‘বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতীক খালেদা জিয়া’

৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৩০ PM , আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:৩১ PM
খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়া © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও খালেদা জিয়া একে অন্যের পরিপূরক ছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। একসময় তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক স্বৈরতন্ত্রে আক্রান্ত দেশটিতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম করেছেন। সাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য, আস্থার পাশাপাশি প্রশংসিত হয়েছেন। তার নেয়া বিভিন্ন উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে৷ বারবার গণতন্ত্রের পক্ষে তার অবস্থান তাকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রতীকে পরিণত করেছে।

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার ভোর ৬টায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর চারমাস ১৬ দিন। খালেদা জিয়া ও তার দল বিএনপি একসময় বাংলাদেশকে সেনা শাসন থেকে গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনার সংগ্রামের জন্য প্রশংসিত হয়েছিল।

তবে জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তার কয়েক বছর কারাভোগ করতে হয়েছে দুর্নীতির অভিযোগে। বিএনপির দাবি, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। পাশাপাশি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা সব মামলার কার্যক্রম বাতিল হয়ে যায়। সাধারণ গৃহিণী থেকে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম মুসলিম নারী প্রধানমন্ত্রী। 

এছাড়া তিনি বিশ্বের কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৮১ সালে খালেদা জিয়ার স্বামী তৎকালীন জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হলে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। 

জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতার ঘোষক, অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

রাজনীতিতে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও সেনা শাসনের বিরুদ্ধে বেসামরিক রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে দ্রুতই বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিবিদে পরিণত হন বেগম খালেদা জিয়া। জিয়াউর রহমানের দল মধ্য-ডানপন্থি হলেও রাজনীতির মাঠে বাম এবং ডান দুই ঘরনার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে এরশাদের স্বৈরশাসনকে দুর্বল করে দিতে সক্ষম হন তিনি। 

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে জিয়ার দল ৩০০ আসনের মধ্যে ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে এবং খালেদা জিয়া প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। নারীর ক্ষমতায়নে খালেদা জিয়ার উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সংস্কারে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া৷ বিশেষভাবে তিনি নারীর সাক্ষরতার হার বাড়াতে এবং তাদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে উদ্যোগী হন৷ এজন্য তিনি মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী পোশাক খাতের বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখেন যেখানে বহু নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। 

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে মেয়েদের স্কুলমুখী করতে বিনামূল্যে শিক্ষার পাশাপাশি শুধু তাদের জন্য আলাদা উপবৃত্তিরও ব্যবস্থা করে খালেদা জিয়ার সরকার৷ বিদেশি দাতাদের সহায়তায় স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে দুপুরের খাবার সরবরাহের উদ্যোগও নেয়া হয়৷ সব মিলিয়ে তার আমলে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তির হার বেড়ে যায়।

১৯৯৩ সালের ১৭ নভেম্বর মার্কিন পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখায় খালেদা জিয়া প্রশংসিত হন।
পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর নীতির সঙ্গে বৈসাদৃশ্যের বিষয়টি তুলে ধরে পত্রিকাটি লিখেছে, ‘প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণকে উৎসাহিত করেছেন, বিশেষ করে মেয়েদের মাঝে।' 

নিজের তৃতীয় মেয়াদে ২০০১ এবং ২০০৬ সালের মধ্যে কয়েক বছর মার্কিন ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ ক্ষমতাসীন নারীর তালিকায় স্থান পান বেগম খালেদা জিয়া। 
পত্রিকাটি লিখেছে, ‘এক সময়ের লাজুক এবং চাপা স্বভাবের গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়া, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শিক্ষা খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছেন, বিশেষ করে নারী শিক্ষায়, 
খালেদা জিয়াকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতেন শেখ হাসিনা। 

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখলেও তিনি দ্রুতই আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হন। তারা দুজন প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশটিকে ১৯৯১ সাল থেকে বিভিন্ন মেয়াদে শাসন করেছেন৷ রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে পশ্চিমা কূটনীতিকদের কাছে তারা পরিচিতি পান ‘ব্যাটলিং বেগমস’ হিসেবে৷ বাংলাদেশের রাজনীতি গত কয়েক দশক ধরে কার্যত এই দুই নারীকে ঘিরে ঘুরপাক খেয়েছে। 

ওয়াশিংটনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক মাইকেল কুগলম্যান বলেন, ‘আমি যখন খালেদা জিয়ার নাম শুনি, তখন প্রথমেই মনে আসে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা৷ খালেদা জিয়া এবং হাসিনার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে তা প্রভাব বিস্তার করেছে।’

‘ভুলের মাশুল’ দিয়েছেন খালেদা জিয়া
২০০৮ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে সক্ষম হন শেখ হাসিনা৷ তবে এই দীর্ঘমেয়াদে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের শুরুতে তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করেও তেমন কোনো কঠোর রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখে পড়েননি তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়াকে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে এসময় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় করে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের সেই টানা ক্ষমতায় থাকার মেয়াদে শুধু খালেদা জিয়া নন, বিএনপির প্রায় চল্লিশ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে প্রায় দুইলাখের মতো মামলা করা হয়েছিল। 

দলটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সময়ে অন্তত ৬০০ নেতাকর্মী গুমের এবং তিন হাজার নেতাকর্মী বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন। একসময় গণতন্ত্রের কঠোর সমর্থক খালেদা জিয়া এই সময়ে শেখ হাসিনার দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রেখে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার প্রবণতা রুখতে পারেননি। 

ওয়াশিংটনভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক মাইকেল কুগলম্যান বলেন, গত দশকে অনেক ভুল করেছেন খালেদা জিয়া। নির্বাচন বর্জন করায় সুযোগ হারিয়েছেন৷ তার চেয়েও বড় কথা মধ্যপন্থা বাদ দিয়ে বিঘ্নকারী এবং সংঘর্ষমূলক অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি, যা অনেক সম্ভাবনা নষ্ট করেছে। 

তিনি বলেন, তার দল কখনো কখনো ইসলামিস্ট রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে যারা কট্টরপন্থি, তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধর্মনিরপেক্ষ এবং মধ্যপন্থার বাংলাদেশে বিশ্বাসীদের সমর্থন হারিয়েছেন। 

অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা হওয়ার আগে ডয়চে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আসিফ নজরুল বলেছিলেন, রাজনীতিতে খালেদা জিয়ার শক্ত অবস্থান হারানোর পেছনে শেখ হাসিনার আমলে ভারতের এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম পশ্চিমা কূটনীতিকদের আত্মবিশ্বাস অর্জনে তার অনাগ্রহ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিবেশী দেশ ভারত বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে বলে বিশ্বাস করা হয়। 

আসিফ নজরুল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ২০১৩ সালে ঢাকায় ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করার সিদ্ধান্ত এবং একই বছরে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে শেখ হাসিনার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ায় তিনি রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। 

তিনি বলেন, ঢাকাভিত্তিক অভিজাত বুদ্ধিজীবী এবং পশ্চিমা কূটনীতিকদের মন জয় করতে পারেননি তিনি। আর অতীতে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে লড়া বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছ থেকে বিএনপি এবং তার জোটদেরকে দূরে রাখতে না পারার ব্যর্থতাও তাকে দুর্বল করেছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদিও খালেদা জিয়ার বিপুল সমর্থক রয়েছেন দেশে, শেখ হাসিনা বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর সময়ে কৌশলে সেই ভোটারদেরকে ব্যালট বাক্স থেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। 

যেসব কারণে স্মরণীয় থাকবেন খালেদা জিয়া
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লায়লা নূর ইসলাম মনে করেন, খালেদা জিয়া বাংলাদেশে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন করা, লাখ লাখ নারীকে পোশাক খাতে চাকুরির ব্যবস্থা করা, সবার জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গড়াসহ বিভিন্ন কারণে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। 

আসিফ নজরুল মনে করেন, খালেদা জিয়ার গণতন্ত্রের জন্য লড়াই এবং সেই লড়াইয়ের কারণে জীবনের শেষ দিকে যে ভোগান্তির তিনি শিকার হয়েছেন, সেজন্য তিনি বহুযুগ মানুষের হৃদয়ে থাকবেন।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়া চাইলে ২০০৬-২০০৭ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় কিংবা তার বিরুদ্ধে মামলা চলাকালীন সময়ে বিদেশে চলে যেতে পারতেন। তার বয়স হয়েছিল এবং তিনি অসুস্থ ছিলেন। তা সত্ত্বেও অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হবে বুঝেও তিনি হাসিনা সরকারের কাছে নতিস্বীকার করেননি এবং বিদেশে চলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেননি। 

খালের ওপর ‘এতিম’ সেতু, দেখতে আসছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্…
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
কক্সবাজারে জুলাইযোদ্ধা ও ছাত্রদল নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্রদল সভাপতি বহিষ্কার
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
ভারতে অনুপ্রবেশের দায়ে সাজা শেষে দেশে ফিরলেন ৪ তরুণী
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
নরসিংদীতে ছাত্রশিবিরের ঈদ পুনর্মিলনী
  • ২৫ মার্চ ২০২৬
সিনিয়র এক্সিকিউটিভ নিয়োগ দেবে বম্বে সুইটস, কর্মস্থল ঢাকা
  • ২৪ মার্চ ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence