গৃহবধূ থেকে যেভাবে আপসহীন নেত্রী খালেদা জিয়া

০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৫১ PM
বেগম খালেদা জিয়া ও লেখক

বেগম খালেদা জিয়া ও লেখক © টিডিসি সম্পাদিত

৩০ মে, ১৯৮১ সালে একদল সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামীদের হাতে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করেন। তার মৃত্যুর পর উপরাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেও সবকিছুতেই হস্তক্ষেপ করতেন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ যার জন্য বিএনপির মধ্যে এবং সমগ্র দেশে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার বয়সের ভারে নূহ্য এবং দুর্বল প্রকৃতির লোক হওয়ায় দক্ষ সংগঠকের অনুপস্থিতে বিএনপির মধ্যে তৈরি হয় নেতৃত্ব সংকট। এই সংকট উত্তরণ করতে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান’র গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়া সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন। তার বিচক্ষণ নেতৃত্বে জন্য বিএনপি ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়ে বিএনপির হাল ধরেন।

জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন উপরাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার। গৃহবধূ খালেদা জিয়া বিএনপির সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ায় তিনি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। অত্যন্ত চতুর সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তা বুঝতে পেরে আবদুস সাত্তারের পক্ষে সেনাবাহিনীর সমর্থন দিয়ে সহযোগিতা করেন এবং দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দদের তার সাথে কাজ করতে সহযোগিতা করেন। এ সম্পর্কে বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদের বইয়ে পাওয়া যায়, “সামরিক এবং শাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে, (চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা)।”

খালেদা জিয়াকে দলের তরুণ নেতৃবৃন্দ চেয়ারম্যান করার পক্ষে ছিলেন, ফলে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বিচারপতি আব্দুস সাত্তার বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় দুইবার দেখা করে তাকে বিএনপির সহ-সভাপতি এবং বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। খালেদা জিয়া তার সাথে আপস না করে তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ আলোচনার পর পূর্বে রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকায় খালেদা জিয়া দেশ এবং দলীয় স্বার্থে বিএনপির চেয়ারম্যান পদ থেকে তার প্রতিদ্বন্দ্বীতাও প্রত্যাহার করেন। খালেদা জিয়ার সম্পর্কে সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমান লিখেছেন- “জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হলেও লাজুক গৃহবধূরূপে তার দুই ছেলে তারেক রহমান (পিনো) এবং আরাফাত রহমান (কোকো)-কে নিয়ে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন” (সংগ্রামী নেত্রী খালেদা জিয়া)। 

পরবর্তীতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ বাংলাদেশে সামরিক শাসন জারি করেন। তখন বেগম খালেদা জিয়া সাহসী ভূমিকা নিয়ে এরশাদের শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করে রাজপথে সোচ্চার হন। তিনি এরশাদের সাথে ক্ষমতার স্বাদ নিতে আপস না করে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে রাজপথে সোচ্চার হন। এরশাদের অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াইকে অব্যাহত রাখতে বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণ শুরু করেন। ১৯৮৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে প্রকাশিত হয় এরশাদ বিরোধী সাত জলীয় জোট। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত হয় ১৫ দলীয় জোট। ১৯৮৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সাত দলীয় জোট এবং ১৫ দলীয় জোট যুগপৎভাবে এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক শাসন প্রত্যাহার, নিরপেক্ষ নির্বাচনসহ ৫ দফা দাবি ঘোষণা করে।

এরশাদের অবৈধ শাসনের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনে ২৮ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি দিলে বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে মঈনুল রোডের বাসভবনকে সাবজেল ঘোষণা করে বন্দী করে রাখা হয়। তিনি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে অন্তত ৭ বার গ্রেফতার হন। এসময় সবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, এমনকি টেলিফোন সংযোগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী শেখ হাসিনাকে একাধিক গ্রেফতার করা হলে শেখ হাসিনা সহজে মেনে মুক্তি পেলেও খালেদা জিয়া সহজে মুক্তি পেতেন না।

১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ চট্টগ্রামে লাল দিঘীর ময়দানে যুগপৎ আন্দোলনের জনসভায় শেখ হাসিনা বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন—‘এরশাদের অধীনে যারা নির্বাচনে যাবে, তারা জাতীয় বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত হবে।” কিন্তু শেখ হাসিনা সবাইকে আশ্চর্য করে, যুগপৎ জোটের সাথে প্রতারণা করে তার দুদিন পরই জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়ে মাঠে প্রচারণা শুরু করেন। খালেদা জিয়াকে এরশাদের সহযোগী হলে মন্ত্রীত্বসহ দলের সিনিয়র নেতাদের এমপি-মন্ত্রী এবং তুলনামূলক সিনিয়রদের এমপি নির্বাচিত করাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব বিভিন্ন মাধ্যমে দেওয়া হয়। অন্যথায়, রাজনৈতিক চাপ, গ্রেফতার এবং জেল হাজতের বাস্তবতার হুমকি দেওয়া হয়।  কিন্তু খালেদা জিয়া নীতি বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার লোভে মত্ত না হওয়ায় এরশাদের অন্যায় ও অপশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীনভাবে রাজপথে লড়াই-সংগ্রামের পথ বেছে নেন। তিনি সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন নাই, এমনকি নির্বাচনের পরও তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে এরশাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।

১৯৮৭ সালে খালেদা জিয়া ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচি দিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে রাজপথে নামলে তাকে গ্রেফতার করা হয়। কারাবরণ শেষে মুক্তি পেলেও বাস্তবতা মেনে তিনি গ্রেফতার কিংবা হত্যা করার মতো ভয়ভীতি অথবা কোনো প্রলোভন তাকে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। এরশাদ ৯ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও খালেদা জিয়ার আপসহীন মনোভাব অটুট থাকায় ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।‌ সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপসহীন থাকায় তার নামের সাথে যুক্ত হয় আপসহীন নেত্রী। কোনো সভা, সমাবেশে কিংবা নেতাকর্মীদের মধ্যে কেউ তাকে এই উপাধি দেয়নি। গণমানুষের আস্থা, ভালোবাসা এবং নির্ভরশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হওয়ায় এবং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, সংবাদ মাধ্যমে তাঁকে আপসহীন হিসেবে বারংবার উল্লেখ করায় খালেদা জিয়ার অপর নাম হয়ে যায় আপসহীন নেত্রী। 

লেখক: এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক গণসংযোগ বিষয়ক সম্পাদক, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ

চবির সেই শিক্ষককে হেনস্থায় ঢাবি সাদা দলের উদ্বেগ, জড়িতদের ব…
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
ইরানে সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
২০২৬ সাল ‘যুদ্ধ ও ধ্বংসের’ বছর, বাবা ভাঙ্গার ভবিষ্যদ্বাণী
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
আগামী নির্বাচনের ফলাফলে কেন 'প্রভাবক' হয়ে উঠতে পারেন সুইং ভ…
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
যশোরের বিদেশি অস্ত্রসহ যুবক আটক
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না যেসব কারণে
  • ১২ জানুয়ারি ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
SPRING 2026
Application Deadline Wednesday, 21 January, 2026
Apply Now

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9