মাহে রমজানের আমল © সংগৃহীত
রমজান বছরের এক পবিত্র বিরতি। এ সময় আল্লাহ তাআলা বান্দাদের ধীর হতে, আত্মসমালোচনায় ফিরতে এবং জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের সঙ্গে নিজেদের পুনরায় সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে আহ্বান জানান। রোজা এই মাসের সবচেয়ে দৃশ্যমান ইবাদত হলেও রমজান কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি নিয়ত, দানশীলতা, ধৈর্য ও সহমর্মিতার এক অনন্য মৌসুম।
অনেক মুসলমান রমজানের শুরুতে আন্তরিক নিয়ত করেন। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে রমজানে সর্বোচ্চ সওয়াব পেতে আসলে কী করা উচিত? এর উত্তর দীর্ঘ করণীয় তালিকায় নিজেকে ভারাক্রান্ত করা নয়; বরং অর্থবহ, কল্যাণকর ও নিয়মিত আমলে মনোযোগ দেওয়া। তাহলে এটি একান্তভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়।
নিচে রমজানে করণীয় এমন পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ আমল তুলে ধরা হলো, এটি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, ঈমানকে দৃঢ় করে এবং বিশেষ করে কষ্টে থাকা মানুষের প্রতি রহমত সম্প্রসারিত করে। এগুলো কেবল তাত্ত্বিক পরামর্শ নয়; বরং বাস্তবমুখী আমল। এগুলো রমজানকে স্থায়ী সওয়াবের উৎসে পরিণত করতে পারে।
রমজানে সৎকর্মের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায় কেন
রমজানের বিশেষত্ব হলো, এ মাসে আল্লাহ তাআলা নেক আমলের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, প্রতিটি সৎকর্মের সওয়াব বহু গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়; আর রোজার প্রতিদান আল্লাহ নিজ হাতে প্রদান করেন। এই বিশেষ অনুগ্রহ রমজানকে অন্য সব মাস থেকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
রমজানের আধ্যাত্মিক পরিবেশও সওয়াব বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এ সময় মানুষের অন্তর নরম হয়, নিয়ত শুদ্ধ হয় এবং অন্যের প্রতি দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি পায়। বছরের অন্য সময়ে যে ছোট্ট ভালো কাজটি তেমন গুরুত্ব পায় না, রমজানে সেটিই বিশাল মর্যাদা লাভ করে।
এ কারণে আলেমরা গুণগত মানকে সংখ্যার চেয়ে অগ্রাধিকার দিতে বলেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা একটি খাঁটি ও আন্তরিক আমল, চিন্তাহীনভাবে করা বহু আমলের চেয়েও অধিক মূল্যবান হতে পারে। রমজান মূলত সৎকর্মের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার সুযোগ।
১. রমজানে দান-সদকা ও যাকাত আদায়
দান-সদকা রমজানের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ সারা বছরই দানশীল ছিলেন; তবে রমজানে তাঁর দান বহুগুণে বৃদ্ধি পেত। এটি এ মাসের চেতনারই প্রতিফলন—নিজের নিয়ামতের স্বীকৃতি এবং কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে দান।
রমজানে দান সম্পদকে পবিত্র করে এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। এটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে সমষ্টিগত দায়িত্ববোধে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। ক্ষুধা, অসুস্থতা বা বাস্তুচ্যুতির শিকার মানুষের জন্য আপনার দান হয়ে উঠতে পারে জীবনরেখা, যা তাদের প্রয়োজনের মুহূর্তে পৌঁছে যায়।
ইসলামি শিক্ষায় বর্ণিত আছে, রমজানে দান কেবল গ্রহীতার উপকারেই আসে না; বরং দাতাকেও বিপদ থেকে রক্ষা করে, বরকত বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়তা করে।
রমজানে যাকাত
যাকাত ফরজ ইবাদত, যা বছরের যেকোনো সময় আদায় করা যায়। তবে সওয়াবের প্রাচুর্যের কারণে অনেক মুসলমান রমজান মাসে যাকাত আদায় করেন। এতে সম্পদের পবিত্রতার সঙ্গে আধ্যাত্মিক উন্নতিও যুক্ত হয়।
সঠিক খাতে যাকাত প্রদান করলে তা ক্ষুধার্ত পরিবার, চিকিৎসাবঞ্চিত মা, বিশুদ্ধ পানির অভাবে থাকা জনগোষ্ঠীর জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। রমজানে আদায় করা যাকাত তাই মাসের গণ্ডি পেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
২. রোজাদারকে ইফতার করানো ও অসহায় পরিবারকে সহায়তা
রমজানে রোজাদারকে ইফতার করানো অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে তবে রোজাদারের সওয়াবে কোনো ঘাটতি হবে না।
এ আমল রমজানের প্রকৃত চেতনা নিঃস্বার্থতা, সহমর্মিতা ও মানবিক সংহতির প্রতীক। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ইবাদত কেবল ব্যক্তিগত সাধনা নয়; বরং অন্যের সম্মান ও বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষাও ইবাদতের অংশ।
রোজাদারকে ইফতার করানো শুধু আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুদের আপ্যায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বহু অঞ্চলে এমন পরিবার রয়েছে, যারা জানে না তাদের পরবর্তী খাবার কোথা থেকে আসবে। তাদের জন্য ইফতার বিতরণ বা কমিউনিটি রান্নাঘর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন।
৩. কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা
আল্লাহ তাআলা রমজানকে সেই মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন, যে মাসে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে। ফলে রমজানে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল।
কোরআন তিলাওয়াত কেবল দ্রুত শেষ করার প্রতিযোগিতা নয়; বরং তা বুঝে পড়া, চিন্তা করা এবং জীবনে বাস্তবায়নের আহ্বান। অনেকে পুরো কোরআন খতমের চেষ্টা করেন, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে অল্প অংশ হলেও অর্থ-অনুধাবন ও গভীর চিন্তার সঙ্গে পাঠ করলে তা জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
রমজানের আধ্যাত্মিক স্বচ্ছতা কোরআনের বাণীকে হৃদয়ে আরও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে সহায়তা করে।
৪. নিজের ও অন্যের জন্য দোয়া করা
দোয়া ইবাদতের অন্যতম অন্তরঙ্গ মাধ্যম। এটি বান্দা ও আল্লাহর সরাসরি যোগাযোগ। হাদিসে এসেছে, রোজাদারের দোয়া কবুল হয়। অনিশ্চয়তা ও সংকটে ভরা এ পৃথিবীতে দোয়া একদিকে আশ্রয়, অন্যদিকে দায়িত্ব।
রমজানে দোয়া কেবল নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য নয়; বরং অসুস্থ, বাস্তুচ্যুত, নিপীড়িত ও সংকটে থাকা মানুষের জন্যও হওয়া উচিত। যাদের কণ্ঠ হয়তো শোনা যায় না, তাদের জন্য দোয়া করা মানবিক সংহতির প্রকাশ। এ ধরনের দোয়া বিনয় সৃষ্টি করে এবং মনে করিয়ে দেয় ঈমান মানবতার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
৫. মানবসেবায় আন্তরিক অংশগ্রহণ
আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মানুষের সেবা ইবাদতে পরিণত হয়। রমজান মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে এসে অন্যের কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায়। মানবসেবা কেবল বড় উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সময় দেওয়া, দক্ষতা দিয়ে সহযোগিতা করা, মানবিক কার্যক্রমে সহায়তা করা বা অসহায় জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানো সবই রমজানে তাৎপর্যপূর্ণ আমল, যদি তা আন্তরিক নিয়তে করা হয়।
রমজান আমাদের শেখায়, ইবাদত ও মানবকল্যাণ একে অপরের পরিপূরক। আন্তরিক নিয়ত, ধারাবাহিক সৎকর্ম এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্য দিয়েই এ মাসকে সর্বোচ্চ সওয়াবের উৎসে পরিণত করা সম্ভব।