আন্দালিব রহমান পার্থ © সংগৃহীত ও সম্পাদিত
বাবার হাত ধরে রাজনীতিতে আসা, অল্প বয়সেই সংসদে প্রবেশ, বিরোধী দলের রাজনীতিতে সরব ভূমিকা, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা ও পরে জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত আন্দালিব রহমান পার্থর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নানা বাঁক পেরিয়ে এখন নতুন পর্যায়ে। প্রথমবারের মতো যুক্ত হলেন মন্ত্রিসভায়। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান এই তরুণ নেতা ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে ভোলা-১ আসন থেকে জয়ী হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদে ফিরেছেন।
রাজনীতির সঙ্গে পার্থর সম্পৃক্ততা মূলত পারিবারিক সূত্রেই। তার বাবা নাজিউর রহমান মঞ্জুর ছিলেন জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব এবং পরে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) প্রতিষ্ঠা করে দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সঙ্গে তার বাবার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার ধারাবাহিকতাই পরবর্তী সময়ে পার্থর রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলে।
২০০৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর বিজেপির নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন পার্থ। একই বছর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোলা-১ আসনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন। অল্প বয়সে সংসদে প্রবেশের পর তাঁর বক্তৃতা, রাজনৈতিক বিতর্কে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সরকারের সমালোচনায় সরব অবস্থান তাঁকে দ্রুত আলোচনায় নিয়ে আসে। সংসদে তিনি বিরোধী দলের একজন দৃশ্যমান বক্তা হিসেবে পরিচিতি পান।
২০০৯ থেকে ২০১৪ মেয়াদে সংসদে থাকার সময় তিনি সংস্থাপন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বর্জন করলে পার্থর দলও সেই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এরপরও বিএনপির সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত থাকে এবং বিজেপি ২০ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল।
তবে জোটের রাজনীতিতে পার্থ সবসময় বিএনপির সঙ্গে অভিন্ন অবস্থানে ছিলেন না। ২০১৯ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে তাঁর দল বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও জোটের সঙ্গে নির্বাচন করলেও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত মতপার্থক্য সামনে আসে। জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত পার্থকে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির সুযোগ দেয়।
এরপর কয়েক বছর জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপির সাংগঠনিক অবস্থান তুলনামূলক সীমিত থাকলেও পার্থ নিজেকে রাজনৈতিক আলোচনার বাইরে রাখেননি। বিভিন্ন সময়ে টেলিভিশন আলোচনা ও রাজনৈতিক বক্তব্যে তাঁর উপস্থিতি তাঁকে তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তোলে। বিশেষ করে সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর সরাসরি ও যুক্তিনির্ভর বক্তব্যের কারণে তিনি অন্য অনেক শরিক দলের নেতার তুলনায় আলাদা পরিচিতি তৈরি করেন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিএনপির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও নতুন মাত্রা পায়। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিজেপি আবার বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। ভোলা-১ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে পার্থ ১ লাখ ৫ হাজার ৫৪৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মো. নজরুল ইসলাম পান ৭৫ হাজার ৩৩৭ ভোট।
সংসদে ফিরে পার্থও দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠেন। জুনে তাকে বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়। মার্চে সংসদে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে তার বক্তব্যও আলোচনায় আসে।
এবার তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে যুক্ত হচ্ছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২১ আগস্ট ২০২৬’র সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় পার্থকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং তাকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনার কথা সরকারি সূত্রের বরাতে প্রকাশিত হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় বণ্টনের আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি ‘দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন’হিসেবেই লেখা নিরাপদ।
ফলে পার্থর রাজনৈতিক যাত্রায় এটি হতে যাচ্ছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বাঁক। পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে সংসদীয় রাজনীতি, জোটের ভেতরে ও বাইরে অবস্থান এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন জোটের অংশীদার হিসেবে মন্ত্রিসভায় প্রবেশ দুই দশকের কাছাকাছি সময়ে তার রাজনৈতিক পরিচয় যেমন বদলেছে, তেমনি বেড়েছে তাঁর দায়িত্বের পরিধিও। এখন মূল পরীক্ষা হবে দলীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা ও সংসদীয় বাগ্মিতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব দায়িত্বে কতটা সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারেন পার্থ।