বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মানবিক করিডর

২৪ মে ২০২৫, ১২:৪৪ PM , আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৫, ০৭:২১ PM
ড. মো. এরশাদ হালিম

ড. মো. এরশাদ হালিম © টিডিসি সম্পাদিত

স্বাধীন শব্দের সন্ধি বিচ্ছেদ করলে দাঁড়ায় স্ব (নিজ)+অধীন, যা মূলত স্বর সন্ধি। আবার এটিকে ব্যাসবাক্য করলে দাঁড়ায় স্ব (নিজ)-এর অধীন। তখন সমাসের নাম হয় ষষ্ঠী তৎপুরুষ। অতএব বাংলা ব্যাকরণ অনুসারে স্বাধীনতা শব্দের ভাবার্থ দাঁড়ায় নিজের অধীনতা। ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীগত স্বাধীনতা সব ক্ষেত্রেই স্বাধীনতার এই তত্ত্বটি হতে পারে প্রযোজ্য। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রেও সংজ্ঞাটি এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। অন্যথায় স্বাধীন শব্দটির নেপথ্যে লুকায়িত এই গূঢ় রহস্যটি বুঝতে ব্যর্থ হলে স্বাধীনতার ছদ্মাবরণে পরাধীন কোন সম্প্রদায়ও বোকার স্বর্গে থেকে স্বাধীনতার অলীক স্বাদ আস্বাদনের আত্মতৃপ্তি লাভ করতে পারে।

কোন ব্যক্তি স্বাধীন এ কথার সারমর্ম দাঁড়ায়, ঐ ব্যক্তি ব্যক্তিগত, সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল পর্যায়ে সংবিধান সিদ্ধ আইনকানুন ও প্রথাগত সকল রীতি-নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা, নিয়ন্ত্রিত আবেগ ও সুস্থ বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়ে সত্য সরল পথে থেকে নিজ দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পাদনে সচেষ্ট থাকে এবং জীবন উপভোগ করে। অতিরিক্ত আবেগ, প্রবৃত্তির ধোঁকা, পঞ্চ রিপুর তাড়না--কোনোটাই তাকে বশীভূত করতে পারে না। সর্বদা বিরত থাকার চেষ্টা করে স্বীয় নফস প্রসূত সকল কামনা-বাসনা থেকে। আর যদি সেটা করতে না পারে তবে স্বেচ্ছাচারিতার ছদ্মাবরণে কোন ব্যক্তির মনগড়া স্বাধীনতাকে ব্যক্তি স্বাধীনতা বলা যাবে না বরং সেটা হবে রাষ্ট্র, সমাজ বা পরিবার কর্তৃক প্রদত্ত বলবৎ স্বাধীনতার অপব্যবহার মাত্র। স্বাধীনতার এই দর্শনটি ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই হতে পারে প্রযোজ্য। তা না হলে অর্জিত স্বাধীনতা ডেকে আনতে পারে বিশৃঙ্খলা, প্রলয়যজ্ঞ ও অশান্তির দাবানল যেটা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে উন্মুক্ত করে দিতে পারে বিদ্যমান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হরণের দ্বার পর্যন্ত। এ কারণেই বলা হয়ে থাকে স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে এটা রক্ষা করা অনেক বেশি দুরূহ। 

রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা বলতে হয়তবা আমরা কোন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমারেখা এবং সার্বভৌমত্বকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে নিরাপদ রাখাকেই বুঝি। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে যাচাই করলে প্রতীয়মান হবে যে, বিষয়টা আসলে পুরোপুরিভাবে এমন নয়। এমনকি স্বাধীনতা পরবর্তীকালে কোন দেশে জনগণের মুক্তিসংগ্রামের মূল উদ্দেশ্য যদি বাস্তবায়িত না হয় তবে সেটাও হতে পারে অর্জিত স্বাধীনতার মূলে কুঠারাঘাত সমতুল্য। কোন রাষ্ট্র স্বাধীন ও সার্বভৌম এ কথার অর্থ দাঁড়ায়, ঐ রাষ্ট্রটি সব রকমের বিদেশি আগ্রাসন ও প্রভাব বলয় থেকে পুরোপুরি মুক্ত এবং সেখানে দেশ পরিচালনায় নিয়োজিত আছে জনগণের সরকার। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দেশের শাসনতন্ত্র তৈরি করে এবং প্রণীত সংবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করে যেখানে রাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে, অর্থাৎ আপামর জনতাই সরকারের সকল ক্ষমতার উৎস। রাষ্ট্র পরিচালনায় সেখানে পদে পদে পরিলক্ষিত হয় জনগণের নিকট নির্বাচিত সরকারের পূর্ণ জবাবদিহিতা। মূলত গণতান্ত্রিক ভাবধারার এমন একটি পরিবেশই কোন রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপহার দিতে পারে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বাস্তব অবয়ব যেখানে রাষ্ট্রের সকল স্তরের জনগণ আস্বাদন করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির প্রকৃত স্বাদ। 

