় ৭.৭%, উদ্ধৃতিতে ৩৬.৬%, প্রাতিষ্ঠানিক আয় ৩৩.৮% এবং আন্তর্জাতিক রেপুটেশনে ৪২.৪% স্কোর পেল।

খুবই স্বাভাবিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিচিংয়ে পেল অনেক কম স্কোর, যা দেখে সবাই অবাক হবেন। বাস্তবে টিচিং পরিবেশে আছে অনেক উপাদান, যেমন রেপুটেশন সার্ভে (১৫%), শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাত (৪.৫%), স্নাতক এবং পিএইচ.ডি ছাত্রের অনুপাত (২.৫%), শিক্ষক প্রতি পিএইচ.ডি ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছাত্রের অনুপাত (৬%), প্রাতিষ্ঠানিক আয় (২.৫%)। রেপুটেশন সার্ভের মধ্যে আছে ক্লাসে শিক্ষকের পাঠদানের মূল্যায়ন, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, পরীক্ষার পদ্ধতি, টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাক্রম। টাইমসের তথ্য অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ২,১০,৮৫৬ জন, যেখানে অধিভুক্ত এবং উপাদানকল্প কলেজের শিক্ষার্থীদের হিসাব করা হয়েছে। শিক্ষকপ্রতি শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৬.৯ জন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী আছে ৩৫-৪০ হাজার। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক গবেষক এম.ফিল এবং পিএইচ.ডি ডিগ্রি পায়। শুধু নিয়মিত শিক্ষার্থীদের হিসাব করা হয়, তাহলে ওপরের সূচক অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাঙ্কিং ভিন্ন হতে পারে। উল্লেখ্য, কিউএস র‌্যাঙ্কিং অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৩,৩৬০ জন এবং শিক্ষকের সংখ্যা ২২৬৮ জন।

গবেষণা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক যার ওপর নির্ভর করে মোট স্কোরের ৩০%। এখানেও টিচিংয়ের মতো কিছু ভাগ আছে, যেমন গবেষণা খ্যাতি (১৮%), গবেষণা আয় (৬%), উৎপাদনযোগ্য গবেষণা (৬%)। একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতি বছরে মোট প্রকাশনার সংখ্যা এবং শিক্ষকপ্রতি প্রকাশিত সাময়িকী, সাময়িকীর ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর গবেষণা খ্যাতি হিসাবে মূল্যায়ন করা হয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন, এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশনা উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরযুক্ত সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়, যদিও বিশ্বের অন্যদের তুলনায় কম। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের টাকা জ্ঞানে পরিণত হয়, আবার অর্জিত জ্ঞান প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পদে পরিণত করা যায়। বিশ্বের ধনী দেশগুলো প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে আজ উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। বিদেশে শিক্ষকরা তাদের অর্জিত জ্ঞান বা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা নিজের কোম্পানির মাধ্যমে মার্কেটিং করে থাকেন। এই থেকে গবেষণার মান বা গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু তা নির্ণয় করা যায়। মার্কেটিংয়ের জন্য দরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিল্পকারখানার সংযোগ স্থাপন এবং যৌথভাবে কাজ করা।

শিক্ষকপ্রতি গবেষণা-উদ্ধৃতি সূচক, যার ভিত্তিতে অর্জিত হয় ৩০% স্কোর। এটা হচ্ছে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পাঁচ বছরে প্রকাশিত গবেষণাপত্র বিশ্বব্যাপী গবেষণা-উদ্ধৃতির সংখ্যা ও মোট গবেষকের সংখ্যার অনুপাত। এ বছর এই সূচকে বিশ্ববিদ্যালয় যে স্কোর পেয়েছে এটা অধিভুক্ত এবং উপাদানকল্প কলেজ ছাড়া নিয়মিত শিক্ষকদের অনুপাতে হলে আরও বাড়বে।

আন্তর্জাতিক শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যার অনুপাত থেকে দেখা হয় কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করার সক্ষমতা বা ওই প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক খ্যাতি। টাইমসের তথ্য অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সংখ্যা মাত্র ৩%, যেখানে শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে ৪১% এবং এমআইটিতে ৩৪%। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষক নিয়োগের জন্য দরকার হবে উপযুক্ত সম্মানী এবং বিদেশি শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজন আকর্ষণীয় মেধাবৃত্তি। বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয় তাদের র‌্যাঙ্কিং উন্নত করতে চায় তাই বর্তমান অবস্থান ধরে রাখতে হলেও আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ২০২০ এবং ২০২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট স্কোর আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশি ছিল কিন্তু র‌্যাঙ্কিং উন্নত হয়নি, কারণ অন্য বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের চেয়েও ভালো করেছে।

র‌্যাঙ্কিং উন্নত করতে টিচিং এবং গবেষণাসহ সব সূচকে বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের উন্নতি আবশ্যক। এক্ষেত্রে সরকার, শিল্পকারখানা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মৌলিক গবেষণা প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। চাকরিতে নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে হতে হবে এবং গবেষকদের কাজের পরিধি বাড়াতে হবে। বিদেশে থাকা দূতাবাসগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে বিদেশি শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা আমাদের দেশে পড়াশোনা করতে আসে। তাহলে আমাদের প্রিয় শতবর্ষী বিদ্যাপীঠ ধরে রাখতে পারবে তার গৌরব ও ঐতিহ্য, সঙ্গে সঙ্গে র‌্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি করতে সক্ষম হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

অধ্যাপক, রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
shahmiran@du.ac.bd

সূত্র: সমকাল

হাসপাতালে স্ত্রীর মরদেহ রেখে পালালেন স্বামী
  • ১১ মে ২০২৬
পরিষ্কারভাবে বলতে চাই—আমি কোনো রাজনৈতিক দলে যুক্ত নই
  • ১১ মে ২০২৬
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তির ২য় পর্যায়ের আবেদন শু…
  • ১১ মে ২০২৬
রেজিস্ট্রেশন করতে না পারা শিক্ষার্থীদের ফের সুযোগ দিল মাদ্র…
  • ১১ মে ২০২৬
চার চিকিৎসক, এক নার্সে চলছে বেরোবির মেডিকেল সেন্টার, বেহাল …
  • ১১ মে ২০২৬
দুপুরের মধ্যে দেশের ৫ অঞ্চলে ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস
  • ১১ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9