জুমার নামাজের খুতবা © সংগৃহীত
মুসলমানদের জন্য পবিত্র জুমার দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। এ দিনটি ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের কাছে সাপ্তাহিক ঈদের দিন হিসেবে পরিচিত। এ দিনের ইবাদত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতোই ফজিলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহর কাছে জুমার দিনটি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার মতোই শ্রেষ্ঠ দিন। এ দিনটি আল্লাহর কাছে অতি মর্যাদাসম্পন্ন। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর ১০৮৪)।
জুমার নামাজের একটি অপরিহার্য অংশ হলো খুতবা। এটি মুসল্লিদের জন্য কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়; বরং হেদায়েত, শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। খুতবা চলাকালীন মুসল্লিদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত বিশেষ করে কথা বলা, ইশারা করা কিংবা মনোযোগ বিচ্যুত হওয়া বিষয়ে ইসলামে রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা। কিন্তু বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, খুতবার সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, পাশের মুসল্লির সঙ্গে কথা বলা কিংবা অন্যকে চুপ করাতে গিয়ে নিজেই কথা বলার প্রবণতা। এসব আচরণ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “জুমার দিন ইমাম খুতবা দানকালে আপনি যদি পাশের কাউকে বলেন, ‘চুপ থাকুন’, তাহলে আপনি জুমার সওয়াব নষ্ট করে দিলেন।” (সহিহ বুখারি: ৮৯২; সহিহ মুসলিম: ৮৫১)
এ নিষেধাজ্ঞা শরিয়তসম্মত প্রশ্নের উত্তর দেওয়াকেও অন্তর্ভুক্ত করে; অন্য দুনিয়াবি বিষয় তো অবশ্যই এর অন্তর্ভুক্ত।
আবু দারদা (রা.) বলেন, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মিম্বরে বসে জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন। তিনি একটি আয়াত তিলাওয়াত করলে আমি পাশে থাকা উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-কে জিজ্ঞেস করি, আয়াতটি কখন নাজিল হয়েছে। তিনি কোনো উত্তর দেননি। খুতবা শেষে উবাই (রা.) বলেন, খুতবার সময় কথা বলার কারণে তুমি জুমার সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়েছ। বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানানো হলে তিনি বলেন, “উবাই ঠিক বলেছে। ইমাম খুতবা দেওয়া শুরু করলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুপ থাকবে।” (মুসনাদে আহমাদ: ২০৭৮০; সুনানে ইবনে মাজাহ: ১১১১)
আরও পড়ুন: জুমার দিনের যে বিশেষ আমল নবিজীর কাছে পৌঁছানো হবে
আল-বুসিরি (রহ.) হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। এ হাদিস প্রমাণ করে যে, জুমার দিন ইমামের খুতবাকালে নীরবতা পালন করা ফরজ এবং কথা বলা হারাম।
আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। সে সময় একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন। এমন মুহূর্তে একজন বেদুইন দাঁড়িয়ে বলল, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, পরিবার-পরিজন ক্ষুধায় কাতর। আপনি আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।” তখন তিনি দুই হাত তুললেন। তাঁর দুআর ফলে সেদিন বৃষ্টি নামল। এরপরের দিনও বৃষ্টি হলো, তারপরের দিনও হলো এভাবে পরবর্তী শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টি অব্যাহত থাকল। সেই জুমায় একই বেদুইন অথবা অন্য একজন দাঁড়িয়ে বলল, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! ঘরবাড়ি ভেঙে যাচ্ছে, সম্পদ ডুবে যাচ্ছে। আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করুন।” তখন তিনি আবার দুই হাত তুললেন। (সহিহ বুখারি: ৮৯১; সহিহ মুসলিম: ৮৯৭)
এ ছাড়া জুমার খুতবা চলাকালে সালাম দেওয়া হারাম। অতএব, ইমামের খুতবা চলাকালে যে ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করবে, তার জন্য সালাম দেওয়া জায়েজ নয় এবং অন্যদের জন্য সে সালামের উত্তর দেওয়াও জায়েজ নয়। (বিন উছাইমীনের ফতোয়াসমগ্র: ১৬/১০০)
জুমায় উপস্থিত মুসল্লিদের ওপর চুপ থেকে ইমামের খুতবা শোনা ফরজ। ইমাম খুতবা প্রদানকালে কথা বলা নাজায়েজ। তবে দলিলের ভিত্তিতে কিছু বিষয় এই বিধানের অন্তর্ভুক্ত নয় যেমন খতিবের সঙ্গে কথা বলা, খতিবের কথার জবাব দেওয়া অথবা কোনো অন্ধ ব্যক্তিকে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করার মতো জরুরি পরিস্থিতি।