আন্তর্জাতিক গবেষণায় স্বাস্থ্যের বেহাল দশা

হামে মৃত শিশুদের ৭১ শতাংশেরই মেলেনি আইসিইউ, হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেছে ৮২ শতাংশ

১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৪ PM , আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৭ PM
হামে এ পর্যন্ত ৭ শতাধিক মৃত্যু ঘটেছে

হামে এ পর্যন্ত ৭ শতাধিক মৃত্যু ঘটেছে © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর পেছনে টিকাদানের ঘাটতিকেই প্রধান কারণ হিসেবে বলে আসলেও আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, কেবল টিকার অভাবই নয়, দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর দুর্বলতাও এই মৃত্যুর মিছিলের জন্য সমানভাবে দায়ী। হামে প্রাণ হারানো ৩৪টি শিশুর চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের ৭১ শতাংশেরই শেষ মুহূর্তে জীবন রক্ষাকারী আইসিইউ (আইসিইউ) সুবিধা মেলেনি। এখানেই শেষ নয়, যথাযথ চিকিৎসার খোঁজে ৮২ শতাংশ শিশুকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হেলথে প্রকাশিত ‘বিয়ন্ড ইমিউনিটি গ্যাপস: হেলথ-সিস্টেম কনস্ট্রেইন্টস অ্যান্ড মিজলস মর্টালিটি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সংকট, জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসার অভাব, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে বারবার স্থানান্তর, রেফারেলে বিলম্ব, অক্সিজেন ও জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসার ব্যয়— এসব কারণ হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।

গবেষণাটি করেছেন বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) সায়েন্টিস্ট ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন। গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি তথ্য অনুসারে গত ২২ জুন পর্যন্ত দেশে ৯৩ হাজার ৭৫৫ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পরীক্ষায় ১১ হাজার ১৭১ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে ৫৯০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

গবেষকের মতে, বিশ্বের সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবের তুলনায় বাংলাদেশের মৃত্যুর হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি। উদাহরণ হিসেবে ইউরোপ অঞ্চলের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে সেখানে ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি হাম রোগী শনাক্ত হলেও মৃত্যু হয়েছিল মাত্র ৩৮ জনের। এই পার্থক্য কেবল টিকাদানের হার দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নিশ্চিত হওয়া হামজনিত মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ঘটেছে। এ বয়সে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা দেওয়া হয় না।

ফলে সংক্রমিত হওয়ার পর এসব শিশুর জীবন পুরোপুরি নির্ভর করে দ্রুত রোগ শনাক্ত হওয়া, সময়মতো হাসপাতালে ভর্তি, অক্সিজেন সাপোর্ট, নিবিড় পরিচর্যা এবং দক্ষ চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর।

সরকারি মৃত্যুর বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না হওয়ায় গবেষক মার্চ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত দেশের ছয়টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ৩৪টি শিশুমৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণ করেন। প্রতিটি ঘটনার চিকিৎসাপথ, রেফারেল, হাসপাতাল পরিবর্তন, আইসিইউ প্রয়োজন, আর্থিক প্রতিবন্ধকতা এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়।

বিশ্লেষণে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। এর মধ্যে রয়েছে— ১০০ শতাংশ শিশুর আইসিইউ বা পেডিয়াট্রিক আইসিইউ প্রয়োজন হয়েছিল, ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পিআইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি অথবা শয্যা খালি ছিল না, ৮২ শতাংশ শিশুকে দুই বা তার বেশি হাসপাতালে ঘুরতে হয়েছে, ২৯ শতাংশ শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা থেকে ঢাকায় পাঠাতে হয়েছে আর ৬৫ শতাংশ পরিবার চিকিৎসার ব্যয় বহনে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে; কেউ গয়না বিক্রি করেছেন, কেউ ঋণ নিয়েছেন।

এ ছাড়া ৩৮ শতাংশ ক্ষেত্রে রেফারেলে অন্তত এক দিনের বিলম্ব হয়েছে, ২১ শতাংশ ঘটনায় রোগ শনাক্তে বিলম্ব বা ভুল রোগ নির্ণয়ের তথ্য পাওয়া গেছে, ১৫ শতাংশ শিশু আইসিইউতে পৌঁছানোর আগেই অথবা হাসপাতালে স্থানান্তরের পথে মারা গেছে। এর বাইরে জেলা পর্যায়েও নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা।

গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ২২ জেলায় সরকারি আইসিইউ সুবিধা নেই। সরকারি খাতের মোট ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যার ৫৫ শতাংশই ঢাকার ২২টি হাসপাতালে কেন্দ্রীভূত। ফলে মফস্বলের গুরুতর অসুস্থ শিশুদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক পরিবারকে কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় আসতে হয়েছে। এই দীর্ঘ চিকিৎসা পথে অনেক শিশুর অবস্থার অবনতি হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়েছে, হাম প্রতিরোধে জেলা পর্যায়ে এমআর টিকার কভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশে উন্নীত করা জরুরি। তবে একই সঙ্গে শিশু নিবিড় পরিচর্যা সেবা বিকেন্দ্রীকরণ, অকেজো আইসিইউ চালু করা, নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য জরুরি চিকিৎসা সহজলভ্য করার ওপরও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

গবেষকের ভাষায়, টিকাদানের আওতা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা— দুটিই হামে মৃত্যুহার নির্ধারণ করে। তাই শুধু টিকার ঘাটতি পূরণ করলেই হবে না, গুরুতর অসুস্থ শিশুদের বাঁচানোর মতো চিকিৎসা সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও যদি কোনো শিশু হামে মারা যায়, তবে সেটি কেবল টিকাদানের ব্যর্থতা নয়; বরং জীবন রক্ষার জন্য গড়ে তোলা স্বাস্থ্যব্যবস্থারও ব্যর্থতা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত সমাধান করা না গেলে প্রতিরোধযোগ্য এই রোগে আরও অনেক শিশুর প্রাণহানি ঘটতে পারে।

রাবির হরিজন পল্লিতে বাণিজ্যিকভাবে শূকর পালন, দুর্গন্ধে অতিষ…
  • ১১ জুলাই ২০২৬
ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার নিয়োগ দেবে স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী…
  • ১১ জুলাই ২০২৬
এইচএসসি পরীক্ষায় ‘নকল’ করতে না দেওয়ায় কেন্দ্রে ভাঙচুর, পুলি…
  • ১১ জুলাই ২০২৬
যেভাবে মেক্সিকোর ‘অঘোষিত নায়ক’ হয়ে উঠলেন হলান্ড
  • ১১ জুলাই ২০২৬
প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে চাকরি, করুন আবেদন
  • ১১ জুলাই ২০২৬
কবি নজরুল কলেজের নতুন উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক
  • ১১ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence