২ বছর ধরে ‘দখল’ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের ইন্টার্ন হল, গণরুমে শোচনীয় হাল শিক্ষার্থীদের

আবাসনের দাবিতে পরীক্ষা বর্জন

১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩৮ AM , আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৫০ AM
গণরুমে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি

গণরুমে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি © টিডিসি ছবি

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের (এস‌এইচ‌এস‌এম‌সি) ১০ তলাবিশিষ্ট ইন্টার্ন হল নির্মাণের দুই বছরেও কোনো সুফল মিলছে না। হলটিতে আইন‌শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প থাকায় ইন্টার্ন চিকিৎসকরা অবস্থান করছেন কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের হোস্টেলে। এতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে গণরুমে।

এদিকে দীর্ঘদিনেও আবাসন সংকট নিরসন না হওয়ায় চলতি সেকেন্ড টার্ম মৌখিক পরীক্ষা বর্জন করেছেন শিক্ষার্থীরা। পাঁচটি পরীক্ষার তিনটিই ইতোমধ্যে বর্জন করেছেন তারা, আজ বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) চতুর্থ পরীক্ষাও বর্জন করার কথা রয়েছে। ফলে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির একটি বর্ষের একাডেমিক কার্যক্রম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ছয় তলাবিশিষ্ট দুটি আবাসিক হল রয়েছে। উভয় হল ২০০৮ সালে উদ্বোধন করা হয়। তবে তৎকালীন সময়ের চেয়ে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক শিক্ষার্থী সংখ্যা বেড়েছে। এতে এই হল দুটিতে স্থান সংকুলান হচ্ছে না।

এদিকে হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আবাসনের লক্ষ্যে পাশেই ১০ তলাবিশিষ্ট একটি মাল্টিপারপাস হল নির্মাণ করা হয়। ২০২৪ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত এতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা উঠতে পারেননি। জুলাই গণ‌অভ্যুত্থানের পর মোহাম্মদপুরের পার্শ্ববর্তী এই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভবনটিতে অস্থায়ী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। কিন্তু প্রায় দুই বছরেও এই ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়নি। ফলে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের হলেই অবস্থান করছেন। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প থাকা মাল্টিপারপাস ইন্টার্ন হল

ভয়াবহ গণরুম পরিস্থিতি
বুধবার (১৫ এপ্রিল) সরেজমিনে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, অপেক্ষাকৃত নতুন একাডেমিক ভবনের তুলনায় হল দুটি পুরোনো। জুলাই গণ‌অভ্যুত্থানের পর ছাত্ররা তাদের হলটির নামকরণ করেছেন ‘জুলাই-২৪ হল।’

ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতিবছর ২০০ থেকে ২৫০ শিক্ষার্থী মেডিকেলটিতে ভর্তি হন। ২০২৪-২৫ সেশনে ছাত্র ভর্তি হয়েছেন শতাধিক। তাদের ৮৮ জন হলে অবস্থান করছেন। তবে এর ৪৮ জনই থাকছেন দুটি গণরুমে।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছয়তলা ভবনটির প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় দুটি গণরুম রয়েছে। মূলত কমনরুম, খেলার রুম এবং নামাজের জায়গাকে গণরুম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে এস‌এইচ-২০ ব্যাচের (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী আরাফাত ইয়াসিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা গত বছরের ১৭ জুন ক্যাম্পাসে আসি। সোহরাওয়ার্দীর ইতিহাসে আমরা প্রথম গণরুমে উঠেছি। তখন থেকে এই পরিস্থিতিতে আছি। বারবার অথরিটিকে নক করছি। তারা বারবার বলে সমাধান করব, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের ১৩ এবং ১৪ ব্যাচ, যাদের দেড় বছর আগে ইন্টার্নশিপ শেষ, তারা এখনও হলে অবস্থান করছে। ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার পরে ৬ মাস অবস্থানের সুযোগ থাকে। ইন্টার্ন হলে ট্রান্সফার না হওয়ায় সবাই এখানে থেকে গেছে। অনেক দিন ধরে যারা হলে আছে, তাদেরকে যদি বাদ দিই, তাহলে ৪০টা সিট খালি হচ্ছে। বাকিরা কোথায় থাকবে?

হলের পরিবেশের বর্ণনা দিয়ে আরাফাত ইয়াসিন বলেন, আমাদের বলা হয়েছে কোলাবরেট করে থাকার জন্য, কিন্তু এভাবে মানবেতর উপায়ে তো থাকা যায় না। হলের ভেতরের পরিবেশ আরও খারাপ। ময়লা-আবর্জনা, ওয়াশরুমের পানি, কেঁচো— সব পাওয়া যায়।

এক রুমে ৫৫ জন, শতাধিক ছাত্রীর বিপরীতে ওয়াশরুম মাত্র দুটি
ছাত্রদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেল, পার্শ্ববর্তী ছাত্রী হলের পরিস্থিতি ছাত্র হলের তুলনায় করুণ। ওই হলের চারটি গণরুমে থাকতে হচ্ছে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রীদের। এর মধ্যে একটি কক্ষে থাকেন ৫৫ জন। এর সূত্র ধরে ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা।

হলটির চারটি কক্ষ প্রথম বর্ষে ভর্তির সময় বরাদ্দ পেয়েছিলেন ২০২৪-২৫ সেশনের ছাত্রীরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টিকে ডাকেন ‘কমনরুম’ বলে। এখানে গাদাগাদি করে থাকেন ৫৫ জন। একটি লাইব্রেরি রুম থাকলেও সেখানে আবাসন হয়েছে ২৭ জন ছাত্রীর। এতেও সংকুলান না হওয়ায় করিডোরে গ্লাস দিয়ে বানানো হয়েছে ‘গ্লাসরুম’, যেখানে থাকেন ১১ জন ছাত্রী। বাকি ১২ ছাত্রীর জন্য একরকম ‘নিয়ম’ লঙ্ঘন করে তৃতীয় তলার প্রথম কক্ষটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে; এই রুমটিরও ধারণক্ষমতা ৬ জনের।

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ছাত্রীরা বলছেন, সদ্য দ্বিতীয় বর্ষে ওঠা এই শিক্ষার্থীরা ছাড়াও ২০২৩-২৪ সেশনের ছাত্রীদেরও আবাসন সংকট রয়েছে। তারা কোথাও কোথাও ছয়জনের কক্ষে ৮ থেকে ৯ জনও থাকেন। তবে সবচেয়ে বেশি কষ্ট করতে হয় ২০২৪-২৫ সেশনের ছাত্রীদের। তাদের মোট ১০৫ জন আবাসিক ছাত্রীর জন্য ওয়াশরুম ও বাথরুম রয়েছে মাত্র দুটি। এতে তাদের ক্লাস-পরীক্ষায় অংশগ্রহণ থেকে দৈনন্দিন কাজেও ব্যাঘাত ঘটে, পাশাপাশি রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। গণরুম থেকে অন্যত্র আসন বরাদ্দ দেওয়া হলে ৪টি ওয়াশরুম পাবেন তারা, এই দুটি বেশি ওয়াশরুম প্রাপ্তিও যেন তাদের পরম আরাধ্য এখন।

গণরুমে গাদাগাদি করে বসবাস শিক্ষার্থীদের

গণরুমের পরিবেশের বর্ণনা দিয়ে আতিয়া আক্তার রেণু নামে এক ছাত্রী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা রুমে শুধু বেড রাখার সুযোগ পাই। আমাদের লাগেজ, ট্রাঙ্ক সব করিডোরে অরক্ষিত পড়ে থাকে। চলাচলের জায়গা নাই, পার্সোনাল স্পেস নাই, এতগুলো মানুষ একসাথে থাকার কারণে পড়াশোনার এনভায়রনমেন্টও থাকে না।

তিনি বলেন, আমাদের জন্য দুইটা ওয়াশরুম, দুইটা বাথরুম। কলেজ টাইমে আমাদের খুব বাজে অবস্থা তৈরি হয়। বিকাল ৫টা পর্যন্ত গোসলে যাওয়ার সিরিয়াল চলতে থাকে। ওয়াশরুমও খালি পাওয়া যায় না। আমরা অ্যালটমেন্ট পেলে ৪টা ওয়াশরুম ৪টা বাথরুম পাব।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ছাত্রী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা যখন কমনরুমে থাকি, নির্দিষ্ট রুলস-রেগুলেশন মানতে হয়। যেমন— ১২টার আগে লাইট অফ, আর সকাল ৭টার আগে লাইট অন করা যাবে না। আমরা যদি ৮ জনের রুমে শিফট হই, তখন নিজেদের মধ্যে কম্প্রোমাইজ করে নেওয়া যায়। এদিকে আমরা ফ্রিজ, ইনডাকশন এসব ব্যবহার করতে পারব না। আমরা অ্যালটেড, কিন্তু আমাদের ফ্যাসিলিটিজ খুব সীমিত।

অপর এক ছাত্রী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের কিছু আপু আছে, যারা ৮ জনের রুমে ৪ জন থাকে। কিছু বেডে ছয়জনের অ্যালটমেন্ট, আছে ২ জন বা তিনজন। ওনারা রুমে থাকে না। এজন্য হলটা যদি সার্চ করা হয়, আমরা অনেকগুলো সিট পাব। ১৩ ব্যাচের আপুদের ইন্টার্নশিপ, এমনকি এফসিপি‌এস এক্সামও শেষ, ১৪ ব্যাচেরও এক্সাম শেষ। ওনারা সবাই ১৮টা রুমে আছেন। ওনাদেরকে সুপারভাইজার ম্যামের তরফ থেকে ৭টা রুমে শিফট হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, বাকি ১১টা রুম ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা রুম চেঞ্জ করেননি। তবে তারা রুম ছেড়ে দিলে এতেও সমস্যার পূর্ণ সমাধান হবে না।

তিন দফা দাবি শিক্ষার্থীদের
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে ২০২৫-২৬ সেশনের ক্লাস শুরু হওয়ার কথা। এ অবস্থায় বাড়তি আবাসন সংকট তৈরি হবে। নতুন ব্যাচকে গণরুমে দেওয়া হলে ২০২৪-২৫ সেশনের আবাসনের কী হবে; সেটি এখনও স্পষ্ট নন তারা। এ অবস্থায় মেডিকেল কলেজ প্রশাসনের কাছে তিন দফা দাবি জানিয়েছেন তারা। দাবি আদায়ে পরীক্ষা বর্জনও করেছেন।

শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবি হচ্ছে- ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়া শিক্ষার্থীদের দ্রুততম সময়ে হলত্যাগ নিশ্চিত করা, হলে অনিয়মিত ও পরিবারের সঙ্গে বসবাসরত শিক্ষার্থীদের সিট বাতিল করে শিক্ষার্থীদের মাঝে পুনর্বণ্টন এবং ইন্টার্ন হল থেকে সেনাবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প সরিয়ে নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, এসব সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান না হলে তাদের একাডেমিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

‘ধীরে ধীরে’— বলছে প্রশাসন, পরীক্ষা বর্জনে ক্ষুব্ধ
গত ৩০ মার্চ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সাকি মোহাম্মদ জাকিউল আলমকে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা শিক্ষা) পদে নিয়োগ দেওয়া হয় । একইদিন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পান পেডিয়াট্রিক্স বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আঈনুল ইসলাম খান। তবে প্রশিক্ষণে থাকায় তাকে পাওয়া যায়নি।

অধ্যক্ষের অবর্তমানে দায়িত্বে থাকা নেফ্রোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এটিএম সোলায়মান কবির দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হঠাৎ করে কোনো ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। সব কিছু ধীরে ধীরে সমাধান করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহারের বিষয়ে অধ্যক্ষ কথা বলেছেন। তারা চলে যাবে।

দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলার সময় পরীক্ষা বর্জন করায় ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীদের প্রচ্ছন্ন হুমকিও দিয়েছেন তিনি। বলেন, তারা পরীক্ষা না দেওয়ার জন্য এসব করছে। আমরা তাদের পরীক্ষা নেব না। তারা ঘুরবে আমাদের পেছনে। এই পরীক্ষা ছাড়া তারা প্রফে বসবে কিভাবে? তারা আসবে আমাদের কাছে, এটা তাদেরকে বলে দেন।

জনবল নিয়োগ দেবে ইজি ফ্যাশন, কর্মস্থল ঢাকা, আবেদন শেষ ১২ মে
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬
ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করায় দুই যুবককে কারাদণ্ড
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬
অসামাজিক কর্ম: ড্রিমল্যান্ড হোটেল থেকে ৯ পুরুষ ও ৪ নারী থেক…
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬
দুই সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের তদন্ত কমিট…
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬
বিশ্বকাপের আগে বড় দুঃসংবাদ পেল ফ্রান্স
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬
কল সেন্টারে এক্সিকিউটিভ নিয়োগ দেবে ভিভো বাংলাদেশ, পদ ১০, কর…
  • ১৬ এপ্রিল ২০২৬