দক্ষিণ এশিয়া
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় বিপুল সংখ্যক ডিগ্রি নেওয়া হলেও সেভাবে কর্মসংস্থান হচ্ছে না © এআই সৃষ্ট ছবি
উচ্চশিক্ষা অর্জনের একটি সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিক্স-২০২৫ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই মাস্টার্স বা তার চেয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হার সবচেয়ে বেশি। অথচ একই সঙ্গে বাংলাদেশই এই অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ বেকারত্বের হারের বোঝাও বইছে। তাই অনেকের মনেই এই প্রশ্নটি জাগছে যে, এ অর্জনটি কি আসলেই কোনো সাফল্য, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো গল্প?
ইউনেস্কোর পরিসংখ্যান যা বলছে
ইউনেস্কোর এ প্রতিবেদনে ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৫ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উচ্চতর ডিগ্রিধারী মানুষের গড় হার- বাংলাদেশে ৩.৭০ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। এই তালিকায় ৩.১০ শতাংশ নিয়ে মালদ্বীপ দ্বিতীয় এবং ৩.০৫ শতাংশ নিয়ে ভারত তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
অন্যান্য দেশের মধ্যে পাকিস্তানে এ হার ২.৬৮ শতাংশ, যেখানে ভুটান ও নেপালে যথাক্রমে ১.৮০ শতাংশ এবং ১.৭০ শতাংশ রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে, সাধারণ শিক্ষার হারে অনেক এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কা এই তালিকায় সবার নিচে রয়েছে, যেখানে উচ্চতর ডিগ্রিধারীর হার মাত্র ০.৭৭ শতাংশ।
এই দশকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার এই গ্রাফটি কেবল এক জায়গাতেই স্থির ছিল না। ২০১৫ সালে এই হার ছিল ৩.৩ শতাংশ, যা পরবর্তীতে বেড়ে ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ৪.৩ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২০ সালের ডেটা গ্যাপিং বা তথ্যের ঘাটতির পর ২০২২ সালে এই হার ৩.৭ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৩.৬ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। এই ধারাবাহিকতাই নির্দেশ করে যে, এটি কোনো সাময়িক বা আকস্মিক পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়, বরং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের একটি ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি।
একনজরে দক্ষিণ এশিয়ার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন (২০১৫-২০২৫ গড়)
|
দেশ |
মাস্টার্স বা উচ্চতর ডিগ্রিধারী প্রাপ্তবয়স্ক (গড়) |
|
বাংলাদেশ |
৩.৭০% |
|
মালদ্বীপ |
৩.১০% |
|
ভারত |
৩.০৫% |
|
পাকিস্তান |
২.৬৮% |
|
ভুটান |
১.৮০% |
|
নেপাল |
১.৭০% |
|
শ্রীলঙ্কা |
০.৭৭% |
সামাজিক প্রত্যাশার ওপর দাড়িয়ে থাকা এক ‘ডিগ্রি অর্থনীতি’
এই পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে প্রশ্ন তৈরি করছে, এত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি যদি মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেই থাকেন, তবে গ্র্যাজুয়েট বা উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার কেন এখনও এত উদ্বেগজনক হারে বেশি? শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর খোদ ডিগ্রির মধ্যে নেই, বরং লুকিয়ে আছে শিক্ষার্থীরা কেন এই ডিগ্রি অর্জন করছেন, সেই কারণের ভেতর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ এর পেছনে সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং কাঠামোগত চাপের এক যৌথ প্রভাবকে দায়ী করেছেন।
‘সামাজিক-সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যখন একজন শিক্ষার্থী অনার্স ডিগ্রি শেষ করার পর মাস্টার্স না করে, তখন সে নিজের মধ্যে এক ধরনের অপূর্ণতা অনুভব করে। সমাজও তাকে অপূর্ণ হিসেবেই দেখে ‘ -অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ
ড. মনিনুর রশিদের মতে, এই ধারণাটি আকস্মিকভাবে তৈরি হয়নি। কয়েক দশক ধরে শিক্ষানীতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং শ্রমবাজারের বিভিন্ন চর্চার মধ্য দিয়ে এটি গড়ে উঠেছে, যা সম্মিলিতভাবে একটি ব্যাচেলর বা অনার্স ডিগ্রিকে একটি ‘অসমাপ্ত পণ্য’ হিসেবে বিবেচনা করে।
তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ নিয়োগকর্তাই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনার্স এবং মাস্টার্স— উভয় ডিগ্রিই প্রত্যাশা করেন। যেহেতু এটি একটি নিয়ম বা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তাই শিক্ষার্থীরা অনার্স শেষ করার পর সরাসরি মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে যান।’
‘অনেক উন্নত দেশে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য ব্যাচেলর ডিগ্রিকেই চূড়ান্ত ডিগ্রি হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সবক্ষেত্রেই অনার্স থেকে মাস্টার্সে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াকে একটি অবধারিত বা স্বাভাবিক পথ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়’, যোগ করেন তিনি।
সামাজিক মর্যাদাই যখন হয়ে ওঠে ডিগ্রি অর্জনের চালিকাশক্তি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) আরেকজন অধ্যাপক, মোহাম্মদ মজিবুর রহমান এই সমস্যার মূল উৎস খুঁজে পেয়েছেন সমাজের আরও গভীরে প্রোথিত একটি ঐতিহাসিক ধারার মধ্যে।
‘ঐতিহাসিকভাবেই আমাদের সমাজে জন্মভিত্তিক এক কঠোর শ্রেণীপ্রথা বিদ্যমান ছিল। এরপর ব্রিটিশরা এ দেশে আসে এবং মানুষ দেখতে পায় যে সাধারণ বা নিম্ন সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেও যে কেউ শিক্ষার মাধ্যমে একজন এসডিও (SDO), আইনজীবী কিংবা ব্যারিস্টার হতে পারছেন। ফলে শিক্ষা- সামাজিক শ্রেণি ও মর্যাদা পরিবর্তনের একটি বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়। আর আমরা আজও সেই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি’ -অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান
একটি অফিসে লিফটম্যান, পিয়ন, ক্লার্ক, কর্মকর্তা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থাকেন। আমাদের সমাজে কে কতটা সম্মান পাবেন, তা দক্ষতা বা অবদানের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ধারিত হয় পদবি এবং অবস্থানের ওপর। কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার আগেই একটি উচ্চতর ডিগ্রি সমাজে একটি বড়ো পদবির সংকেত দেয়।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান যুক্তি দেখান যে, এই মানসিকতাই স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পেছনে এক অন্ধ গণছুট তৈরি করে, যেখানে অর্থনীতি এই বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েটদের আদৌ কর্মসংস্থানে জায়গা দিতে পারবে কি না— সেটি বিবেচনাতেই নেওয়া হয় না।
তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি ঠিক যতজন গ্র্যাজুয়েটকে চাকরি দিতে সক্ষম, আমাদের কেবল ততজনই তৈরি করা উচিত। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দর্শন ও ইতিহাসের মতো বিষয়গুলোতে বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের করছে। কিন্তু অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি শেষ করার পর এই শিক্ষার্থীরা আসলে কী করবে?’
পরিকল্পনায় কাঠামোগত ঘাটতি
উভয় বিশেষজ্ঞই একমত যে, এ সমস্যার মূল গভীরতা উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে নয়, বরং নীতিগত ব্যর্থতার মধ্যে লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সুযোগ ব্যাপক হারে বাড়িয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গ্র্যাজুয়েটদের সংখ্যার সাথে শ্রমবাজারের চাহিদার যোগসূত্র স্থাপনে কোনো সুসংগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মূল্যায়নে বেশ স্পষ্ট; ‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা একটি ত্রুটিপূর্ণ নীতিগত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে চালানো হচ্ছে। আসলে আরও নিখুঁতভাবে বলতে গেলে, আমাদের সত্যিকার অর্থে সুনির্দিষ্ট কোনো শিক্ষা দর্শনই নেই।’
‘সুনির্দিষ্ট দর্শন বা দূরদর্শিতা ছাড়া শিক্ষাক্রমের কোনো সুদৃঢ় ভিত্তি থাকে না। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শিক্ষাকার্যক্রমের পরিধি বড়ো হচ্ছে। বিপুল পরিমাণে ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একজন গ্র্যাজুয়েটের কী ধরনের যোগ্যতা থাকা উচিত এবং সেই দক্ষতার জন্য কোনো নিয়োগকর্তা আদৌ আছেন কি না, এ প্রশ্নটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।’
আরও পড়ুন: পে স্কেল-পেনশনে প্রয়োজন ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভিন্ন পন্থা সরকারের
ড. মনিনুর রশিদের সাথে আরেকটি দিক যোগ করেছেন। ‘যেহেতু একজন শিক্ষার্থীর আশেপাশের প্রায় সব সহপাঠীই মাস্টার্স করছেন, তাই এর বাইরে যাওয়াটা সামাজিক সম্মানের ক্ষেত্রে এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। পড়াশোনা আর না বাড়িয়ে মাঝপথে থেমে যাওয়াটা এখনও আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠেনি। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি সহপাঠীদের এই সামাজিক আচরণের মধ্য দিয়েই ব্যবস্থাটি নিজে নিজেই টিকে আছে।’
বেকারত্বকে বিলম্বিত করার যুক্তি
উচ্চ বেকারত্বের অর্থনীতিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে ভর্তি হওয়াটা কি আসলেই প্রকৃত মানবসম্পদ উন্নয়ন, নাকি এটি শ্রমবাজারে প্রবেশকে সাময়িকভাবে পিছিয়ে দেওয়ার একটি কাঠামোগত কৌশল মাত্র, তা নিয়ে শিক্ষা গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে একই সাথে এই দুটি প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।
মাস্টার্সের একদল শিক্ষার্থীর কাছে এ ডিগ্রিটি হলো প্রকৃত বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন এবং ক্যারিয়ারে এগিয়ে যাওয়ার একটি মাধ্যম। অন্যদিকে, আরেক দলের কাছে এটি একটি কঠোর ও আপোশহীন চাকরির বাজারে দুশ্চিন্তা এড়ানোর উপায়। যার মাধ্যমে সমাজে গ্রহণযোগ্য উপায়ে আরও কিছু সময় শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই পার করে দেওয়া যায়। ইউনেস্কোর (UNESCO) পরিসংখ্যান দিয়ে এই দুই দলের শিক্ষার্থীদের আলাদা করা সম্ভব নয়, তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমাজে উভয় দলেরই উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রায়ই দেখি শিক্ষার্থীরা কেবল তাদের ‘অনার্স ফিট’ (শিক্ষার্থী হিসেবে থাকার যোগ্যতা বা হোস্টেলের সুবিধা) বজায় রাখার জন্য মাস্টার্স করছেন, তারা যে আসলেই আরও পড়াশোনা করতে চান বিষয়টি তেমন নয়। এ ধরনের চর্চা আমাদের সমাজে বেশ গভীরভাবে জেঁকে বসেছে।’