এর ব্যতিক্রম কিছু ঘটলে জনগণ অর্জিত স্বাধীনতার সুফল কখনোই ভোগ করতে পারে না। রাষ্ট্রের জনগণ স্বাধীনতার ছদ্মাবরণে পরাধীনতার শিকলেই বন্দী থেকে যায় যেখানে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা চরমভাবে উপেক্ষিত হয়, লঙ্ঘিত হয় মানবাধিকার। ফলশ্রুতিতে সরকার এক সময় হয়ে পড়ে গণবিচ্ছিন্ন ও পররাষ্ট্র নির্ভর। সরকার ও জনগণের দূরত্বকে পুঁজি করে এই সুযোগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এগিয়ে আসে তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে। বিশ্ব মোড়ল ও তাদের সহযোগী আঞ্চলিক সুপার পাওয়ারগুলো বন্ধুত্বের ছদ্মাবরণে অগ্রসর হয় তাদের অসৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে। এমনকি সেটা হতে পারে কোন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হরণের মত হীন চক্রান্ত পর্যন্ত।

তাই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যেকোনো জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা সংকট সমাধানের প্রাক্কালে দেশের সরকার ও প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর এক টেবিলে বসার কোন বিকল্প নাই। কারণ রাজনৈতিক নেতাদের সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্য দিয়েই সরকার পেতে পারে যথাযথ দিক-নির্দেশনা যেখানে রাষ্ট্রের জনগণের চাওয়া-পাওয়ার বাস্তবায়ন ঘটে। এক্ষেত্রে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের পাশাপাশি  নিজেদের অভ্যন্তরীণ অতীতের সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দেয়া উচিত। অন্যথায় জাতীয় সংহতির ব্যত্যয় ঘটলে অপ্রত্যাশিত কোন হুমকির হাতছানি দুমড়ে মুচড়ে দিতে পারে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতাকে। 

বর্তমানে মিয়ানমারের স্বাধীনতাকামী রাখাইন সম্প্রদায় কর্তৃক স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চলমান যুদ্ধ সহায়তায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মানবিক করিডর প্রদানের  চিন্তাভাবনাও দেশে আবার নতুন করে কোন সামরিক অভ্যুত্থান, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গোলযোগ কিংবা বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক বিশ্ব মোড়ল ও তাদের সহযোগী বা প্রতিপক্ষ হিসাবে পরিচিত আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর মদদে উদ্ভূত বহুমাত্রিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে উসকে দিতে পারে, যার বলির শিকার হবে দেশের কোটি কোটি জনগণ। লুণ্ঠিত হবে তেল-গ্যাসসহ দেশের সকল প্রাকৃতিক সম্পদ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানা ঠিক যেভাবে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পূর্বে ও পরে বন্ধু দেশ কর্তৃক লুটপাটের শিকার হয়েছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদের পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্পকারখানা ও বিপণি বিতানগুলো। 

উপরন্তু নতুন করে প্রলয় যজ্ঞের শিকার হবে দেশের যুব সমাজ, সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সকল প্রশাসনিক ইউনিট এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ। হরিলুটের আওতায় আসবে ব্যাংক-বিমা ও শেয়ার বাজারের মত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির মূল স্তম্ভগুলো। সমাজে বিষ-বাষ্পের মত ছড়িয়ে পড়বে বৈদেশিক অপসাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও মানুষের নৈতিক স্খলন। সুযোগটিকে ব্যাটে-বলে কাজে লাগিয়ে দেশে সৃষ্টি হবে বিগত ১৫ বছরের মত সরকার ও বিদেশিদের উচ্ছিষ্টভোগী একটি নব্য বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় যারা সরকারের প্রশাসনিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে দুর্বার গতিতে দেশকে নিয়ে যাবে মহাপ্রলয়ের দ্বার প্রান্তে।

ফলশ্রুতিতে চলমান রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় দুর্বৃত্তায়নের জের ধরে একসময় দেশ অগ্রসর হবে রাষ্ট্রীয় দেউলিয়াপনা ও অকার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে। দেশীয় কুশীলবদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা বিদেশি শকুনদের কালো থাবা অদূর ভবিষ্যতে দেশটির মানচিত্রকে করে দিতে পারে খণ্ডবিখণ্ড। 

