ভেনেজুয়েলার মতো ভুল করলে বাংলাদেশের পরিণতি কী হতে পারে

০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৬ AM
সাবিনা আহমেদ

সাবিনা আহমেদ © সংগৃহীত ও টিডিসি সম্পাদিত

ভেনেজুয়েলার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কেন ফেইল করল এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার(EW): বাংলাদেশ মিলিটারি আর আমার মতন মিলিটারি-টেকি গিক্স, পে এটেনশন। কাগজে-কলমে, ভেনেজুয়েলার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ল্যাটিন আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল। কিন্তু বাস্তবে, যখন প্রয়োজন ছিলো তখন দেখা গেল যে আমেরিকার মাদুরো  ক্যাপচার অপারেশনের মুহূর্তে এগুলো মূলত অকার্যকর। অর্থনৈতিক স্যাংশনে শেয়ার পার্টস এর অভাব থেকে শুরু করে ট্রেনিংয়ের অভাব, রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা—সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলার একটা বড় ব্যর্থতা ধরা পড়েছে। আর আমেরিকার  উন্নত কৌশল, বিশেষ করে জ্যামিং ট্যাকটিক, অ্যার ডিফেন্সকে একেবারে অকেজো করে দিয়েছিলো। 

প্রথমে ভেনেজুয়েলার সিস্টেমগুলো কী ছিল তা জেনে নেওয়া যাক। এটা মাল্টি-লেয়ার্ড ছিল—অর্থাৎ বিভিন্ন স্তরের প্রতিরক্ষা, যা দূর থেকে কাছাকাছি সবকিছু কভার করার কথা ছিলো। ফ্রম লং-রেঞ্জ এস-৩০০VM (২ ব্যাটারি), টু মিডিয়াম রেঞ্জ Buk-M2E (2 ব্যাটারি), টু শর্ট রেঞ্জ Pantsir-S1 (১২-১৪ ভেহিক্যাল); এই সব গুলো সিস্টেম ২০১০ এর দশকে  সালে রাশিয়া থেকে ডেলিভারি নিয়েছিল  ভেনেজুয়েলা । এছাড়াও তাদের ইনভেন্টরিতে ছিলো Tor-M1, Igla-S. আছে চাইনিজ রাডার July-1/JY-11B সিস্টেম, যার বেশ কিছু অকার্যকর । ৮০ এর দশকে পাওয়া ২-৪ তা কার্যকর F-16 এবং ২০ টার মাঝে ১০ টা কার্যকর -30MK2. অর্থাৎ, তাদের বিশাল ইনভেন্টরির প্রায় ৬০% সিস্টেমই অকার্যকর হয়ে পরে থাকে। 

ভেনেজুয়েলার হাতে সিস্টেম কম ছিলো না। কিন্তু তাদের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ফেল করার প্রথম কারণ অর্থনৈতিক চাপ, এবং অপরিণত প্ল্যান আর রিজল্ভ। আমেরিকার  স্যাংশন মূলত ২০১৭  সাল থেকে  শুরু, যা রাশিয়া বা চীন থেকে স্পেয়ার পার্টস আটকে দেয়। এসব সিস্টেমের ক্ষেত্রে রাশিয়ান সাহায্য দরকার ছিল ট্রেনিং, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অপারেশনের জন্য, কিন্তু রাশিয়ার উপরে স্যাংশন এবং রাশিয়ার ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে ভেনেজুয়েল রাশিয়া থেকে যেই সাহায্যের দরকার ছিলো তা পুরোপুরি পায়নি। ফলে সিস্টেমগুলো ধুলো খেয়ে পড়ে থাকত। এই অবস্থায় সিস্টেমগুলো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না। কোনো অপারেশনে তো দূরের কথা, ডেলিভারির পর থেকেই তাদের সমস্যা শুরু হয়েছে—যেমন ২০১৩ সালের পর থেকে রক্ষণাবেক্ষণের খরচ বাড়তে থাকে, কিন্তু অর্থনৈতিক সংকটে এবং নিজেরা মেরামতের সক্ষম না হওয়ায় এসব মেরামত সম্ভব হয়নি।
দ্বিতীয় কারণ ট্রেনিংয়ের অভাব। ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীকে “হোলো ফোর্স” বলা হয়—তারা সংখ্যায় বড়, কিন্তু দক্ষতায় দুর্বল। ভেনেজুয়েলান অপারেটরদের পর্যাপ্ত ট্রেনিং ছিল না। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা সাইবার অ্যাটাকের মোকাবিলায়। রাডার জ্যাম হলে কী করবে, সিস্টেম ম্যালফাংশন হলে কীভাবে রিপেয়ার করবে—এসব স্কিল গ্যাপ ছিল। ল্যাক অফ রেডান্ডেন্সি—ব্যাকআপ না থাকায় সিস্টেমের একটা অংশ ধ্বংস হলে পুরা সিস্টেম ধসে পড়ে। ভেনেজুয়েলার ট্রেনিং প্রোগ্রাম ছিলো অত্যন্ত দুর্বল আর খামখেয়ালিতে ভরা। 

