মাদরাসা শিক্ষার্থীরা
মাদ্রাসায় পড়েই শিক্ষার্থীরা এখন জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা করছেন; গবেষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী হচ্ছেন। মাদ্রাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা শুধু জ্ঞানচর্চাই নয়; সুনাগরিক হিসেবে নিজেদের দেশ-বিদেশে তুলে ধরছেন। শিক্ষার এই যে উন্মেষ, তার নেপথ্যে রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। শতভাগ ডিজিটাল সেবা প্রদান করছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। দেশের সেন্টমার্টিন থেকে বাংলান্ধা সীমানার মধ্যে অবস্থিত প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মাদ্রাসার প্রধানদের দোরগোড়ায় সেবা প্রদান নিশ্চিত করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর একেএম ছায়েফ উল্যার নেতৃত্বে মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিসহ সেবার মান সহজীকরণে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জনদুর্ভোগ লাঘবে ই-অফিস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে। অন্যসব শিক্ষাবোর্ডের চেয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ডিজিটাল সেবা প্রদানে এগিয়ে। সেবাপ্রার্থীদের কষ্ট করে ঢাকায় আসতে হয় না। অধিভুক্ত মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি (গভর্নিং বডি/ম্যানেজিং কমিটি/এডহক কমিটি)-এর অনুমোদন, বিদ্যোৎসাহী সদস্য মনোনয়ন এবং একাডেমিক স্বীকৃতির নবায়নের জন্য মাদ্রাসায় বসে অনলাইনে সেবা পেয়ে যাচ্ছেন। অতি স্বল্প সময়ে শিক্ষার্থীর ট্রান্সফার, বিষয় কোড পরিবর্তন, নামের আক্ষরিক সংশোধন অনলাইনের মাধ্যমে সম্পাদনা করা হচ্ছে।
জনদুর্ভোগ লাঘবে ই-অফিস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুকরণ : বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং দিনবদলের কর্মসূচি নিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করে। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে বদ্ধ পরিকর। এরই ধারাবাহিকতায় জনদুর্ভোগ লাঘবে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন থেকে বাংলাবন্দ সীমানার মধ্যে অবস্থিত প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মাদ্রাসার প্রধানদের দোরগোড়ায় সেবা প্রদান নিশ্চিত করেছে। অনলাইন পদ্ধতিতে সারাদেশের মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি (গভর্নিং বডি/ম্যানেজিং কমিটি/এডহক কমিটি)-এর অনুমোদন, বিদ্যোৎসাহী সদস্য মনোনয়ন এবং একাডেমিক স্বীকৃতির মেয়াদ বৃদ্ধি (নবায়ন) কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত এডহক কমিটি সংক্রান্ত ২ হাজার ১৮৪টি আবেদন, ম্যানেজিং কমিটি সংক্রান্ত ৩ হাজার ৬৭৮টি আবেদন, গভর্নিং বডি সংক্রান্ত ৭৫৮টি আবেদন, বিদ্যোৎসাহী সদস্য মনোনয়ন সংক্রান্ত ৭৬৪টি আবেদন এবং একাডেমিক স্বীকৃতির মেয়াদ বৃদ্ধি (নবায়ন) সংক্রান্ত ৩ হাজার ২৬১টি আবেদন অনলাইনের মাধ্যমে নিস্পত্তি করা হয়েছে।
ই-ফাইলিং পদ্ধতির প্রবর্তন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুসারে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগসহ সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, দপ্তর ও সংস্থা, সকল জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে নথি নিষ্পত্তির কার্যক্রম সম্পন্ন হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৫৫টি নথি ই-ফাইলিংয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
ই-টেন্ডারিং পদ্ধতির প্রবর্তন : সকল ক্রয় কার্যক্রম এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রথম থেকেই ই-টেন্ডারিং করা হয়েছে। ন্যাশনাল ই-গর্ভনমেন্ট প্রকিউমেন্ট (ই-জিপি) প্রোর্টালের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। ই-টেন্ডারিংয়ের ওপর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে বোর্ডের সকল ক্রয় ই-টেন্ডারিংয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
