আড়ং, বদলি এবং আমার বাবা

০৪ জুন ২০১৯, ০১:২৮ PM

আমার বাবা একজন সরকারি কর্মচারি ছিলেন। ৬৭ সালে চাকরি শুরু। ৮০ এর দশকের শুরুর দিক, তখন উনার কর্মস্থল ছিল যশোর ক্যান্টনমেন্ট।

বাবা সিনিয়র অডিটর ছিলেন। চাকরি সশস্ত্র বাহিনীর ছিল না। সিজিডিএফ এর অধীনে ছিলেন। বিশাল আর্থিক অনিয়ম দেখতে পেয়ে সেটার বিরুদ্ধে ফাইলে লেখার পরে অনেক অফার/আদেশ/অনুরোধেও বাবা অনড় ছিলেন। ফলাফল দ্রুত বগুড়া ক্যান্টনমেন্টে বদলি।

কয়েক মাস যেতে না যেতেই, সেখানেও প্রায় একই অবস্থা। বাবাকে ট্রান্সফার করা হল চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে। আমার বাবা লিখলেন বদলি আদেশের বিরুদ্ধে। তিন বছর পার হবার আগেই বদলি রীতি বিরুদ্ধ। বাবা চট্টগ্রামে বদলি আদেশ মেনে নিলেন না। সেখনে জয়েন করবেন না, জানিয়ে দিলেন।

এর পর একই আদেশ এল। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে জানানো হল, আপনি জয়েন না করলে চাকরিচ্যুত করা হবে। বাবা জবাবে লিখলেন অবৈধ আদেশ না মানলে চাকরিচ্যুত করা যায় না।

কিন্তু চাকরিচ্যুতির চিঠি এল। আমার বাবা গেলেন প্রশাসনিক ট্রাইবুনালে। মামলার খরচ অনেক। এদিকে কয়েকমাস বেতন নেই। অল্প অল্প করে জমানো টাকা দিয়ে কেনা জমি বেঁচে এল উকিলের টাকা।

স্কুল শিক্ষিকা আম্মার অল্প বেতনেই চলছে সংসার। আব্বা শুধু ঢাকা রংপুর ছুটে চলেন। উকিলের টাকা দেন। অন্যদের আহারে করছেন কি এর জবাবে বলেন। রাইট অর রঙ! মামলার ডেট হয়। নতুন ডেট হয়। উকিলের খরচ বাড়তেই থাকে। আব্বা মামলাটায় হেরে যান।

আব্বা ট্রাইবুনালে আপিল করেন। আরও জমি বিক্রি হয়। আপিলেও হেরে যায় অসহায় সৎ একজন কর্মচারী।

আব্বা এবার যান হাইকোর্টে। আশা উচ্চ আদালত অন্তত ঠিক বিচার করবে। জমির পর জমি বেঁচে যোগাড় হয় উকিলের খরচ। কিন্তু আম্মার অল্প বেতনে সংসার যেন আর চলে না। আমাদের দেখে মানুষ হাসে। ঈদে আমাদের নতুন জামা নেই। হঠাৎ কেউ একজন পেয়ে যাই। আমাদের ইংলিশ হাফপ্যান্ট এর চেইন নষ্ট হয়ে যায়। হুক খুলে যায়। বোনেরা সেফটিপিন দিয়ে আটকে দেয়। পাশের বাসার বয়সে অনেক বড় সেলি আপুরা চেক করে দেখে প্যান্ট ছেড়া আছে কি না। দুষ্টামি করে গুনা তার দিয়ে প্যান্ট বেধে দিয়ে হাসে। আমরা বুঝি না, ছোট। বোনেরা কষ্ট পায়।

অভাব ঘুচাতে আব্বা হুইল সাবন, ডিটারজেন্ট, তাজা চা এর ডিলারশীপ এর চেষ্টা করেন। জিনিস এনে দোকানে দোকানে দেয়, আমরা বুঝি এবার কিছু টাকা পয়সা আসছে। কিন্তু আব্বার মন ঢাকায়। এটা শুধু মামলা না, চাকরি না। এটা রাইট অর রঙ এর প্রশ্ন। স্বাধীন বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এর প্রশ্ন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। ডিলারশীপের ব্যবসায় মন কম, তাই লস হয়।

আমরা ভাই বোনেরা বড় হচ্ছি। আমাদের স্কুল খরচ আছে। পুষ্টির প্রয়োজন আছে। পাশের বাসার (দিশা আপুর বাবা মা)চাচা চাচী এগিয়ে আসেন! প্রায়ই গরুর দুধ বেশি হয়েছে আজ, বলে আমদের বাসায় পাঠিয়ে দেন।

চাচা আব্বাকে এসে বলেন, ভাই আজ মাছ খাবো। চলেনতো জাল নিয়ে পুকুরে যাই। দিশা আপুদের পুকুরে অনেক মাছ। সপ্তাহে একাধিক দিন সেই মাছ ধরা হয়। নিজেদের খাওয়ার জন্য রেখে চাচা এখানে সেখানে পাঠিয়ে দেন। বেশিরভাগ টা আসে আমাদের বাসায়। আর টাকা ধার তো আছেই।

আব্বা হাইকোর্টেও মামলাটায় হেরে যান। কিন্তু আব্বা দমে যান না। জমি বিক্রির তলানির টাকা কুড়িয়ে আব্বা ঢাকায় আসেন। আপিল বিভাগে যাবেন। তখন আপিল বিভাগে এনলিস্টেড আইনজীবী খুব কম। আব্বার পছন্দ ড. কামাল হোসেন, বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রী, সংবিধানের প্রণেতা। আব্বা দেখা করেন, নিজের লড়াইয়ে গল্প খুলে বলেন। আব্বা ভেবেছিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বঙ্গবন্ধুর এই সাগরেদ তাঁকে জিতিয়ে আনবেন। কিন্তু আইনজীবী হিসেবে মামলা চালতে কয়েক লাখ টাকা চাইলেন ড. সাহেব। আব্বার চোখ মুখ শুকিয়ে গেল। আমাদের শেষ সম্বল জমি আর ভিটে বেঁচতে হবে, তাহলে। তারপরেও যদি হেরে যান! ছেলে মেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে আব্বা ভিটে বেঁচতে পারলেন না। কম পয়সায় আপিল বিভগের আইনজীবী পাওয়া গেল না।

আব্বার লড়াইয়ে গল্প তখন হাইকোর্টের চিপায় চাপায় আলোচনা হয়। অনেকেই জানেন। সেই সময়ের হাইকোর্ট বিভাগের রেজিস্ট্রার আব্বাকে একদিন ডেকে নেন। বলেন, আপিল বিভাগে মামলা আব্বা নিজেই লড়লে, তিনি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করবেন। বাদী হিসেবে আব্বা নিজেই হিয়ারিং এর অনুমতি পান।

আইনের বই ঘাটতে ঘাটতে আব্বা অনুভব করেন, এই মামলায় প্রশাসনিক ট্রাইবুনালে বা হাইকোর্টে তাঁর আইনজীবীরা বিট্রেয়ার ছিলেন। হয়তো থ্রেট বা বিক্রি। আব্বা নিজেই আপিল বিভাগে হিয়ারিং করবেন, সুপ্রিমকোর্টে আইনজীবীরা অনেকেই সেই আলোচনায় ব্যস্ত। আব্বার গল্প অনেকেরই জানা তখন। এতদিনে এরশাদ সরকারের পতন হয়েছে, জামায়াতের ১৮ সিটের সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। আমি স্কুলে ভর্তি হয়েছি।

রাতে ভাত খাবার পর আমরা হাটতে বের হই। আব্বা কলা/সিভিট কিনে দেন।৷ আসার সময় দিশা আপুদের বাসা থেকে অই দিনের পেপার নিয়ে আসি। আমরা নিজেরাও পেপার নেই তখনো, অই দুর্দিনেও। কিন্তু একাধিক পেপার না পড়লে আমাদের বাসার কারো দিনের ভাত হজম হত না।

হাটতে নিয়ে আব্বা প্রতিদিনই নতুন উদাহরণ দিয়ে একই রকম গল্প করেন, ''তোর অমুক চাচা ঘুষ খেয়ে এত টাকা করল, ছেলেটা পাগল, কোনো লাভ হল বল? এইযে তোর বাপ গরীব, কিন্তু তোরা সবাই কত ব্রেনি, কোনটা ভাল বল?

আমরা আব্বার কথায় সায় দেই। মনে মনে কষ্ট থেকে যায়। রংপুর শহরের প্রাণ কেন্দ্রে বাসা আমাদের। পাশে রিকশা ওয়লাদের বাসায় কারেন্ট আছে, আমরা হ্যারিকেন-এর আলোয় পড়ি।

জিলা স্কুলে ভর্তির রেজাল্ট দিল। আমি টিকলাম, কিন্তু সিরিয়াল পেছনে। আমার মন খারাপ। আব্বা বললেন, 'তোর বাপ ভাঙা বাইসাইকেলে তোকে নিয়ে আসছে, তুই টিকছিস, এই তো বেশি। অই যে গড়ি নিয়ে আসছে, টেকে নাই। আমি সান্ত্বনা পাওয়া শুরু করলাম। ১৯৯৩ সাল, আমি ক্লাশ থ্রিতে রংপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হলাম। এর কিছুদিন পর শুনলামঃ আব্বা মামলা জিতছে! সুপ্রিমকোর্ট এর আপিল বিভাগে কোনো আইনজীবী না দিয়ে, নিজে জীবনে প্রথম হেয়ারিং করে আব্বা মামলা জিতে গেছেন! আপিল বিভাগ, আব্বাকে চাকরি ফেরত দিতে বললো। এতদিন চকরি করলে যে বেতন, টাইম স্কেল পেতেন সবসহ।

আব্বার রি-জয়েনিং লেটার আসলো। উনাকে সেই চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টেই জয়েন করতে বলা হল। চিঠিতে এও বলা হল, উনি ডিপার্টমেন্টের নীতি বিরুদ্ধ আচরণ করায় উনকে এক র‍্যাংক ডিমোশন দিয়ে, জুনিয়র অডিটর করা হয়েছে! চলবে...


(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

গলায় লিচুর বিচি আটকে শিশুর মৃত্যু
  • ১২ মে ২০২৬
বিআরটিএর নম্বর প্লেট-আরএফআইডি ব্যবহারের নির্দেশ, আগামী সপ্ত…
  • ১২ মে ২০২৬
ঢাকাসহ দুই জেলায় টানা ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না আজ
  • ১২ মে ২০২৬
চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল
  • ১২ মে ২০২৬
পরিবারের প্রতি ‘ক্ষোভ’ থেকেই মাকে হত্যা, আদালতে সেই ছেলের স…
  • ১২ মে ২০২৬
বোরহানউদ্দিনে মাদ্রাসাছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার
  • ১২ মে ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SUMMER 2026
Application Deadline Wednesday, May 13, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9