অর্থনৈতিক চাপে ভেনেজুয়েলানদের মরাল ছিলো লো, তাতে ডেজারশন বেড়ে আল্টিমেটলি  ট্রেনিং প্রোগ্রাম ধসে পড়েছিলো। ফলে আমেরিকান আক্রমণে ভেনেজুয়েলান সেনা আর অপারেটরদের কোনো রেসপন্স ছিল না। আমেরিকা যখন MQ-৯ রিপার ড্রোন দিয়ে আক্রমণ করে ভেনেজুয়েলান অপারেটররা মানে যারা রাডার বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম চালায়, তারা রাডার স্ক্রিনে শত্রুর ড্রোন বা বিমান দেখলেও কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি—যেমন মিসাইল ছোড়া, অ্যালার্ম বাজানো বা পাল্টা আক্রমণ। কারণ তাদের উপযুক্ত ট্রেনিং ছিলো না। 

এখানে ট্রেনিং মানে সামরিক প্রশিক্ষণ। আধুনিক ভিডিও গেমের মতন বাস্তবসম্মত শত্রুর আক্রমণের সিমুলেশন মানে ভার্চুয়াল বা কম্পিউটার-ভিত্তিক অনুশীলন ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীতে ছিল না বা খুব কম ছিল। ফলে অপারেটররা বাস্তব পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তা জানত না বা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এটা ভেনেজুয়েলার সামরিক দুর্বলতার একটা বড় উদাহরণ।

ওদিকে রাশিয়ান সিস্টেমের জন্য রাশিয়ান ট্রেইনাররা দরকার ছিল, কিন্তু স্যাংশনের কারণে তারা আসতে পারেনি। ফলে সেনাবাহিনীতে দক্ষতার অভাব আরও বেড়েছে।
তৃতীয়, ইন্টেলিজেন্স ইন্টিগ্রেশনের অভাব। ইন্টেলিজেন্স ইন্টিগ্রেশন মানে বিভিন্ন সোর্সের তথ্য যেমন হিউম্যান ইন্টেল, সিগন্যাল ইন্টেল, ইমেজারি ইন্টেল একসাথে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ভেনেজুয়েলার সামরিক বাহিনীর  এটা ছিল না। রাডার কিছু দেখলেও সিগন্যাল বা হিউম্যান সোর্সের সাথে মিলিয়ে রিয়্যাক্ট করতে পারেনি। ফলে আমেরিকান আক্রমণে কোনো রেসপন্স ছিল না। সিআইএ-এর ইনসাইড সোর্স মাদুরোর লোকেশন দিয়েছে, কিন্তু ভেনেজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম এগুলোকে ইন্টিগ্রেট করতে পারেনি। রাশিয়ান এবং চাইনিজ সিস্টেমের মধ্যে কম্প্যাটিবিলিটি সমস্যা আরও বাড়িয়েছে। ভেনেজুয়েলার ইন্টেলিজেন্স সিস্টেম আলাদা আলাদা ছিল, যাতে সমন্বয়ের অভাবে সবকিছু ধসে পড়েছে। এটা তাদের সামরিক ব্যর্থতার একটা বড় কারণ। 

চতুর্থ, আমেরিকার কৌশলগুলোতে বিশেষ করে জ্যামিং ট্যাকটিক ছিল সবচেয়ে কার্যকর। আমেরিকার সেনাবাহিনী শক্তিশালী রেডিও সিগন্যাল পাঠিয়ে ভেনেজুয়েলার রাডার বা যোগাযোগ সিস্টেমকে “অন্ধ” বা “বধির” করে দিয়েছিলো। এটা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের অংশ। দুই ধরনের জ্যামিং: নয়েজ জ্যামিং—যেমন রেডিওতে স্ট্যাটিক নয়েজ বাড়িয়ে গান শোনা অসম্ভব করা। আর ডিসেপশন জ্যামিং—ভুল সিগন্যাল পাঠিয়ে শত্রুকে ধোঁকা দেওয়া, যেমন জিপিএস স্পুফ করে ড্রোনকে ভুল পথে পাঠানো। যুক্তরাষ্ট্র ইএ-১৮জি গ্রাউলার বিমান দিয়ে ঠিক এই কাজটি করে। 

ড্রোন অপারেশনে গ্রাউলার রাডারের ফ্রিকোয়েন্সি ফ্লাড করে অন্ধ করে দিয়েছে। তারপর এইচএআরএম মিসাইল দিয়ে রাডার ধ্বংস করে দিয়েছে। সাইবার অ্যাটাক মিলিয়ে কমান্ড চেইন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ফলে ভেনেজুয়েলার রাডারগুলো দেখতেই পায়নি শত্রুর সব গতিবিধি, আর সিস্টেমগুলো রিয়্যাক্ট করতে পারেনি। ফলে আমেরিকান ড্রোন বা হেলিকপ্টার সহজেই প্রবেশ করে আক্রমণ করেছে। মাদুরোকে ধরার আগের অপারেশনগুলোয় এই জ্যামিংয়ের কারণে কোনো প্রতিরোধ ছিল না। 

তার পরেও ভেনেজুয়েল রাডার লাইট আপ করার চেষ্টা করে, কিন্তু US তখন HARM মিসাইল দিয়ে ধ্বংস করে। ফলে ভেনেজুয়েলার চাইনিজ রাডারের ল্যাক অফ রেডান্ডেন্সি এক্সপোজড হয়—একটা ফেল হলে সব ফেল করে গেছে। US-এর স্টেল্থ জেটস (এফ-৩৫) এবং ড্রোন (আরকিউ-১৭০) রাডার এড়িয়ে প্রবেশ করে। ভেনেজুয়েলা পাল্টা সাইবার অ্যাটাকের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের ক্যাপাবিলিটি দুর্বল ছিল—শুধু প্রোপাগান্ডা আর ডিনায়াল অফ সার্ভিস অ্যাটাকের মতো ছোটখাটো চেষ্টা, যা US-এর ডিফেন্স সিস্টেম আটকে দিয়েছে।

উপসংহারে বলা যায়, ভেনেজুয়েলার এয়ার ডিফেন্স ফেল করেছে অর্থনৈতিক চাপ, ট্রেনিংয়ের অভাব, ইন্টেলিজেন্সের দুর্বলতা আর আমেরিকার জ্যামিংয়ের মতো উন্নত কৌশলে। এসব বাংলাদেশের জন্য বিশাল শিক্ষা—শুধু অস্ত্র কেনা যথেষ্ট নয়, ট্রেনিং আর রক্ষণাবেক্ষণ না থাকলে সব ক্রয়ই অকেজো। ভেনেজুয়েলার মতো বাংলাদেশ আক্রমিত হলে আমাদের ডিফেন্স ধরাশায়ী হয়ে যাবে। 

ভেনেজুয়েলার এই ঘটনা দেখিয়েছে যে ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এখন যুদ্ধের মূল অংশ, ইডব্লিউ শুধু অস্ত্র নয়, দক্ষতা এবং প্রস্তুতির ব্যাপার। আর এই ব্যর্থতায় ভেনেজুয়েলা দেখিয়েছে যে শক্তিশালী সিস্টেমও দুর্বল হয়ে যায় যদি একটি দেশ ইডব্লিউ-তে প্রস্তুত না থাকে।

লেখক: মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির বিশ্লেষক

১০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভ…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি নাছির উদ্দিন গ্রেপ্তার 
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
পাবনায় ইন্টারন্যাশনাল পিস স্কুলের প্যারেন্টিং কনফারেন্স অনু…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
কুবি শিক্ষার্থী-পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় তদন্ত কমিটি
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লব: জেনারেল জিয়া থেকে জনতার জিয়া
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
চুরি করতে এসে ধাওয়া খেয়ে নারিকেল গাছের মাথায় চোর, নামাতে বি…
  • ০৬ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950