প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চ্যালেঞ্জ: প্রসঙ্গ শিক্ষা-দুর্নীতি

১৬ মার্চ ২০২৬, ০৩:৫৬ PM
 প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম

প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে শিক্ষা খাতের দুর্নীতি কেবল একটি প্রশাসনিক বিচ্যুতি নয়, বরং এটি একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার শামিল। দীর্ঘমেয়াদী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাওয়া এই দুর্নীতি নির্মূল করা বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় এবং জটিল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একটি রাষ্ট্র যখন তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিক ও কারিগরিভাবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তখন তার সামগ্রিক উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়ে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুর্নীতির যে ক্লেপটোক্র্যাটিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিস্তৃত।

১. 
সাধারণত ধারণা করা হয় শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করে এবং নৈতিকতার পথে পরিচালিত করে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে যে, শিক্ষিত সমাজই দুর্নীতির প্রধান কারিগর এবং রক্ষক হিসেবে কাজ করছে। ফাইল আটকে রাখা, নিয়োগ বাণিজ্য এবং মেগা প্রকল্পের টাকা আত্মসাতে উচ্চশিক্ষিত আমলা ও কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার বিষয়টি এখন একটি ওপেন সিক্রেট। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বর্ণনা করেছিলেন: A man who has never gone to school may steal from a freight car; but if he has a university education, he may steal the whole railroad. অর্থাৎ ‘‘একজন অশিক্ষিত চোর বড়জোর একটি মালবাহী গাড়ি চুরি করতে পারে, কিন্তু একজন শিক্ষিত চোর আস্ত একটি রেলপথ চুরি করে ফেলার ক্ষমতা রাখে।’’

উচ্চশিক্ষিত নাগরিকদের দুর্নীতির প্রবণতা নিয়ে করা গবেষণাগুলো নির্দেশ করে যে, কেবল ডিগ্রি অর্জন নৈতিকতার নিশ্চয়তা দেয় না। বিশেষ করে পেরুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর করা একটি গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, মাছিয়াভেলিবাদ (Machiavellianism) এবং সাব-ক্লিনিক্যাল সাইকোপ্যাথির (Sub-clinical psychopathy) মতো ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলো দুর্নীতির ইচ্ছাকে বাড়িয়ে দেয়। যখন কোনো শিক্ষিত ব্যক্তি দেখেন যে পুরো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিস্টেমটিই দুর্নীতিগ্রস্ত, তখন তিনি ব্যক্তিগত লাভের জন্য সিস্টেমকে ব্যবহার করতে প্রলুব্ধ হন। এই পরিস্থিতিকে নরমেটিভ উইকনেস (Normative weakness) বা নৈতিক শিথিলতা বলা হয়, যেখানে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ না থাকায় দুর্নীতি একটি সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়। উন্নত বিশ্বে মেধা ও নৈতিকতাকে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ মনে করা হয়। সেখানে শিক্ষিত হওয়া মানেই দেশের আইন ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি দীর্ঘস্থায়ী প্র্যাকটিস বা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ‘শিক্ষিত চোর’দের সিন্ডিকেট ভেঙে একটি নৈতিক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা।

২.
তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও নীতিগত অবস্থানের মূল ভিত্তি হলো বীর-উত্তম মুক্তিযোদ্ধা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন। এই দুই নেতার কর্মপদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা জনস্বার্থে অত্যন্ত নমনীয় ছিলেন কিন্তু দুর্নীতির প্রশ্নে ছিলেন হিরন্ময় কঠোর। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন, তেমনি কাজে গাফিলতি বা দুর্নীতি দেখলে কাউকে ছাড় দিতেন না। তিনি খাল কাটা কর্মসূচি বা গণশিক্ষার মাধ্যমে দেশে উন্নয়নের জোয়ার এনেছিলেন। তার শাসনকাল ছিল মূলত ‘পলিটিক্স অফ প্রোডাকশন’ বা উৎপাদনমুখী রাজনীতির যুগ, যেখানে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই কেবল দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে পারে। তিনি সর্বদা স্বজনপ্রীতি এড়িয়ে চলেছিলেন। তার শাসনামলে দুর্নীতিগ্রস্তরা ভীত সন্ত্রস্ত থাকত। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারী শিক্ষার প্রসারে বাংলাদেশে একটি নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। ১৯৯৪ সালে তার সরকারের চালু করা ছাত্রীদের উপবৃত্তি ও অবৈতনিক শিক্ষা কর্মসূচি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। এটি কেবল শিক্ষার হার বাড়ায়নি, বরং বাল্যবিবাহ রোধ এবং তৈরি পোশাক খাতের (RMG) জন্য একটি দক্ষ নারী জনশক্তি তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। গবেষণা বলছে, খালেদা জিয়ার আমলের শিক্ষা সংস্কারের ফলে তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ ৭০ শতাংশে পৌঁছেছিল এবং এই খাতে ২৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়েছিল।