মাদ্রাসা বোর্ডে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার : মাদ্রাসা শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির সফল ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। অনলাইনের মাধ্যমে জেডিসি, দাখিল ও আলিম শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন, পরীক্ষার ফরম পূরণ করা হচ্ছে। পরীক্ষা গ্রহণের যাবতীয় কার্যক্রম যথা ফলাফল প্রক্রিয়াকরণ ও স্বল্প সময়ে প্রকাশ, ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণ, নম্বরপত্র, সনদপত্র প্রদান ও পরীক্ষক নিয়োগসহ যাবতীয় কার্যক্রম তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অনলাইনে সম্পন্ন করা হচ্ছে। বোর্ডের অধিভুক্ত সকল মাদ্রাসায় প্রায় সাড়ে ৯ হাজার নিজস্ব ডোমেইন নামের ওয়েব পোর্টালের আওতায় ইন্টার্যাকটিভ ওয়েবসাইট খুলে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নির্দেশনা মোতাবেক বোর্ডের নিজস্ব ওয়েবসাইটটি ন্যাশনাল পোর্টাল ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় এটুআই প্রকল্পের কারিগরি সহায়তায় উন্নয়নের কাজ শুরু করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বোর্ডের দুজন আইসিটি কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল সহজে ও স্বল্প সময়ে প্রাপ্তির লক্ষ্যে এসএমএস পদ্ধতিতে চালু করা হয়েছে। ফলাফল পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন এসএমএসের মাধ্যমে গ্রহণ করা হচ্ছে। পরীক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যাবলি অটোমশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। উল্লিখিত কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে মাদ্রাসার শিক্ষকদের তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও ই-সেবা প্রদানের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে চলছে। অনলাইনের মাধ্যমে পাবলিক পরীক্ষার মাদ্রাসার কেন্দ্র হতে দৈনন্দিন তথ্য গ্রহণ করা হচ্ছে। ছবিসহ পরীক্ষার্থীদের স্বাক্ষরলিপি অনলাইনে প্রদান করা হচ্ছে। অটোমেশন পদ্ধতিতে পেরোল সফটওয়ারের মাধ্যমে বোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা (সরকারি আয়করসহ)-এর হিসাব বিবরণী তৈরি করে তা প্রদান করা হচ্ছে।
মাদ্রাসার পাঠ্যপুস্তকের ইন্টার্যাকটিভ ডিজিটাল ভার্সন উন্নয়ন : মাদ্রাসা শিক্ষার ষষ্ঠ শ্রেণির কোরআন মজিদ, আকাইদ ও ফিকহ, আরবি প্রথম এবং আরবি দ্বিতীয় পত্র- এ ৪টি বিষয়ের পাঠ্যপুস্তককে ইন্টার্যাকটিভ ডিজিটাল মাদ্রাসা টেক্সট বুকস উন্নয়ন করা হয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নের লক্ষ্যে যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম উন্নয়ন : জাতীয় শিক্ষানীতির নির্দেশনা, পরিবর্তিত জাতীয় ও বৈশ্যিক পরিস্থিতি এবং সমকালীন জীবনের চাহিদা বিবেচনা করে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন ইবতেদায়ী, জুনিয়র দাখিল, দাখিল এবং আলিম স্তরের সকল শ্রেণির ইসলাম ও আরবি বিষয়সমূহের শিক্ষাক্রম পরিমার্জন/উন্নয়ন করা হয়েছে। শিক্ষাক্রম পরিমার্জন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইসলামি আখলাক আকিদা ও মূল্যবোধ চর্চা, জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষা ধারায় অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির প্রচলন : সাধারণ শিক্ষা ধারার শিক্ষার্থীদের ন্যায় মাদ্রাসা শিক্ষা ধারার শিক্ষার্থীদের মধ্যে কতগুলো মৌলিক বিষয়ে অভিন্ন জ্ঞান অর্জন এবং অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলা-১ম ও ২য় পত্র, ইংরেজি-১ম ও ২য় পত্র, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, গণিত, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, শারীরিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলা বিষয়ে অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি অনুসৃত করা হচ্ছে।
মাদ্রাসা শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন : দেশের আলিয়া পদ্ধতির মাদ্রাসায় পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকায়নে পাঠ-পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তদনুসারে পাঠদানের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সকল মাদ্রাসার জন্য একটি অভিন্ন পাঠ-পরিকল্পনার ছক মাদ্রাসা বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আরবি ভাষার চার দক্ষতা (শোনা, বলা, পড়া ও লেখা) বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে বাচনিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য মাদ্রাসার অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় ১০ নম্বর বরাদ্দ করা হয়েছে। আরবি বিষয়ের শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ প্রদানের কর্ম-পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। জাতীয়ভাবে ইবতেদায়ী, জেডিসি, দাখিল ও আলিম পরীক্ষা গ্রহণ এবং মেধারভিত্তিতে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সাধারণ শিক্ষা ধারার সাথে প্রশ্ন-পদ্ধতির সাদৃশ্য বজায় রাখার লক্ষ্যে জেডিসি, দাখিল এবং আলিম পর্যায়ে সৃজনশীল প্রশ্ন-পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণ করা হচ্ছে। ২০১৫ শিক্ষাবর্ষে জুনিয়র দাখিল স্তরে-১৫টি বিষয়, দাখিল স্তরে-২৪টি বিষয় এবং আলিম স্তরে-০৮টি বিষয় সৃজনশীল প্রশ্ন-পদ্ধতি সম্প্রসারিত হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বাধাসমূহ দূরীকরণের লক্ষ্যে মাদ্রাসা শিক্ষার পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনয়ন করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষা আবশ্যিক বিষয় (বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) সমান নম্বর বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রতিবছর জাতীয়ভাবে নির্ধারিত সময়ে ইবতেদায়ী, জেডিসি, দাখিল ও আলিম পরীক্ষা গৃহীত হচ্ছে। ইবতেদায়ী ও জেডিসি পরীক্ষা গ্রহণ শেষে ৩০ দিনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করা হচ্ছে এবং দাখিল ও আলিম পরীক্ষা গ্রহণ শেষে সাধারণ বোর্ডের ন্যায় ৬০ দিনের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হচ্ছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধিভুক্ত সাড়ে ৯ হাজার মাদ্রাসায় ওয়েবসাইট খুলে দেওয়া হয়েছে। ওয়েবসাইটি পরিচালনা ও আপডেট করার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সকল মাদ্রাসার শিক্ষকদের ওয়েবপোর্টাল উন্নয়নবিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদানের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় ওয়েবপোর্টাল প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরি করা হয়েছে। এ প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য মাস্টার ট্রেইনার তৈরির লক্ষ্যে প্রায় ৪০০ মাদ্রাসা শিক্ষককে প্রাথমিকভাবে একদিনের ওরিয়েন্টেশন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। আরবি ভাষায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বাচনিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে অধিভুক্ত মাদ্রাসাগুলো থেকে একজন করে আরবি শিক্ষককে প্রশিক্ষণ প্রদানের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
বর্তমান সরকারের আমলে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দাখিল মাদ্রাসা ২০৪টি। দাখিল স্তরে একাডেমিক স্বীকৃতি পেয়েছে ২৯৮টি। দাখিল ৯ম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ খোলা হয়েছে ২৫৯টি মাদ্রাসায়। আলিম প্রথম বর্ষ প্রাথমিক পাঠদান অনুমতি পেয়েছে ১১৭টি। আলিম স্তরে একাডেমিক স্বীকৃতি ১০৯টি, আলিম স্তরে বিজ্ঞান বিভাগ খোলা হয়েছে ৬৩টি মাদ্রাসায়। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ক্যাপাসিটি ডেভলপমেন্ট ফর মাদ্রাসা এডুকেশন প্রকল্পের অধীনে মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। এছাড়া আর্থিক সহায়তায় নির্বাচিত মাদ্রাসাসমূহে উন্নতমানের সরঞ্জামাদি সরবরাহ ও কারিগরি ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নে এর শিক্ষাক্রম, শিক্ষা উপকরণ, মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিমার্জন ও উন্নয়ন কার্যক্রম প্রকল্পভুক্ত করার প্রয়াস গ্রহণ করা হয়েছে।
ইবতেদায়ী স্তরের পাঠ্যপুস্তক চার রঙে মুদ্রণ : প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ন্যায় ইবতেদায়ী স্তরে (১ম থেকে ৫ম) শিক্ষার্থীদের জন্য সকল বিষয়ের পাঠ্যপুস্তক চার রঙে মুদ্রিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের সময় হতে প্রথমবারের মতো ১ম শ্রেণি থেকে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত মাদ্রাসার সকল শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বছরের প্রথম দিনেই বিতরণ করা হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ইবতেদায়ী ১ম থেকে দাখিল (ভোকেশনালসহ) ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত ৫৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৬০ শিক্ষার্থীর জন্য ৫ কোটি ৬২ লাখ ৯৮ হাজার ৫০৭টি পাঠ্যপুস্তক এনসিটিবির মাধ্যমে মুদ্রণ করা হয়েছে এবং তা বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।
মাদ্রাসার অবকাঠামো উন্নয়ন : মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে ১ হাজার ২৬৬ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ১৩০ মাদ্রাসায় বহুতল ভবন নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ১০১ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশের নির্বাচিত মাদ্রাসাসমূহের শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে ৯৫টি মাদ্রাসায় শিক্ষার উন্নত পরিবেশ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, শেণিকক্ষ আধুনিকায়ন, কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ৫২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মাদ্রাসার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
৩৫টি মাদ্রাসাকে মডেল মাদ্রাসা হিসেবে ঘোষণা করে উক্ত মাদ্রাসায় অত্যাধুনিক ভবন নির্মাণ, উন্নতমানের আসবাবপত্র সরবরাহ, কম্পিউটার ল্যাব স্থাপন, প্রয়োজনীয় উপকরণসহ কম্পিউটার প্রদান এবং উন্নত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩৮১টি মাদ্রাসায় কারিগরি শিক্ষা কোর্স চালু করা হয়েছে।
মাদ্রাসায় উচ্চশিক্ষা চালু ও সমপ্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃতি : মাদ্রাসা শিক্ষার সকল স্তরকে সাধারণ শিক্ষার সমমান প্রদানের মাধ্যমে সকলের জন্য সমপ্রতিযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৩১টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ২১টি সর্বমোট ৫২টি মাদ্রাসায় ফাজিল শ্রেণিতে ৫টি বিষয়ে অনার্স কোর্স খোলা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আদ দাওয়া অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল আদাবাল আরবী (আরবি সাহিত্য) ও ইসলামের ইতিহাস।
মাদ্রাসা শিক্ষকদের বেতন ভাতা বৃদ্ধি : স্কুল ও কলেজের প্রধান শিক্ষক/অধ্যক্ষের বেতন-ভাতাদির ন্যায় দাখিল থেকে কামিল স্তরের মাদ্রাসাসমূহের সুপারিনটেনডেন্ট/অধ্যক্ষের বেতন-ভাতাদির সমতা আনা হয়েছে। এছাড়া অন্যদের ন্যায় সকল এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেল প্রদান করা হয়েছে। ইবতেদায়ী মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন প্রতি মাসে ২ হাজার ৩০০ টাকা এবং প্রধানদের বেতন প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করা হচ্ছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর প্রতিষ্ঠা : প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ, শিক্ষক এমপিওভুক্তকরণসহ মাদ্রাসা শিক্ষার একাডেমিক এবং প্রশাসনিক ভৌত কাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৫ সালের জুলাই হতে পৃথক মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তা সামগ্রিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
মাদ্রাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ : সেসিপ, টিকিউআইসহ অন্যান্য প্রকল্পের আওতায় সাধারণ শিক্ষা ধারার পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষা ধারার শিক্ষকরাও বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরিতে মাদ্রাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এছাড়া সৃজনশীল প্রশ্ন-পদ্ধতির ওপর মাদ্রাসা শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের কাজ অব্যাহত আছে। মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য সাধারণ শিক্ষার বিএড ও এমএডের মতো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিএমএড কোর্স চালু করা হয়েছে। এছাড়া মাদ্রাসার প্রধানদের জন্য জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থা একাডেমি (নায়েম), ব্যানবেইজ ও বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (বিএমটিটিআই) মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা উন্নয়ন, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান প্রফেসর একেএম ছায়েফ উল্যা বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিসহ সেবার মান সহজীকরণে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। জনদুর্ভোগ লাঘবে ই-অফিস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হয়েছে। অন্যসব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ডিজিটাল সেবা প্রদানে এগিয়ে। আগে হাজার হাজার আলেম-ওলামারা সেবা পেতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে মাদ্রাসা বোর্ডে ভিড় জমাত। অধিভুক্ত মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি (গভর্নিং বডি/ম্যানেজিং কমিটি/এডহক কমিটি)-এর অনুমোদন, বিদ্যোৎসাহী সদস্য মনোনয়ন এবং একাডেমিক স্বীকৃতির নবায়নে বোর্ডে কষ্ট করে আসতে হয় না। মাদ্রাসায় বসে অনলাইনে সেবা পেয়ে যাচ্ছেন। অতি স্বল্পতম সময়ে শিক্ষার্থীর ট্রান্সফার, বিষয় কোড পরিবর্তন, নামের আক্ষরিক সংশোধন অনলাইনের মাধ্যমে সম্পাদন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নির্দেশনার আলোকে সকল ক্রয় কার্যক্রম এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের প্রথম থেকেই ই-টেন্ডারিংয়ে করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার আলোকে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ঐকান্তিত সহযোগিতায় গত প্রায় এক দশকে মাদ্রাসা শিক্ষাক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হয়েছে।