বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গোলটেবিল বৈঠক আয়োজিত হয় © টিডিসি ছবি
হামের নতুন প্রাদুর্ভাবে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে বিশেষজ্ঞদের কপালে। চলতি বছর বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ভেস্তে দিয়েছে এই প্রাদুর্ভাব। এছাড়া দীর্ঘদিনের ট্রেন্ড বদলে দিয়ে ‘প্রায় নির্ধারিত’ বয়সের আগেই শিশুদের আক্রমণ করে বসছে রোগটি। এতে হন্যে হয়ে মুক্তির উপায় খুঁজছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, সাধারণত ৯ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয় না। কারণ মায়ের গর্ভে থাকাকালে এবং বুকের দুধ পান করার সময় প্রাপ্ত প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শিশুকে ৯ মাস বয়স পর্যন্ত হাম থেকে সুরক্ষা দিয়ে থাকে। কিন্তু এবার ৬ মাস বয়সেই হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে শিশুরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মায়ের শরীর থেকে যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শিশুর পাওয়ার কথা, বিভিন্ন কারণে সেটি না পাওয়ায় শিশু আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে। এজন্য প্রয়োজনে মেয়েদের কিশোরী বয়সে হামের বুস্টার ডোজ দেওয়া যায় কি—না সেটি ভেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আজ রবিবার (১২ এপ্রিল) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মিল্টন হলে ‘হামের পুনঃআবির্ভাব: প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনার প্রতিবন্ধকতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী। এতে কী-নোট স্পিকার ছিলেন শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জেসমিন মোরশেদ। গোলটেবিল বৈঠকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ভাইরোলজিস্টসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা অংশ নেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী তার বক্তব্যে বলেন, আমরা এতদিন কনফিডেন্ট ছিলাম যে ৬ মাস পর্যন্ত শিশুদের হাম হয় না। কিন্তু এখন হচ্ছে। তার অর্থ মায়ের ইমিউনিটিটা বাচ্চার শরীরে যাচ্ছে না। এজন্য কিশোরীদের বুস্টার ডোজ দিতে পারি কি—না, সেটা ভেবে দেখতে হবে। এক্ষেত্রে মায়েদের ওপরে গবেষণা পরিচালনার প্রয়োজন রয়েছে। যদি কাজে দেয়, তাহলে বিয়ের আগে একটা বুস্টার ডোজ দেওয়া যেতে পারে।
হাম শনাক্ত না হলেও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, কেউ কেউ বলছেন যে উপসর্গ দেখা দিলেই তা হাম নয়। তাই এত আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। অবশ্যই সবাই হামে আক্রান্ত নয়, তবে সতর্কতার জন্য সবাইকে টেস্ট করার প্রয়োজনও নাই, উপসর্গ দেখেই ট্রিটমেন্ট করতে হবে। কারণ সবাইকে ডায়াগনোসিসের আওতায় নেওয়ার সক্ষমতা কিংবা পর্যাপ্ত সময়ও নেই। কিন্তু যে শিশুরা মারা যাচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে দেখতে হবে শিশুটার অন্য কোনো রোগ ছিল কিনা। কারণ হামের উপসর্গ নিয়ে ৫০ শতাংশ মৃত্যুর ক্ষেত্রে এডেনোভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।
আলোচনাকালে হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে সংশ্লিষ্টদের অবহেলার বিষয়েও কথা বলেন বিএমইউ উপাচার্য। তিনি বলেন, একজন আলোচক বলেছেন যে বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে না, তাহলে টিকার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ কোথায় যাচ্ছে? আবার টিকার কাভারেজ বেশি দেখানো হচ্ছে মানে কাজ হয়নি কিন্তু তারা টাকা নিয়ে চলে গেছে। এজন্য যে-ই ক্ষমতায় থাক, এই প্রশ্ন আমাদের উত্থাপন করতে হবে। তিনি বলেন, হাম আমাদের একটা হুঁশিয়ারি সংকেত দিয়েছে যে আমরা পরবর্তী মহামারী বা অতিমারীর জন্য কতটুকু প্রস্তুত।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের ইমিউনাইজেশন অ্যান্ড ভ্যাক্সিন ডেভেলপমেন্ট কো-অর্ডিনেটর ডা. বিনোদ কুমার বুরা বলেন, হামের নতুন সংক্রমণ শুধু বাংলাদেশের বিষয় নয়। এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক দেশ তাদের ‘মিজেলস ফ্রি’ স্ট্যাটাস হারিয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার হাম প্রতিরোধে দ্রুততার সাথে যে বিশেষ কর্মসূচি নিয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, বাজেট এবং অনুদান যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা এটা দেখার বিষয়। নতুন হামের ক্ষেত্রে এর জিনোটাইপ ( জীবের বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী জিনগত গঠন বা ডিএনএ) জানানো হচ্ছে না। আমরা এটি জানতে পারছি না। এতে কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা রয়েছে।
বিএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, আমাদের ভুলটা কোথায় হয়েছে সেটা আইডেন্টিফাই করতে হবে। আমাদের ভ্যাক্সিন কাভারেজের মধ্যে বড় ধরনের ঘাপলা আছে। কোনো কোনো জেলায় ১৫০% কাভারেজের কথা বলা হচ্ছে। এটা কিভাবে হয়? তার মানে এটা কখনই সঠিক ছিল না।
তিনি বলেন, হাম আসলে আমাদের ইন্ডিকেট করছে আমাদের ভ্যাক্সিন পদ্ধতির কোথাও গ্যাপ আছে। আমরা যদি এখনই সচেতন না হয়, ভবিষ্যতে বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। কিন্তু ৩০ সাল পর্যন্ত আমাদেরকে গ্যাভি (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাক্সিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন) ভ্যাক্সিন দেবে, কিন্তু ২৬ সালে এসেও কোথাও আলোচনা হয়নি যে এরপর আমরা ভ্যাক্সিন কোথায় পাব? আমরা কি উৎপাদন করব? আমাদের প্রস্তুতি কই?
