ড. ইমাদুর রহমান © সংগৃহীত
সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা দেরি করে অফিসে আসবেন—এটাই যেন বাংলাদেশের নিয়তি। এর আগে যিনি এই পদে ছিলেন, তিনি অফিসে আসতেন দুপুর ১টায়, অথচ অফিস শুরু হতো সকাল ৯টায়। যারা অফিসের চাকরিতে অভ্যস্ত, তারা জানেন—কর্মকর্তাদের আগেই কর্মচারীদের অফিসে আসতে হয়। কারণ সকাল ৯টার আগেই মেঝে পরিষ্কার করা, চেয়ার-টেবিল ঠিক করে রাখা—এই সব কাজ সম্পন্ন করতে হয়।
কিন্তু তাদেরও আগে অফিসে আসেন একজন মানুষ। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের মানুষের আত্মত্যাগ দেখে শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এরিকসন থেকে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)-এর দায়িত্ব নেওয়া ড. ইমাদুর রহমান।
৫ আগস্ট কতভাবে, কতজনের জীবনে প্রভাব ফেলেছে—তার হিসাব করা কঠিন। এক সিদ্ধান্তে তিনি সুইডেনের ৩০ বছরের জীবন ছেড়ে দিয়েছেন, বিশ্বের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়েছেন, নিজের আয়ের সিংহভাগ ত্যাগ করেছেন, পরিবার ছেড়ে এসেছেন—শহীদদের আত্মত্যাগ দেখে সবকিছু পেছনে ফেলে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। তার এই ফিরে আসা বাংলাদেশের কয়েকটি সেক্টরে চিরস্থায়ী পরিবর্তন এনে দিয়েছে।
অনেকে বলে থাকেন, ড. ইমাদুর রহমানের গবেষণা কার্যক্রম বাংলাদেশের এমন বিশ্ববিদ্যালয় আছে সব শিক্ষকের সম্মিলিত গবেষণার চেয়েও বেশি। শুধু এতটুকু বলি—টেলিকমিউনিকেশন সেক্টরে তিনি ৫০০টির বেশি পেটেন্ট আবেদন করেছেন, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৪৫টি অনুমোদিত হয়েছে। ক্যান ইউ বিলিভ—একজন বাংলাদেশির এতগুলো পেটেন্ট! এছাড়াও তিনি IEEE জার্নাল ও বিভিন্ন কনফারেন্সে প্রায় ৪৫টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। মূল লেখক ও সহ-লেখক হিসেবে তিনি প্রায় ১০০০টি ৩জিপিপি পেপারে ভূমিকা রেখেছেন।
একবার স্বনামধন্য একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলছিলেন, “ইমাদ ভাই, আপনার বয়স অনেক কম, আমাদের অনেক জুনিয়র। এতগুলো স্বীকৃত পেটেন্ট কীভাবে করলেন? আর আমাদের জীবন চলে যাচ্ছে ২–১টা পেটেন্ট করতেই।” এটাই সম্মানিত অধ্যাপকদের তার প্রতি মুগ্ধতার বহিঃপ্রকাশ।
শুধু গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ নন তিনি। বিগত সময়ের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ। যে কোম্পানি লাগাতার লোকসান করতে করতে বন্ধ করার কথা ভাবছিল আসন্ন সরকার, সেই কোম্পানিকেই তিনি নতুন জীবন দিয়েছেন। বহু মানুষের চাকরি রক্ষা পেয়েছে তার কারণে। সেই কোম্পানি এবার উল্টো ৩৮ কোটি টাকা লাভ করেছে।
শুধু তাই নয়—স্টারলিংক ২০২৩ সালে বাংলাদেশে এসে অতিরিক্ত অর্থ দাবির কারণে ফিরে গিয়েছিল। সেখানে ইমাদুর রহমান লিংকডইনে স্টারলিংকের শীর্ষ কর্মকর্তাকে নক দিয়ে মিটিং করেন এবং লোকসানে থাকা কোম্পানিকে বৈশ্বিক জায়ান্টের পার্টনারে পরিণত করেন.! এটাই উনার ম্যাজিক।
আরেকটি বিষয় জানেন কি? বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চল বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় দ্বিগুণ। এত বিশাল অঞ্চল নিয়েও আমরা তেমন কোনো পরিকল্পনা করিনি। অবহেলায় পড়ে আছে এতবড় অঞ্চল। ইমাদুর রহমান এসে এআইএস স্যাটেলাইট নিয়ে কাজ শুরু করেন। এর ফলে এখন আর কোনো জেলে সমুদ্রে ডুবে মরবে না। তারা আগের চেয়ে বেশি মাছ ধরতে পারবে। বিশ্বাস করুন—সমুদ্রে জেলেদের জীবন এতটাই প্রান্তিক যে তাদের মৃত্যুর খবর অনেক সময় পত্রিকাতেও আসে না। অথচ লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন ও জীবিকার উন্নয়নে নিঃশব্দে কাজ করে যাচ্ছেন ইমাদুর রহমান—যার কথা তারা হয়তো জানেই না।
আরেকটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা। আমরা অনেক সময় একটু সিনিয়র হলেই জুনিয়রদের সালাম দিই না। কিন্তু ইমাদুর রহমান তার ওয়াশরুম যিনি পরিষ্কার করেন তাকেও সালাম দেন, যে কর্মচারী অফিসের দরজা খুলে দেন তাকেও সালাম দেন। এতটুকুই যথেষ্ট বোঝার জন্য—তিনি কতটা বড় মনের মানুষ।
আজ স্যারের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন, স্যার। আমরা আমাদের দেশের অনেক বাজে লোককে চিনি, কিন্তু দেশের প্রকৃত নায়কদের চিনতে পারি না—এটা এই জাতির জন্য সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। আমরা কি এ ধরনের মানুষকে বাংলাদেশে ধরে রাখতে পারব? রাজনৈতিক দলগুলো কি এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে?
লেখক: লেকচারার, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়