প্রতীকী ছবি © টিডিসি সম্পাদিত
দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে আত্মহত্যার মতো ‘কঠিন সিদ্ধান্ত’ নেওয়ার কথা ভাবেন। আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধে শুধু মৃত্যুর ঘটনা কমানোর দিকে নজর দিলে হবে না। আত্মহত্যার চিন্তা, পরিকল্পনা ও চেষ্টার প্রতিটি ধাপেই কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সেমিনারে এ-সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরা হয়। বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: ক্রমবর্ধমান সংকট’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রকাশ করে।
এবারের বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের মূল বার্তা ‘আত্মহত্যা নিয়ে প্রচলিত ধারণা পরিবর্তন’। অর্থাৎ আত্মহত্যাকে ঘিরে নীরবতা, সামাজিক কলঙ্ক ও ভুল ধারণা পরিবর্তন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রমাণভিত্তিক আলোচনা এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর ৭ লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান। ওই বছর আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লাখ ২৭ হাজার। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে আত্মহত্যা বিশ্বব্যাপী তৃতীয়। এ ছাড়া বিশ্বে আত্মহত্যাজনিত মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৩ শতাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
বাংলাদেশে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র নির্ণয়ে বড় সমস্যা হলো নির্ভরযোগ্য জাতীয় পর্যায়ের নজরদারি ব্যবস্থার অভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তুলনাযোগ্য হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর হার ছিল প্রতি এক লাখে প্রায় ২ দশমিক ৮ জন। তবে জাতীয় প্রশাসনিক তথ্য, পুলিশের হিসাব এবং বিভিন্ন জরিপভিত্তিক তথ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ফলে দেশে আত্মহত্যার প্রকৃত বোঝা কতটা, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা কঠিন।
এ কারণে একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় আত্মহত্যা নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তবে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা দিয়ে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যায় না। কারণ আত্মহত্যার প্রবণতা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোয়। এর ধাপগুলো হলো আত্মহত্যার চিন্তা, আত্মহত্যার পরিকল্পনা, আত্মহত্যার চেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু। বাংলাদেশে এই ধারাবাহিকতার আগের ধাপগুলোর প্রবণতাও যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
২০২৫ সালের আগস্টে ‘হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস’ সাময়িকীতে বাংলাদেশে আত্মহত্যাসংশ্লিষ্ট আচরণের প্রবণতা নিয়ে একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও সমন্বিত বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশে আত্মহত্যাসংশ্লিষ্ট আচরণ নিয়ে এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলোর একটি হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হচ্ছে। গবেষণাটিতে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত ৩৪টি গবেষণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে মোট ২৭ হাজার ৯৯২ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। অন্তর্ভুক্ত গবেষণাগুলোর প্রায় অর্ধেকই ছিল শিক্ষার্থীদের নিয়ে।
গবেষণায় জীবনের কোনো এক সময়ে এবং গত ১২ মাসে আত্মহত্যাসংশ্লিষ্ট আচরণের হার আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
আত্মহত্যার চিন্তা: জীবনের কোনো এক সময়ে ২৪ দশমিক ২ শতাংশ। গত ১২ মাসে ১৫ শতাংশ।
আত্মহত্যার পরিকল্পনা: জীবনের কোনো এক সময়ে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। গত ১২ মাসে ৫ দশমিক ২ শতাংশ।
আত্মহত্যার চেষ্টা: জীবনের কোনো এক সময়ে ৭ শতাংশ। গত ১২ মাসে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
এ ছাড়া গত এক মাসে আত্মহত্যার চিন্তার সমন্বিত হার ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
গবেষণার সমন্বিত ফল অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় প্রতি চারজনের একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে আত্মহত্যার চিন্তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। আর প্রায় প্রতি ১৪ জনে একজন জীবনে অন্তত একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করার কথা জানিয়েছেন। তবে গবেষণার ফল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সতর্কতা রয়েছে। এসব হিসাবের মধ্যে গবেষণাগুলোর ফলাফলের ভিন্নতা ছিল অনেক বেশি। পাশাপাশি গবেষণার বড় একটি অংশ শিক্ষার্থী ও শহরভিত্তিক জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে।
তাই এসব পরিসংখ্যানকে বাংলাদেশের জাতীয় জনসংখ্যার সরাসরি হার হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। অন্য কিছু বিশ্লেষণে গত এক বছরে আত্মহত্যার চিন্তার হার ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আত্মহত্যার পরিকল্পনার হার ৭ দশমিক ৩ শতাংশ পাওয়া গেছে। গত এক মাসে আত্মহত্যার চিন্তার হার ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।