স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত © ফাইল ছবি
দেশীয় আইনে আত্মহত্যাকে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বিবেচনা না করে অপরাধপ্রবণতা হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। ফলে এর সঙ্গে জড়িত স্টিগমা আরও শক্তিশালী হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টারস ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আঁচল ফাউন্ডেশন এবং হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসকে সামনে রেখে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। আত্মহত্যা চেষ্টার পর প্রতিবছর ৭ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সুইসাইডাল আইডিয়েশনের সংখ্যাটা আরও অনেক বেশি হবে। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন মানুষের এ ধরনের চিন্তা আসতে পারে। এই চিন্তাগুলো আসা মানে প্রথম ধাপে আপনি ঢুকে গেছেন।
তিনি বলেন, ‘পুরো বিষয়টাকে একটা মানসিক স্বাস্থ্য, সাপোর্ট সিস্টেমের অভাব এবং পলিসি—এই বিষয়গুলো না ভেবে আমরা যদি এটাকে ক্রিমিনালাইজ করতে থাকি, আমরা যদি মনে করি যে এটা একটা অপরাধ এবং আমরা একজন অপরাধীর বিষয়ে ভাবছি, কথা বলছি, সেখান থেকে আমাদের সমাজে আসলে কিন্তু বিরাট ধরনের স্টিগমা আছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আত্মহত্যার ঘটনায় সবারই একটা চেষ্টা থাকে বিষয়টাকে ধামাচাপা দেওয়ার। সেটার কারণ একদিকে যেমন এই স্টিগমা, মানসিকভাবে নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া, নেতিবাচক যে মনোভাব, ওই পরিবারের ওপরে দোষারোপ করার প্রবণতা—কেন এমন হলো, নিশ্চয়ই বাবা-মার কোনো সমস্যা; কেন এমন হলো, নিশ্চয়ই ছেলেটার কোনো সমস্যা—ফলে আমাদের এই বিষয়গুলো এক ধরনের ট্যাবু হয়ে আছে, আমরা এগুলো নিয়ে কথা বলি না।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের বর্তমান আইনে আসলে সুইসাইডের ঘটনাটাকে ক্রিমিনালাইজ করা আছে। এটা তো ক্রিমিনাল কোনো অ্যাক্ট না। এই আইনের ফলে অনেক সমস্যা হচ্ছে এবং এর সঙ্গে জড়িত যে স্টিগমাগুলো তৈরি হয়, সেগুলো স্ট্রেনদেন হচ্ছে। আমি আশা করি, আলোচনার মাধ্যমে সেটা নিয়েও কাজ করার সুযোগ আছে। আমি অন্তত একজন সংসদ সদস্য হিসেবে আগ্রহী থাকব এ বিষয়ে জানতে এবং যৌক্তিকভাবে কীভাবে এটা তুলে ধরা যায় সেটার জন্য।’
মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় সরকারের উদ্যোগ বর্ণনা করে তিনি বলেন, পাবনায় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল আধুনিকায়নে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সেটার পরিধি বৃদ্ধি, নতুন নতুন ভবন নির্মাণ এবং নতুন জনবল দিয়ে এটিকে আরও ডেভেলপ করা হবে। একইসাথে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটকেও স্ট্রেনদেন করার জন্য বিভিন্ন কাজ এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করছি।
কমিউনিটি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য অবহেলিত রয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করেছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রান্তিক মানুষদের জন্য কোনো সেবার ব্যবস্থা নেই। উপজেলা পর্যায়ে একটা মানুষের এই অ্যাংজাইটি, ডিপ্রেশন, সুইসাইডাল আইডিয়েশন—যা যা সমস্যার কথা আমরা পড়ি, বলি, দেখি—কোনো কিছু নিয়ে কিছু করার কোনো সুযোগও নাই, মানুষ জানেও না কোথায় যেতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এজন্য আমরা আরেকটা প্রকল্প নিয়েছি, যেখানে আমাদের কমিউনিটি মেন্টাল হেলথের ওপর এমফাসিস থাকবে। এমফাসিস থাকবে উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ের সঙ্গে কীভাবে আমাদের সেবাগুলোকে লিঙ্ক করা যায়। এক্ষেত্রে আমাদের কিছু আইডিয়া আছে, টেকনোলজির কিছু ব্যবহার করা যেতে পারে।’
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘টেলি-কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে যদি কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রাখা যায়, কথা বলা যায় এবং আরও কিছু কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা এই বিষয়গুলো নিয়ে। এমনকি আমাদের পলিসি লেভেলেও কিন্তু এই যে আমাদের দুইটা বড় প্রফেশনালরা আছেন এই ফিল্ডে, সাইকিয়াট্রিস্ট এবং ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, তাদেরকেও কিন্তু আমরা সর্বাত্মকভাবে যতটুকু আছে আমাদের সম্পদ সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারছি না।’
আরও পড়ুন: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের তুলনায় বেশি আত্মহত্যা স্কুল-কলেজে
আত্মহত্যা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে যে ক্যাম্পেইন, এটাকে আসলে শেষ পর্যন্ত আপনাকে একটা সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। সেই আন্দোলনটা পজিটিভভাবে দেখে, আন্দোলনটা হতে পারে এবাউট ওয়েলবিং। আমরা সবাই সুস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন, সেটা শারীরিক এবং মানসিক। দুই ক্ষেত্রেই আমরা প্রিভেনশনের দিকে জোর দেব, যাতে আমাদের সেই অবস্থা না হয়, সেই ওয়েলবিং স্টেটে আমরা থাকতে পারি, যেটাকে আমরা হেলথ বলে সংজ্ঞায়িত করি। সেটাকে লক্ষ্য রেখে আমাদের কর্মসূচিগুলো নকশা করা।’
‘ফ্রম সাইলেন্স টু অ্যাকশন: চেঞ্জিং দ্য ন্যারেটিভ অন সুইসাইড অ্যামং ইউথ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোহাম্মদ তানসেন। এতে কী-নোট স্পিকার হিসেবে ছিলেন ফাউন্ডেশনের লিড সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. সায়েদুল ইসলাম সায়েদ। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ ফকরুল ইসলাম এমপি।
বিশেষ সেশনে আলোচক হিসেবে ছিলেন হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের পরিচালক জিয়ানুর কবির, লেখক ও গবেষক গওহর নঈম ওয়ারা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কানু উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার (মেন্টাল হেলথ) হাসিনা মমতাজ, এটিএন বাংলার কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর আকরামুল হক সায়েম, ডিগনিটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও প্রজেক্ট ম্যানেজার আশরাফুল আনোয়ার রোজেন, ইনসাইট ফর চেঞ্জ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নওফাল জামির, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও সাবেক পরিচালক ডা. মো. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. সাইফুন নাহার।