মেসির গোল উদযাপন © টিডিসি ফটো
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে শুভ সূচনা করল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আজ বুধবার (১৮ জুন) বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে শুরু হয় গ্রুপ ‘জে’-এর এই রোমাঞ্চকর ম্যাচ। আলজেরিয়ার মুখোমুখি হয়ে মাঠে নেমেই ফুটবল দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। আলজেরিয়ার শক্তিশালী রক্ষণভাগ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে তিনি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের এক অবিস্মরণীয় কীর্তি তুলে নেন। শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা আটকে রাখতে পারেননি জাদুকরকে, ক্যারিয়ারের দারুণ এক হ্যাটট্রিক উপহার দেন তিনি।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা এবং আলজেরিয়ার মধ্যে এক চরম উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই দেখা যায়। খেলার মাত্র পাঁচ মিনিটেই আলজেরিয়ার জালে বল পাঠান মেসি। গ্যালারিতে শুরু হয় উল্লাস, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সহকারী রেফারির পতাকা উঠলে সেই উদ্যাপন থেমে যায়। এরপর আলজেরিয়ারও একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল করেন রেফারি। তবে ১৭ মিনিটে আবারও দৃশ্যপটে আসেন মেসি। মিডফিল্ড থেকে রদ্রিগো দি পল বল বাড়িয়ে দিলে তিনি পরিচিত ভঙ্গিতে এগিয়ে যান এবং প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে এক জোরালো শট নেন। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান দুই হাত লাগাতে পারলেও সেই দুর্দান্ত শট ঠেকাতে পারেননি। বল জালে জড়িয়ে গেলে এগিয়ে যায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের ২০০তম ম্যাচে খেলতে নামা মেসির এটি ছিল জাতীয় দলের হয়ে ১১৮তম এবং বিশ্বকাপে ১৪তম গোল। বিশ্বকাপে মেসির করা ১৪তম গোলটি নিয়েই প্রথমার্ধে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে বিরতিতে যায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। এই অর্ধে বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে রাখে, যার প্রমাণ মেলে তাদের ৫৯% বল পজিশন এবং ৩২০টি পাসের নিখুঁত ছন্দে।
বিরতির পর ম্যাচের ৬০ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ধারাভাষ্যকারেরা চিৎকার করে ওঠেন, 'আবারও মেসি মোমেন্ট! ম্যাচের ৬০ মিনিটের মাথায় আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকে ২–০ গোলে এগিয়ে দিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।' অ্যালেক্সিস ম্যাক আলিস্টারের বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শট নিয়ন্ত্রণে নিতে ব্যর্থ হন আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান। ফিরতি শটে দারুণ এক গোল করে বল জালে জড়ান মেসি। এটি বিশ্বকাপে মেসির ১৫তম গোল। এই গোলে মেসি ছুঁয়ে ফেলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওকে। মেসির সামনে তখন শুধুই ১৬ গোল করা মিরোস্লাভ ক্লোসা।
এর আগে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই প্রথম পরিবর্তন এনে গঞ্জালো মন্তিয়েলের জায়গায় নাহুয়েল মলিনাকে মাঠে নামান স্কালোনি। এরপর ৫৫ মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের একটি দুর্দান্ত শট ঠেকিয়ে দেন আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান। ঠিক একই সময়ে আর্জেন্টিনা দলে আরও দুটি পরিবর্তন আনেন কোচ। তিনি লাওতারো মার্তিনেজের বদলে মাঠে নামান হুলিয়ান আলভারেজকে এবং থিয়াগো আলমাদার বদলে মাঠে নামেন নিকোলাস গঞ্জালেস। নিকো গঞ্জালেজ এবং হুলিয়ান আলভারেজকে মাঠে নামানোর এই সিদ্ধান্ত পরিষ্কার বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে ম্যাচ থেকে আর্জেন্টিনা আসলে কী চাচ্ছে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের মাত্র দুটি অন-টার্গেট শটের মধ্যে আটকে রেখে আলজেরিয়া অবশ্য প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধের শুরু পর্যন্ত বেশ ভালোই পারফর্ম করেছিল, কিন্তু আর্জেন্টিনার এই নতুন আক্রমণের সামনে তারা আর চাপ সামলাতে পারেনি।
ম্যাচের ৬৬ মিনিটে আবারও আক্রমণ চালান মেসি, তবে এবার মেসিকে হ্যাটট্রিক বঞ্চিত করেন লুকা জিদান। মেসির দ্বিতীয় গোলটিতে ভুল করলেও একটু পর সেটি পুষিয়ে দেন আলজেরিয়ান গোলরক্ষক। ৬৬ মিনিটে মেসির গোলের লক্ষ্যে নেওয়া শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন জিনেদিন জিদান–পুত্র।
কিন্তু ম্যাচের ৭৬ মিনিটে আলজেরিয়ার সব প্রতিরোধ ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়। নিকো গঞ্জালেজের পাস থেকে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের দারুণ শটে বল আলজেরিয়ার জালের নিচের বাঁ দিকের কোণায় জড়িয়ে দেন লিওনেল মেসি। এর সঙ্গেই পূর্ণ হয় আর্জেন্টিনার ৩-০ ব্যবধানের মহাকাব্যিক লিড এবং মেসির সেই আরাধ্য কীর্তি। ম্যাচের এই জাদুকরী মুহূর্তের পর ফুটবল বিশ্ব উল্লাসে ফেটে পড়ে এবং সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয়, 'বিশ্বকাপে মেসির প্রথম হ্যাটট্রিক! নিজের ঐতিহাসিক ষষ্ঠ বিশ্বকাপকে ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক দিয়ে স্মরণীয় করে রাখলেন লিওনেল মেসি!' আর এই অবিস্মরণীয় হ্যাটট্রিকের মধ্য দিয়েই বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৬-তে নিয়ে গিয়ে কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বোচ্চ গোলের বিশ্বরেকর্ড ছুঁয়ে ফেলেন লিওনেল মেসি।
ম্যাচের শেষার্ধে আলজেরিয়া ৫৩% বল পজিশন ধরে রেখে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ ও কৌশলের সামনে কোনো স্পষ্ট সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। পুরো ম্যাচে আলজেরিয়া ৬টি শট নিলেও তার একটিও আর্জেন্টিনার গোলপোস্টে অন-টার্গেট ছিল না। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা তাদের নেওয়া ৯টি শটের মধ্যে ৬টিই টার্গেটে রেখে প্রতিপক্ষকে তটস্থ করে রাখে। শেষ পর্যন্ত পাসের সংখ্যায় আলজেরিয়া কিছুটা এগিয়ে (৫৭৩টি পাস) থাকলেও ৯০% পাসের নির্ভুলতা ধরে রেখে ৩-০ ব্যবধানের বড় জয় নিশ্চিত করেই মাঠ ছাড়ে আলবিসেলেস্তেরা।