আফ্রিকার কয়েকটি দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ইবোলা ভাইরাস © আনন্দবাজার
নতুন করে বিশ্বে আবারও হানা দিয়েছে ইবোলা ভাইরাস। বিশেষ করে আফ্রিকার দুই দেশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও উগান্ডায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী এ রোগ। এর ভয়াবহতা এতই বেশি যে, বর্তমান পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ উল্লেখ করে এরই মধ্যে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। এশিয়ায় এ ভাইরাস এখনো শনাক্ত না হলেও পুরো বিশ্বকেই সতর্ক করা হয়েছে।
ডব্লিউএইচও’র আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইবোলা ভাইরাস ইতোমধ্যে সীমান্ত অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এর বিস্তার, মৃত্যুহার ও অনিশ্চয়তা বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস এ পরিস্থিতি নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করে বলেছেন, আক্রান্ত অঞ্চলে চলমান সংঘাত, মানবিক সংকট, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও মানুষের উচ্চ চলাচল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকার আহবান জানান তিনি।
কী এই ইবোলা ভাইরাস?
এটি আসলে বিশ্বের প্রাণঘাতী ভাইরাসগুলোর মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত। ‘ফাইলোভিরিডি’ পরিবারভুক্ত একটি অত্যন্ত মারাত্মক ও সংক্রামক জুনোটিক ভাইরাস। এতে আক্রান্ত রোগীর শরীরে তীব্র জ্বর, শরীরের ভেতরে ও বাইরে রক্তক্ষরণ, অঙ্গ বিকল হওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ইবোলার গড় মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে অতীতের বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবে মৃত্যুহার ২৫ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্তও ছিল। মধ্য আফ্রিকার কঙ্গোর ইবোলা নদীর অববাহিকায় ১৯৭৬ সালে এ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল বলে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘ইবোলা’। ডব্লিউএইচও’র মতে প্রাকৃতিকভাবে ফলখেকো বাদুড় এ ভাইরাসের প্রধান বাহক।
যেভাবে ছড়ায়
দুভাবে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। প্রথম পর্যায়ে এটি বনে থাকা সংক্রমিত বন্যপ্রাণী যেমন: বাদুড়, শিম্পাঞ্জি, গরিলা, বানর বা শজারু এর লালা, রক্ত, অন্যান্য নিঃসৃত রস বা কাঁচা মাংসের সরাসরি সংস্পর্শে আসলে মানুষের শরীরে এটি প্রবেশ করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে মানুষ থেকে মানুষের দেহে ছড়ায়। মানুষের মধ্যে এটি ছড়ানোর প্রধান কারণ হলো সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শ।
ইবোলা আক্রান্ত বা মৃত ব্যক্তির রক্ত, লালা, বমি, মল-মূত্র, বীর্য বা ঘামের সরাসরি সংস্পর্শে আসলে এটি দেহে প্রবেশ করে, আক্রান্ত রোগীর ব্যবহৃত সুচ, সিরিঞ্জ, বিছানার চাদর, কাপড় বা চিকিৎসা সরঞ্জাম স্পর্শ করলেও আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ ছাড়া মৃত ব্যক্তির মৃতদেহ সরাসরি স্পর্শ করা ও যৌন মিলনের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে।
অবাক করার বিষয় হলো, এই রোগ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাওয়ার পরও পুরুষদের বীর্যে ইবোলা ভাইরাস দীর্ঘদিন কিছু ক্ষেত্রে কয়েক মাস বেঁচে থাকতে পারে। এরই মধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ১৩০ এর অধিক মৃত্যুর খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাওয়া গেছে। কঙ্গোর স্থানীয় কর্মকর্তারা এই মৃত্যুর খবর ও ৫ শতাধিকের আক্রান্ত হওয়ার খরব জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিছু টিকা এলেও এখনো গবেষণা চলমান। তাই দ্রুত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হলে এই প্রাদুর্ভাব মধ্য আফ্রিকা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়া বা এশিয়া উপমহাদেশের নাম উল্লেখ করে আলাদা সতর্কতা জারি না করলেও, ‘সব সদস্য রাষ্ট্রের’ জন্য বিশেষ প্রস্তুতিমূলক নির্দেশনা দিয়েছে ডব্লিউএইচও। দ্রুত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হলে এই প্রাদুর্ভাব মধ্য আফ্রিকা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নিতে পারে।
আরও পড়ুন: ১৫ জেলায় ১১টার মধ্যে একাধিকবার কালবৈশাখীর সতর্কবার্তা, ঘরে থাকার পরামর্শ
কতটা ভয়াবহ?
আগেই বলা হয়েছে, এটি সংক্রামক ভাইরাস, যার গড় মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ এবং ক্ষেত্রবিশেষে তা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। শরীরে প্রবেশের পর এটি দ্রুত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে লিভার ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো বিকল করে দেয়। রোগের তীব্র পর্যায়ে রোগীর শরীরের ভেতরে এবং বাইরে মারাত্মক রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি তীব্র বমি ও ডায়রিয়ার কারণে চরম পানিশূন্যতায় ভোগেন। এর একপর্যায়ে এসে মৃত্যু নিশ্চিত।
সংক্রমণ এড়াতে সতর্কতা
ডব্লিউএইচও এবং ইউএস সিডিসি-এর নির্দেশনা অনুযায়ী এই রোগ প্রতিরোধে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। ইবোলা আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির রক্ত, বমি, লালা, বা মলমূত্রের সরাসরি সংস্পর্শ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকতে হবে; আক্রান্ত রোগীর ব্যবহৃত কাপড়, বিছানা, সুই বা চিকিৎসার সরঞ্জাম কোনো সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়া স্পর্শ করা যাবে না।
আক্রান্ত অঞ্চলের বন্যপ্রাণী (বিশেষ করে বাদুড় বা বানর জাতীয় প্রাণী) ধরা এবং কাঁচা বা আধসিদ্ধ মাংস খাওয়া যাবে না; স্বাস্থ্যকর্মী বা সেবাদানকারীদের অবশ্যই চিকিৎসাক্ষেত্রে পিপিই, ফেস শিল্ড, গাউন এবং গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে; ইবোলায় মৃত ব্যক্তির মরদেহ কোনো রকম সরাসরি স্পর্শ ছাড়া করা যাবে না এবং সাবান-পানি বা অ্যালকোহলযুক্ত স্যানিটাইজার দিয়ে নিয়মিত ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।