তারেক রহমানকে এই দুই নেতার সমন্বয়ে এগোতে হবে—অর্থাৎ জনগণের প্রতি মানবিক ও সংবেদনশীল কিন্তু অপরাধীদের প্রতি বজ্রকঠিন। বিশেষ করে শিক্ষা খাতের মাফিয়া চক্র দমনে তাকে শহীদ জিয়ার মতো কঠোর প্রশাসনিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

৩. 
শিক্ষা খাতে দুর্নীতি এখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। বর্তমান প্রশাসনের জন্য প্রধান বাধাগুলো হলো শেখ হাসিনার আমলের অবক্ষয় এবং সিস্টেমিক লুপহোল। বিগত ১৭ বছর পাঠ্যপুস্তক(এনসিটিবি) প্রণয়নে ব্যাপক দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে। এমনকি ড. ইউনূসের আমলেও এনসিটিবি’র দায়িত্ব প্রাপ্ত উপদেষ্টাসহ অন্যরা সরকারি তহবিল তছরুপ করেন। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ থেকে শুরু করে নিয়োগ বাণিজ্যে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। উপরন্তু গত কয়েক দশকে প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। এটি কেবল মেধার অবমূল্যায়ন নয়, বরং পুরো প্রজন্মের নৈতিক ভিত্তি নষ্ট করার একটি নীল নকশা। এই চক্রের সাথে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনা তারেক রহমানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এই সিন্ডিকেটগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক ছাতার নিচে অবস্থান করে। শিক্ষা প্রশাসনে বদলি এবং শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে বিশাল অংকের লেনদেন হয়, তা শিক্ষার মানকে তলানিতে নিয়ে ঠেকিয়েছে। যোগ্য শিক্ষকের বদলে যখন আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিরা শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন, তখন তারা পাঠদানের চেয়ে টাকা উসুল করাতেই বেশি আগ্রহী থাকেন। এই পদ্ধতিগত দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে একটি মেধাভিত্তিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া (Meritocracy) গড়ে তুলতে হবে।

তারেক রহমানের সামনে অন্যতম বড় পরীক্ষা হলো নিজের দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা। বিগত ১৭ বছর ধরে বিএনপির ত্যাগী নেতা-কর্মীরা নজিরবিহীন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। বর্তমানে তাদের মধ্যে এক ধরনের পাওনা আদায়ের মানসিকতা তৈরি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীকে নিশ্চিত করতে হবে যে, দলের কেউ যেন শিক্ষার পবিত্রতা নষ্ট না করে এবং কোনো প্রকার দখলদারিত্ব বা নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে না পড়ে। শিক্ষা বাজেট ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিশাল অর্থ লুটপাট বন্ধ করা একটি বড় কাজ। স্কুল-কলেজের ভবন নির্মাণ বা ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ দুর্নীতি হয়, তা বন্ধে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রিয়েল-টাইম অডিট সিস্টেম চালু করা প্রয়োজন। তারেক রহমানের দর্শন অনুযায়ী, শুধু ভবন নির্মাণ শিক্ষা নয়, প্রকৃত মানুষ গড়াই হবে রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য। এজন্য তিনি ৩১-দফা সংস্কার কর্মসূচিতে শিক্ষার আমূল পরিবর্তনের কথা বলেছেন।

৪.
পাঠ্যপুস্তকে শুধু তথ্য নয়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। শিক্ষাবিদরা বলেছেন, ‘‘শিক্ষা যদি মানুষের চরিত্র গঠন করতে না পারে, তবে সেই শিক্ষার কোনো মূল্য নেই।’’ তারেক রহমানের সরকার পাঠ্যক্রমে এমন সব অধ্যায় যুক্ত করতে চায় যা শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই দেশপ্রেম, সততা এবং অন্যের প্রতি সহমর্মিতা শেখাবে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে 'লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস' বা আনন্দময় শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা হবে। এতে মুখস্থ বিদ্যার বদলে দলীয় কাজ (Group work), ব্যক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হবে। এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমিয়ে সৃজনশীল হতে সাহায্য করবে। বৈশ্বিক বাজারের সাথে তাল মেলাতে মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া আরবি, জাপানি, কোরিয়ান এবং মান্দারিনের মতো ভাষা শিক্ষা চালু করার মাধ্যমে বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির পথ সুগম করা হবে।