অধ্যাপক সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, টিকার কাভারেজ বাড়াতে হবে, জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ল্যাবরেটরিগুলো শক্তিশালী করতে হবে। এন্টি-ভ্যাক্স ক্যাম্পেইনের বিষয়টা নোটিস করে প্রয়োজনে কেউ যদি ভ্যাক্সিন না দিয়ে থাকে, তাকে আইনের আওতায় আওতায় আনতে হবে।
অনুষ্ঠানে হামে আক্রান্ত শিশুর জটিলতা নিয়ে আলোচনা করেন অতিথিরা। তারা আক্রান্ত শিশুকে আইসোলেশনের কথা বলেন। তবে এক্ষেত্রেও জটিলতা রয়েছে জানিয়ে বলেন, শিশু হামে আক্রান্ত হলে জ্বর হওয়ার ৪ দিন পর শরীরে র্যাশ ওঠে। এর আগ পর্যন্ত শিশুর হাম বোঝা যায় না। কিন্তু আক্রান্ত শিশু জ্বর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই অন্যের শরীরে রোগ ছড়াতে শুরু করে। একজন শিশু ১৮ জন পর্যন্ত এই রোগ ছড়ায়। ফলে একটা সংকট থেকেই যায়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফুন্নেসা বলেন, হাম একটি বিধ্বংসী রোগ, যা শিশুর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙেচুরে দেয়। ভিটামিন এ-র ঘাটতি এ রোগের অন্যতম একটি কারণ। এতে আক্রান্ত শিশুর নানা সহ-রোগ দেখা দেয়। এটি তীব্র সংক্রামক, হাসপাতালে আলাদা কর্নার না করায় একটা শিশু আরও অনেকের মাঝে রোগ ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে কোন কন্ডিশনে শিশু হাসপাতালে আসবে, সেটি ঠিক করে দিলে মনে হয় ভাল হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে আক্রান্ত শিশুকে অক্সিজেন থেরাপি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ডা. জুবায়ের চিশতি ‘ইম্প্রোভাইজড বাবল সি-প্যাপ’ ব্যাবহারের গুরুত্ব বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বাবল সি-প্যাপ শুধুমাত্র মৃত্যুর হার কমায় তা না, খরচ কমিয়ে আনে। এ জন্য ইম্প্রোভাইজড বাবল সি-প্যাপটা আমরা ব্যবহার করতে পারি। আফ্রিকায় আমরা ট্রায়াল করেছিলাম। সেখানকার বিভিন্ন দেশে সি-প্যাপ ব্যবহার হচ্ছে। আমরা মিজেলস রিলেটেড ডিফিকাল্টিজ এটার মাধ্যমে কমিয়ে আনতে পারি। ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে ইম্প্রোভাইজড সি-প্যাপ অনেক কার্যকরী, যার দাম মাত্র ৩০০ টাকা।
বৈঠকে আলোচনায় আরও অংশ নেন বিএমইউর শিশু অনুষদের ডিন অধ্যঅপক ডা. মো. আতিয়ার রহমান, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল ও ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের শিশু ও নবজাতক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আবিদ হোসেন মোল্লা, বিএমইউর পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. এরফানুল হক সিদ্দিকী, ডা. তাসনীম জারা, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের একাডেমিক ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. মনির হোসেন প্রমুখ।