অন্যদিকে বিদেশি বন্ধুদের কোন টোপ গেলার আগে শতবার ভাবতে হবে এত প্রেম-ভালোবাসা দেওয়া-নেওয়া কতটা সমীচীন। কারণ আদার (খাবার) ধরার নিমিত্ত বড়শির টোপ গেলার আগ পর্যন্ত মাছ জানতেই পারে না সেখানে তার জন্য কোন মরণ ফাঁদ অপেক্ষা করছে। অন্যভাবে বলা যায়, স্বামীর ভালোবাসায় সিক্ত সুখের সংসার চলাকালে পরকীয়া প্রেমিকগণ বিশ্বাস প্রবণ অবলা নারীদের ছলেবলে অনেক স্বপ্নই দেখায় কিন্তু সর্বস্ব লুটে নেয়ার পর ভণ্ড প্রেমিকগণ শেষ পর্যন্ত প্রতারণার ফাঁদে পা দেয়া বেয়াকুব নারীদের অসতী বলে গালি দেয়। এটাই নির্মম বাস্তবতা, বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত পরিণতি। 

রাষ্ট্রের জনগণের সাথে সরকারের হীন স্বার্থ প্রসূত যেকোনো দ্বিমুখী আচরণও শাসক গোষ্ঠীর জন্য একই পরিণতি ডেকে আনে এবং সেক্ষেত্রে বলির পাঠা হয় রাষ্ট্রের নিরীহ জনগণ। আর জাতীয় বিপ্লব পরবর্তী মনোনীত সরকার যদি হয় অনভিজ্ঞ বা আনাড়ি তবে তো কথাই নাই। মেঘ না চাইতেই চলে আসতে পারে মৌসুমী বাতাস তাড়িত বজ্র-বৃষ্টি। দেশবাসীর সাথে সিকিমের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী লেন্দুপ দর্জির বিশ্বাসঘাতকতা ও করুন পরিণতি আমাদের সে বার্তাই দেয়। কারণ সৃষ্টিকুলের কোনো পূজারীই শেষ পর্যন্ত অস্তগামী সূর্যের পূজা করে না।

অতএব, জুলাই '২৪ বিপ্লব পরবর্তী বর্তমান শাসক গোষ্ঠীকেও অনুধাবন করতে হবে এত এত বিদেশি পুরস্কার, সম্মাননা ও লাল গালিচা সংবর্ধনার নেপথ্যে বিদেশি মোড়লদের কোন সুপ্ত বাসনা লুকায়িত আছে কিনা। সেটা বুঝতে ব্যর্থ হলে দেশ আবার নতুন করে হতে পারে বিশ্ব মোড়ল কিংবা পুরাতন বা নতুন কোন আঞ্চলিক পরাশক্তির করদ রাজ্য। বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি পরিণত হতে পারে গাঁজার ন্যায় আগুনে পোড়া নতুন কোন ভূ-খণ্ডে যেখানে বাতাসে ভেসে বেড়াবে মনুষ্য দেহের পোড়া মাংসের দুর্বিষহ গন্ধ।

অতএব, জাতীয় রাজনৈতিক নেতাদের দেশপ্রেম ও দূরদর্শিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের লালন ও  যথাযথ অনুশীলন, এবং দেশের জনগণের সর্বাত্মক সংহতিই হতে পারে তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত ও দুই লাখ বীরাঙ্গনার সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মূল রক্ষা কবচ। ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতা আমাদের এই শিক্ষাই দেয়।

লেখক: অধ্যাপক ও গবেষক, সিন্থেটিক অর্গানিক কেমিস্ট্রি এ্যান্ড কম্পোজিট ম্যাটেরিয়ালস, রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

৩৯ বছর পর ম্যানসিটির ১০ গোলের তাণ্ডব, লন্ডভন্ড এক্সটার সিটি
  • ১১ জানুয়ারি ২০২৬
বল বাসার চালে পড়ায় গরম পানি নিক্ষেপ; দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে …
  • ১১ জানুয়ারি ২০২৬
সুখটান দেওয়া বিড়ির মধ্যেও দাঁড়িপাল্লার দাওয়াত: বিতর্কিত …
  • ১১ জানুয়ারি ২০২৬
নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের স্বপ্নে ‘আরেকবার চেষ্টা করে দেখার…
  • ১১ জানুয়ারি ২০২৬
চট্টগ্রামে সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার
  • ১১ জানুয়ারি ২০২৬
ফেনীতে পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৭৫টি মোটরসাইকেল ও সিএনজি জব্দ
  • ১১ জানুয়ারি ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SPRING 2026
Application Deadline Wednesday, 21 January, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9