৫. 
তারেক রহমান প্রায়শই উন্নত বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে থাকেন। ফিনল্যান্ড, জাপান এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো কীভাবে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বসেরা এবং দুর্নীতিমুক্ত করেছে, তা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে শিক্ষকদের মর্যাদা রাষ্ট্রপ্রধানদের সমান এবং তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া অত্যন্ত কঠোর। শিক্ষকরা ক্লাসরুমে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করেন, যার ফলে তারা প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধা অনুযায়ী পাঠদান করতে পারেন। সেখানে দুর্নীতি নেই বললেই চলে কারণ তাদের শিক্ষায় 'স্বচ্ছতা' (Transparency) এবং 'জবাবদিহিতা' (Accountability) ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়। জাপানিরা শিক্ষিত হওয়ার আগে শেখে 'শিষ্টাচার' (Etiquette) এবং 'নৈতিকতা' (Ethics) । একজন জাপানি নাগরিক মনে করেন, দুর্নীতি করা মানে নিজের দেশের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা। তাদের কাছে "দেশপ্রেম মানেই হলো সততা।’’ জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থার এই নৈতিক ভিত্তিই তাদের একটি আধুনিক ও সুশৃঙ্খল জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছে। লি কুয়ান ইউ (১৯২৩-২০১৫) যখন সিঙ্গাপুরের দায়িত্ব নেন, তখন সেখানে চরম দুর্নীতি ছিল। তিনি শিক্ষা নীতিতে পরিবর্তন এনে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণ করে দেশটিকে বদলে দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, শিক্ষিত সমাজ যদি সৎ হয়, তবে একটি দ্বীপ রাষ্ট্রও বিশ্বের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হতে পারে।

৬. 
বর্তমান সরকারের ডিজিটাল রূপকল্পের একটি বড় অংশ হলো শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। প্রযুক্তি কেবল পাঠদানে নয়, বরং দুর্নীতি দমনেও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। সনদ জালিয়াতি এবং ডিগ্রি টেম্পারিং রোধে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার বর্তমানে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। কাজাখস্তানের ইন্টারন্যাশনাল ইনফরমেশন টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি (IITU) তাদের ভেরিফিকেশন সিস্টেমে ব্লকচেইন এবং এআই ব্যবহারের মাধ্যমে ভেরিফিকেশন সময় ৮৫% কমিয়ে এনেছে। তারেক রহমানের সরকার বাংলাদেশে এই প্রযুক্তি প্রবর্তন করতে পারে, যার ফলে কোনো কর্মকর্তা বা অসাধু চক্র সনদে কারসাজি করতে পারবে না। শিক্ষা প্রশাসনের বদলি, পদোন্নতি এবং প্রকল্প বরাদ্দ পুরোপুরি অনলাইন বা ই-সার্ভিসের অধীনে নিয়ে এলে দুর্নীতির সুযোগ 'শূন্যের কোঠায়' নেমে আসবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ই-গভর্নেন্স বা ডিজিটালাইজেশন দুর্নীতির সুযোগ ৩০-৬০% পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। এটি প্রশাসনিক জটিলতা কমাবে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘব করবে।

৭. 
আগেই বলেছি, বিগত ১৭ বছর ধরে বিএনপির ত্যাগী নেতা-কর্মীরা নজিরবিহীন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। বর্তমানে তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রত্যাশা এবং একই সাথে হতাশা বিরাজ করছে। তারেক রহমানের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো এই বড় জনশক্তিকে দেশ গড়ার কাজে লাগানো এবং তাদের ক্ষোভকে সৃজনশীল শক্তিতে রূপান্তর করা। দল ও রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে যদি সঠিক সমন্বয় না থাকে, তবে সরকারের কোনো সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না। ত্যাগী কর্মীদের অবমূল্যায়ন করলে বা তারা যদি প্রশাসন থেকে দূরে সরে যায়, তবে সরকারের পতন ত্বরান্বিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তারেক রহমান তাই 'ফ্যামিলি কার্ড' এবং 'ফার্মার কার্ড'-এর মতো কর্মসূচি নিয়ে এসেছেন যা তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তারেক রহমানের ৩১-দফায় দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ এবং একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী পদে দুই মেয়াদের বেশি না থাকার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদী স্বৈরতন্ত্র ও দুর্নীতি রোধে একটি মাইলফলক হতে পারে। এটি ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করবে এবং শিক্ষা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে একক ব্যক্তির হস্তক্ষেপ বন্ধ করবে।

