ভালোবাসার কত রূপ! কত নিদর্শন!

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:৪৩ PM
মো. মাহফুজুর রহমান 

মো. মাহফুজুর রহমান 

আমাদের ছোট বেলার সাথে এখনকার ছোট বেলার যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান তা বহুবার আমরা স্মরণ করি। স্মৃতিচারণ করি। ভালোবাসা দিবসে সেই স্মৃতিচারণটা হয় একটু অন্য রকমভাবে। আমরা যখন স্কুলে পড়ি, আজ থেকে প্রায় আঠারো-বিশ বছর আগের কথা। তখন ভালোবাসা দিবস এই উপমহাদেশে আড়মোড়া দিয়ে ওঠছে কেবল। দেখতাম এলাকার বড় ভাইয়েরা হাতের কবজিতে ‘এসিড পাতা’ দিয়ে তার প্রিয়তমার নাম লিখত। পাতাগুলোকে প্রিয়তমার নামের অক্ষরের মত করে হাতের কবজির মধ্যে লাগিয়ে রাখত বেশ কয়েকদিন। পাতাগুলো তুলে ফেলার পর দেখতাম হাতের কোমল চামড়ায় ঘন কালো-বাদামী এক দাগরেখা রয়েছে অক্ষররূপে। তবে প্রিয়তমারা কী পর্দার আড়ালে এই কাণ্ড করতেন কিনা তা জানা ছিলো না। এটা ছিল এক প্রকার আবেগ যা ভালোবাসারই বিচিত্র এক রূপ। আর হাতে এসিড পাতার এই নাম ছিল বিচিত্র এক নিদর্শন। এই তথাকথিত ‘এসিড পাতা’ যে আসলে কোন নামের গাছ তা তখনও জানতাম না। এখনও জানি না। আর জানা হবেও না বোধহয়। ‘ভ্যালেন্টাইনস-ডে’ আসলে ভাবতাম ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’র ইংরেজি পরিভাষা বোধহয় এই ‘ভ্যালেন্টাইনস-ডে’। সঠিক অনুবাদ জানতে সময় নিয়েছিল অনেক দিন। ততদিনে ভালোবাসার সাগরে অনেক সাঁতরিয়েছি। ডুবে ডুবে অনেক জল খেয়েছি। অনেক জল ঘোলা করেছি। ভ্যালেন্টাইনের আসল কাহিনী এখন আর বলার প্রয়োজন নেই। মিডিয়ার বদৌলতে তা আজ প্রায় সবাই জানে অল্প-বিস্তর।

আমাদের সময় একটা ছেলে একটা মেয়েকে দেখলে বা একটা মেয়ে যদি একটা ছেলেকে দেখত, আর তখন যদি খানিকটা ভালোলাগার অনুভূতি প্রকাশ পেত, তাহলে একজন আরেকজনকে নিয়ে ভেবে ভেবেই চলে যেত মাসখানেক। এরকম কতশত অনুভূতির বেড়াজালে পড়ে পড়ে আবার যে ছুটে এসেছি তার কোন হিসেব নেই। হিসাব দিতেও পারবো না, অসম্ভব। সুন্দর হাতের লেখার চিঠিরও কদর নেই এখন। অথচ একসময় এই প্রেম-ভালোবাসার নিবেদনস্বরূপ কতশত প্রতিভাবান কবি-সাহিত্যিকের আবির্ভাব ঘটত! সুন্দর হাতের লেখা দিয়ে একটি চিঠি ভরে তুলত আমাদের প্রেমিক ভাইয়েরা। একটা চিঠি লিখতে গিয়ে একটা ডায়েরীর পাতা ছিড়ে ছিড়ে ঘরের মেঝেতে ফেলে ট্রাফিক জ্যাম লাগিয়ে দিত। চিঠি লেখার সেই অভ্যাস আজ কোথায় হারিয়ে গেল? টিকে আছে শুধু পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে চিঠির উপর নির্ধারিত দশ নম্বর। যেটার জন্য আবার সাজেশনও করতে হয়। গত বছর ক্লাসে একবার ‘প্রেমপত্র’ লিখেতে দিয়েছিলাম দেখার জন্য যে, আমার শিক্ষার্থীরা কতটুকু নিজের সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে লিখেতে পারে। মাত্র দু’জন তা সুন্দর করে দেখাতে পারলো। অন্যদের কাছে মনে হল যে, স্যার যদি এটা না দিয়ে মেসেঞ্জারে চ্যাট করার প্রতিযোগিতা দিতেন তাহলে বোধহয় ভালো করতাম। আমাদের যুগের সেই সুন্দর হাতের লেখা চিঠিটা ছিল ভালোবাসার এক অনন্য শৈল্পিক নিদর্শন।

এখন যুগ বদলিয়েছে। ক্রিয়ার কালও বদলিয়েছে। একসময় আকাশের আধখানা চাঁদ মুখের সাথে প্রিয়তমার মুখ মেলানো হতো। আর এখন রাতের বেলা শুয়ে শুয়ে ফেসবুক আর মেসেঞ্জারের স্ক্রিন থেকে চোখ সরানো যায় না। একসময় সুন্দর জিনিস দেখে বলতাম অপূর্ব! অসাধারণ। আর এখন বলতে হয় OMG!(Oh My God). এটা একধরণের ফেসবুকের ভাষা। সমাজ বদলানোর সাথে সাথে মনে হচ্ছে সম্পর্কের কাঠামোও বদলাচ্ছে। একসময় কল্পনা আর স্বপ্ন দেখে দেখে দেখে চিঠি আদান প্রদান করে সম্পর্ক গড়ত অনেক দিনে। এর ভাঙনে বিরহও হতো বেশ। আর এখন সম্পর্ক গড়ে খুব দ্রুত গতিতে।। আর ভাঙে আরও দ্রুত গতিতে। আমি না হয় আমাদের যুগের কথা বললাম। যারা আমার চেয়েও বয়সে অনেক বড়, তাদের সময়ের প্রেম ছিল আর বিচিত্র। আরও ঐতিহাসিক যা আমাদের আন্দাজে ধরবে না। আসলে ‘ভালোবাসি’ কথাটি সে সময় বলতে হতো না। ভালোবাসা হয়ে যেত চোখের দেখাতেই।

বয়স আমার খুব বেশিও না। খুব কমও না। তিরিশ পেরিয়েছে বটে। প্রায় আড়াই যুগ দেখেছি এই ক্ষুদ্র জীবনে। যে দেখাতে ‘ভালোবাসা’ নামক শব্দটির পরিধি অনেক বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে। ছোট থেকেই আমরা ভালোবাসার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এই ভালোবাসা শুধু বিপরীত লিঙ্গের প্রতি নয়। ভালোবাসা শুরু হয় পরিবার থেকেই। যখন থেকে একটা ছোট্ট শিশু জন্ম নেয়, তখন থেকেই তার সাথে ‘ভালোবাসা’ শব্দটি লেগে থাকে। প্রিয় সন্তানের মুখ দেখে আর সাধ মেটে না পিতা-মাতার। রাতে সে ঘুমালেও তার দিকে তাকিয়ে রয় তার গর্ভধারিণী মা। হাজার স্বপ্নের মালা বুনা হয় তাকে নিয়ে। এর নাম আবেগমাখা ভালোবাসা। এটা পৃথিবীতে একজন মানুষের জন্য ভালোবাসার প্রাথমিক রূপ। অমূল্য ভালোবাসা। বিশুদ্ধ ভালোবাসার স্পন্দন তখন শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে যাতায়াত করে। এ ভালোবাসা শরীরের রক্ত দিয়ে গড়া সম্পর্কের এক অদ্বিতীয় নিদর্শন। তাইতো বলতে পারি যে, স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর নিদর্শন হচ্ছে তাদের সন্তান।

একজন মানুষ শিশু থেকে বড় হওয়ার সাথে সাথে আরও কয়েকরূপের ভালোবাসাকে সঙ্গী করে। তৈরি হতে থাকে পারিবারিক দায়বদ্ধতা। গাছের সাথে শিকড়ের সম্পর্ক যেমন স্থায়ী হয়, তেমন করে পরিবারের সাথে নিজের অস্তিত্ব মিশে যেতে থাকে। বই খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার সাথে সাথে একটি শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে আরম্ভ করে। অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে ক্ষণে ক্ষণে। চাহিদাও তৈরি হয় আস্তে আস্তে। সমাজের সব মানুষের সাথেই সে তখন ভালোবাসার ভাগাভাগি করে। এ ভাগাভাগি হয় বিভিন্ন সামাজিক আচার-আচরণ আর অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে। ভালোবাসার এই রূপের নাম ‘সামাজিক ভালোবাসা’। অল্প কথায় আমারা এটাকে ‘সামাজিকতা’ও বলে থাকি। আর এই সামাজিক ভালোবাসার এক অপূর্ব নিদর্শন হলো আমাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড যার মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয় আমাদের সভ্যতা।

নিজ জাতির স্বকীয়তা বজায় রাখতে আমরা সবাই সচেষ্ট। নিজের প্রথা, রীতি-নীতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, স্থাপত্য শিল্প, ভাষা, গান, কবিতা ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা পরিপূর্ণ করি আমাদের জাতিকে। আমরা অন্য জাতির বৈশিষ্ট্য আমাদের মাঝে ঢুকতে দিই না সচরাচর। অন্যের আচার-আচরণ অনুকরণের মাধ্যমে আমরা নিজেদের সৌন্দর্য কলুষিত হতে দিই না বরং আমাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের পক্ষে আমরা জনমত গড়ে তুলি। এতো সব করার পেছনে যে টান বা আবেগ রয়েছে, তাকে বলা যায় ‘সাংস্কৃতিক ভালোবাসা’। সাংস্কৃতিক ভালোবাসাই আমাদের মাঝে দেশপ্রেম জাগ্রত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ও বাহন। তাই বলা যায় যে, সাংস্কৃতিক ভালোবাসার অন্যতম সেরা নিদর্শন হল দেশপ্রেম। তবে সংস্কৃতির মাঝে যখন বিদেশী ভাবধারা প্রবেশ করতে চায় তখনই আমাদের ভালোবাসা বিকৃত হয়। কলুষিত হয়। আর এই বিকৃত ও কলুষিত ভালোবাসা চর্চার আরেক নামই হচ্ছে ‘অশ্লীলতা’। সাংস্কৃতিক ভালোবাসার নিদর্শন যেমন দেশপ্রেম, তেমন দেশপ্রেমেরও বেশ কিছু নিদর্শন রয়েছে। যেমন- সততা, ন্যায়পরায়ণতা, চরিত্রবান হওয়া, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেয়া, পরোপকারী হওয়া ইত্যাদি। এ নিদর্শনগুলো যার মাঝে যত বেশি বিদ্যমান সে ততবেশি পরিপূর্ণ মানুষ। এতসব নিদর্শন শুধু সাধারণ মানুষের জন্য নয়, রাজা-প্রজা, শাসক-শাসিত, জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রী, সরকার প্রধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান সকলের জন্যই প্রযোজ্য।

এছাড়াও আরো অনেক ধরণের ভালোবাসার রূপ ও নিদর্শন রয়েছে আমাদের সমাজে যেগুলো হয়তো আজ তুলে আনা সম্ভব হয়নি। উপর্যুক্ত ভালোবসাগুলো ও তাদের নিদর্শনসমূহ নিরাপদ ও শুদ্ধ রাখতে হলে আমাদের সকলকে একসাথে কথা দিতে হবে যে, প্রয়োজনে নিজে ত্যাগ স্বীকার করব, তবুও আরেকজনকে যতটুকু সম্ভব বিশুদ্ধ ভালোবাসার যোগান দেব। যে ভালোবাসায় থাকবে না কোন পরকীয়া, থাকবে না কোন লুটপাট, হত্যা, রাহাজানি, ধর্ষণ, মুক্তিপণ আদায়ের মত অসামাজিক ও বিবেকবর্জিত কার্যকলাপ।

প্রেমের মাধ্যমে কখনও ভালোবাসা স্থায়ী রূপ পায় না। এটি একটি অস্থায়ী সম্পর্ক। এটাকে এড়ানো আমাদের জন্য শুধু কঠিনই না, অসম্ভব যা প্রায় সবাইকেই জীবনের নির্দিষ্ট একটা বয়সে আঘাত করে তীব্র গতিতে। এটা ক্ষণিকের একটা উন্মাদনা। এটা একটা সিগারেটের মত। যতক্ষণ এতে রূপের আগুন থাকবে, ততক্ষণ জ্বলবে। এর ব্যবহারকারীও একে ইচ্ছেমত টানবে। আর যখনই পুড়ে পুড়ে সবটুকু সিগারেট শেষ হয়ে যাবে, তখনই নিদর্শন হিসেবে থাকবে শুধু ছাই। সুতরাং, প্রেম করে যারা ‘ছ্যাঁকা’ খেয়েছ বলে হতাশ, তারা ভেঙে পড়বে না। এই ভেবে শোকরিয়া আদায় কর যে তোমার জন্য এক বিরাট অভিজ্ঞতা প্রাপ্তি। তোমাকে আরও সচেতন করে তুলবে এটি। ভেঙে পড়বে তো তুমি হতাশার গভীর সাগরে তলিয়ে যাবে। বরং নিজেকে সমাজ গঠনে কাজে লাগাও সমস্ত আবেগ দিয়ে, দেখবে প্রকৃত ভালোবাসা নিজেই এসে তোমার কাছে ধরা দেবে। তাই সম্পর্ক স্থায়ী হওয়ার পরে যে ভালোবাসার উৎপাদন শুরু হয় সেটাই হলো চির সবুজ ভালোবাসা। অনন্ত ভালোবাসা। এই অনন্ত ভালোবাসার নিদর্শন হলো বিবাহ, বিবাহের পর নিজেদের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়া, সমাজ বিনির্মাণে একে অপরকে সুযোগ প্রদান এবং প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি।

আসুন। সবাই ভালোবাসা দিবসে আমাদের ভালোবাসা প্রদর্শন করি আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি যারা কোন না কোনভাবে আপনার গড়ে ওঠার পেছনে অবদান রেখেছে। আসুন, ভালোবাসি প্রিয় মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানকে। আসুন, ভালোবাসি আপনার আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীকে। গরীব, দুঃখী ও অসহায়কে। আসুন ভালোবাসি ফিলিস্তিনের নির্যাতিত শিশুদের। রোহিঙ্গাদের অসহায় নারী-শিশুদের।  

আরেকটা কথা বলে দিই। ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’ এখনও স্বীকৃত কোন আন্তর্জাতিক দিবস নয়। এটা শুধু মনের আবেগে পালন করা হয়। কারণ, মানুষ মাত্রই ভালোবাসার পাগল। একবার ভালোবাসা থেকে দুঃখ পাওয়ার পরেও সে ভালোবাসে। তাই এটার কদর বেশি। আজ বাংলাদেশের জাতীয় সুন্দরবন দিবস। আসুন সুন্দরবন রক্ষা করি। সুন্দরবনের সুন্দর সুন্দর প্রাণিদের রক্ষা করি, বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে রক্ষা করি। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখি ভবিষ্যতের জন্য। আসুন, সুন্দরবন রক্ষা করে আমাদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখি। ভালোবাসার জয় হোক।

মো. মাহফুজুর রহমান নোয়াখালী সরকারী কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক।

শাবিপ্রবির ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা আজ, আসনপ্রতি লড়বেন ৩৮…
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
ময়মনসিংহে হ্যান্ডকাফসহ আসামি ছিনিয়ে নিল সহযোগিরা, বাবা আটক
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
আজ ঢাকার ৩ পয়েন্টে অবরোধের ঘোষণা সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
নির্বাচন উপলক্ষে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদানে নতুন নির্দেশ…
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
আচরণ বিধি ভঙ্গের দায়ে বিএনপি কর্মীকে জরিমানা
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
টেকনাফ সীমান্তে আটক ৫২ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী কারাগারে
  • ১৪ জানুয়ারি ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SPRING 2026
Application Deadline Wednesday, 21 January, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9