দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলের জীবনবৃত্তান্ত

২১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৩ PM
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর © সংগৃহীত

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতিতে হাতেখড়ি, মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকের ভূমিকা পালন এবং এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন প্রবীণ এই রাজনীতিক।
জাতীয় সংসদের প্রত্যক্ষ ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রবীণ এই রাজনীতিককে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছেন সংসদ সদস্যরা।

দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত হওয়ার আগে ৭৮ বছর বয়সি এই রাজনীতিক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিবের দায়িত্বেও ছিলেন। মধ্য-ডানপন্থি রাজনৈতিক দল বিএনপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেওয়ার আগে সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য হিসেবে অর্থনীতির শিক্ষকতা করেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি দায়িত্বও পালন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে যোগ দেন শিক্ষকতা পেশায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। একই সময়ে সরকারি চাকরির অংশ হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বামপন্থী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের সময় মির্জা ফখরুল সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।

উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। এর আগে ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ নেতা।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় অল্প সময়ের জন্য মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সঙ্গে যুক্ত হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে পা রাখেন তিনি।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানই শেষ পর্যন্ত জাতিকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়। সে সময় বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল। পরে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বামপন্থী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের সময় মির্জা ফখরুল সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে যোগ দেন শিক্ষকতা পেশায় এই অভিজ্ঞ রাজনীতিক। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। একই সময়ে সরকারি চাকরির অংশ হিসেবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারি এটির একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম। এছাড়া ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন। 

মূলধারার রাজনীতিতে যোগ দিতে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। এর দুই বছর পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিজের জন্মস্থান উত্তরাঞ্চলের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। বর্তমানে এই পদটি মেয়র হিসেবে পরিচিত। এর কিছুদিন পর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দেন আলমগীর। 

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন আলমগীর। তার বাবা ছিলেন তৎকালীন মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সাবেক সদস্য মির্জা রুহুল আমিন। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে স্বৈরাচারী শাসক ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।

২০১১ সালে তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুল ইসলামকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। পরে ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তাকে মহাসচিবের স্থায়ী দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর তিনিই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দলটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর সংবিধান অনুযায়ী দলটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়েছে তাঁকে।

তবে মির্জা ফখরুলের মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের সময়টিই ছিল বিএনপির ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনে ব্যাপক দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখে পড়েন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকেও কারাবন্দি হতে হয়। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার ছেলে ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথা ১/১১ সরকার নির্বাসনে যেতে বাধ্য করেছিল।

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলার কালীবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন আলমগীর। তার বাবা ছিলেন তৎকালীন মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সাবেক সদস্য মির্জা রুহুল আমিন। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে স্বৈরাচারী শাসক ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন তিনি বিএনপিতে যোগ দেন।

এমন পরিস্থিতিতে লন্ডন থেকে তৎকালীন বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় দলের সামনের সারির প্রধান নেতা হিসেবে দল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মির্জা ফখরুল। তবে এ সময় তাকে তিনবার কারাবরণ করতে হয়। 

মহাসচিব হওয়ার আগে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোর বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। প্রথমে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং পরে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। দীর্ঘদিন দলের অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের সহ-সভাপতি ও পরে সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
২০০১ সালের নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ওই নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বগুড়ার একটি আসন থেকে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
তবে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে মির্জা ফখরুল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। যদিও দলের অন্য পাঁচ সংসদ সদস্যকে সংসদে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তারা ২০২২ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছর দলীয় নির্দেশে তারাও পদত্যাগ করেন।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার গঠন করে। এরপরই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেন আলমগীর।

দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত হওয়ার কারণে সংবিধান অনুযায়ী বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়েছে তাঁকে। এ সময় আবেগঘন এক অনুষ্ঠানে তার এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও উপস্থিত ছিলেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরে বেসরকারি বীমা কোম্পানিতে কাজ করেছেন। এই দম্পতির দুই মেয়ে। তারা দুজনই শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত।

বড় মেয়ে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পোস্টডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করছেন। ছোট মেয়ে ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আলমগীর একজন মধ্যপন্থি ও বিনয়ী রাজনীতিক হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, এমনকি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও ব্যক্তিগতভাবে তার প্রশংসা করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিএনপি নেতাসহ অন্যান্য রাজনীতিকরা দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলামকে স্বাগত জানিয়েছেন। দলের কঠিন সময়ে তার দীর্ঘদিনের ভূমিকা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক মনোভাব ও উদার মানসিকতার কথা স্মরণ করেছেন তারা।

রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আবারও মন্ত্রিসভায় ড. মঈন খান
  • ২১ আগস্ট ২০২৬
পারিবারিক রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ পার্…
  • ২১ আগস্ট ২০২৬
প্রিন্স হ্যারির বিরুদ্ধে মামলায় জিতল ‘ডেইলি মেইল’, ৭ দিনের …
  • ২১ আগস্ট ২০২৬
১৪ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কলেরার টিকাদান শুরু শনিবার, পাবেন যারা
  • ২১ আগস্ট ২০২৬
শপথ নিলেন ৬ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী
  • ২১ আগস্ট ২০২৬
রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
  • ২১ আগস্ট ২০২৬