৮. 
প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, শিক্ষা খাতে দুর্নীতি দমন করতে ব্যর্থ হলে পুরো জাতি মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। তাকে হতে হবে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদের মতো কঠোর ও ভিশনারি। মাহাথির মোহাম্মদ তার 'লুক ইস্ট' পলিসির মাধ্যমে মালয়েশিয়ানদের মধ্যে জাপানি ও কোরিয়ানদের মতো কঠোর পরিশ্রম এবং সততা ফিরিয়ে এনেছিলেন। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তারেক রহমানও তার বক্তব্যে বারবার একটি স্বনির্ভর ও মেধাবী প্রজন্মের কথা বলছেন, যারা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। মাহাথিরের দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে আপসহীন অবস্থান নিয়েছিলেন, তা তারেক রহমানের জন্য একটি বড় উদাহরণ হতে পারে। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন যে, দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকলে দলের বা পরিবারের কেউ রেহাই পাবে না। তারেক রহমানকেও একই রকম কঠোর বার্তা দিতে হবে যে, শিক্ষার মতো পবিত্র খাতে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।

৯. 
শিক্ষা খাতের দুর্নীতি একটি সংক্রামক ব্যাধির মতো যা জাতির প্রাণশক্তি শুষে নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে এখন ইতিহাস গড়ার সুযোগ। তিনি যদি শহীদ জিয়ার সেই বিখ্যাত উক্তি—"ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়"—শিক্ষা খাতে বাস্তবায়ন করতে পারেন, তবে বাংলাদেশ একটি স্বর্ণালী যুগে প্রবেশ করবে। শিক্ষিত সমাজকে দুর্নীতির মরণনেশা থেকে মুক্ত করে দেশপ্রেমিক ও সৎ নাগরিকে রূপান্তর করা কেবল সরকারের একার কাজ নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকেই সেই আন্দোলনের সেনাপতির ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার, কঠোর প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং নৈতিক শিক্ষার সমন্বয়ে তিনি যদি একটি নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা উপহার দিতে পারেন, তবে বাংলাদেশের মানুষ তাকে আধুনিক মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদের মতোই মনে রাখবে।

পরিশেষে, দক্ষিণ আফ্রিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বারে উৎকীর্ণ সেই অমোঘ বাণীটি তারেক রহমানের জন্য একটি চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে: ‘‘একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য কোনো পারমাণবিক বোমা বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন নেই। শুধু তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মান কমিয়ে দিলেই হবে এবং পরীক্ষায় নকল বা দুর্নীতির সুযোগ করে দিলেই হবে।’’ এই সত্যটি উপলব্ধি করে তারেক রহমান যদি শিক্ষা খাতকে কলুষমুক্ত করতে পারেন, তবেই একটি সমৃদ্ধ ও টেকসই বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। শিক্ষা হোক চরিত্রমুখী, প্রযুক্তি হোক স্বচ্ছতার হাতিয়ার এবং সুশাসন হোক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে বাংলাদেশ সেই লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হবে—এটাই আজ সমগ্র জাতির প্রত্যাশা।

লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের শিকড় ভুলে গেলে ৫ আগস্ট বারবার ফিরে আসবে: সমাজকল্যাণ …
  • ১৬ মার্চ ২০২৬
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য ড. রইছ উদ্‌দীন
  • ১৬ মার্চ ২০২৬
হরমুজ প্রণালিতে ন্যাটোর ভূমিকা দেখছে না জার্মানি
  • ১৬ মার্চ ২০২৬
গলাচিপায় খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন নুর
  • ১৬ মার্চ ২০২৬
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হতে ন্যূনতম যোগ্যতা স্নাতক পাস
  • ১৬ মার্চ ২০২৬
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হলেন ড. আল ফোরকান
  • ১৬ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence