ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই নতুন নতুন রূপকথা আর অপ্রত্যাশিত সাফল্যের গল্প। একইসঙ্গে অনেক দীর্ঘ আক্ষেপ ঘোচানোর এক মহামঞ্চ। ২০২৬ বিশ্বকাপও এর ব্যতিক্রম নয়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠেয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত এই মহাযজ্ঞ আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাচ্ছে। বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্টে এবার প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ অংশ নিতে যাচ্ছে।
এই আসরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো ৯টি দেশ এবার তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামবে। এর মধ্যে ৫টি দেশ এর আগেও মূলমঞ্চে খেলেছে, কিন্তু এখনও অধরা জয়ের অপেক্ষায়। অন্যদিকে, বাকি ৪টি দেশ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে পা রাখছে। দেখে নেওয়া যাক, কোন ৯টি দেশ এবার প্রথম জয় তুলে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বমঞ্চে মাঠে নামবে।
পুরোনো ৫ সারথির অধরা জয় খোঁজার মিশন
১. কানাডা
এবার স্বাগতিক হিসেবেই বিশ্বকাপ খেলতে নামছে কানাডা। এর আগে, ১৯৮৬ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল তারা। তবে দুই আসরে মোট ৬টি ম্যাচের পরও বহুল কাঙ্ক্ষিত জয়ের দেখা পায়নি কানাডা।
কাতার বিশ্বকাপে আলফোনসো ডেভিসের করা গোলই বিশ্বমঞ্চে কানাডিয়ানদের ইতিহাসে প্রথম গোল ছিল। এবার জেসি মার্শের অধীনে ঘরের মাঠে খেলতে নামবে তারা। গ্রুপ ‘বি’-তে তাদের প্রতিপক্ষ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, কাতার এবং সুইজারল্যান্ড। সবমিলিয়ে এবার নিজেদের মাঠ ও দর্শকদের সমর্থনকে পুঁজি করে প্রথম জয় পাওয়ার লক্ষ্যেই মাঠে নামবে কানাডিয়ানরা।
২. হাইতি
দীর্ঘ ৫২ বছর পর ফের বিশ্বমঞ্চে ফিরছে হাইতি। এর আগে, ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল তারা। কিন্তু সেবার গ্রুপপর্বেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল দলটি। শক্তিশালী ইতালি, পোল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বড় ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল ক্যারিবিয়ান দেশটির।
দীর্ঘ বিরতির পর এবার আরেকবার বিশ্বকাপে তারা। কোচ সেবাস্টিয়ান মিগনের অধীনে কনকাকাফ বাছাইপর্ব পেরিয়ে মূল আসরে প্রবেশ করেছে দলটি। নতুন এই যাত্রায় হাইতির লক্ষ্য অতীত অভিজ্ঞতা ভুলে সংগঠিত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পারফরম্যান্স দেখানো। এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘সি’-তে হাইতির প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ব্রাজিল, আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল মরক্কো এবং ইউরোপের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দল স্কটল্যান্ড।
৩. ইরাক
প্রায় চার দশক পর বিশ্বমঞ্চে ফিরেছে ইরাক। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে গ্রুপপর্বে কঠিন অভিজ্ঞতার মুখে পড়েছিল তারা। সেবার প্যারাগুয়ে, বেলজিয়াম এবং স্বাগতিক মেক্সিকোর বিপক্ষে হেরে বিদায়ঘণ্টা বেজেছিল ‘লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া’ নামক দেশটির।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে বলিভিয়াকে হারিয়ে বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেয় ইরাক। এবার গ্রুপ ‘আই’-তে ইরাকের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জই অপেক্ষা করছে। তাদের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ফ্রান্স, ইউরোপের উদীয়মান শক্তি নরওয়ে এবং আফ্রিকার শক্তিশালী সেনেগাল।
৪. নিউজিল্যান্ড
আগেও দু’বার বিশ্বকাপে খেলেছে নিউজিল্যান্ড। ১৯৮২ সালে প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে এসে তিনটি ম্যাচেই পরাজয় দেখেছিল তারা। দীর্ঘ বিরতির পর সবশেষ ২০১০ বিশ্বকাপে দারুণ লড়াইও করেছিল দলটি। ইতালি, প্যারাগুয়ে ও স্লোভাকিয়ার সঙ্গে ড্র করে একমাত্র অপরাজিত দল হিসেবে বিদায় নেয় নিউজিল্যান্ড। এবার গ্রুপ ‘জি’-তে তাদের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী বেলজিয়াম, মিশর এবং ইরান। কোচ ড্যারেন বেজলির অধীনে এবার উত্তর আমেরিকায় বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ করতে চায় দলটি।
৫. কাতার
২০২২ বিশ্বকাপে স্বাগতিক হিসেবে অংশ নিয়েছিল কাতার। তবে ঘরের মাঠের সুবিধা কাজে লাগাতে পারেনি তারা। উল্টো আসরের সবক’টি ম্যাচেই হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।
এবারের আসরে বাছাইপর্ব পেরিয়ে প্রথমবারের মতো নিজেদের যোগ্যতায় বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় কাতার। ফুটবল ইতিহাসে তাদের বড় একটি অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে এটি। যদিও গ্রুপ ‘বি’-তে এবারও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নরা। তাদের প্রতিপক্ষ ইউরোপের শক্তিশালী সুইজারল্যান্ড, বসনিয়া এবং সহ-আয়োজক কানাডা।
প্রথম জয়ের লক্ষ্য ৪ নবাগত দেশের
১. কেপ ভার্দে
আফ্রিকা অঞ্চলের বাছাইপর্বে বড় চমক দেখিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছে কেপ ভার্দে। আফ্রিকান ফুটবলে অন্যতম বড় অঘটন ঘটিয়ে ক্যামেরুনকে পেছনে ফেলে মূল টুর্নামেন্টে জায়গা করে নেয় তারা। এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ ‘এইচ’-তে তাদের জন্য সৌদি আরব, স্পেন এবং উরুগুয়ের মতো কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।
২. কুরাসাও
জনসংখ্যা ও আয়তনের দিক থেকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে এবার রূপকথার মতো যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে কুরাসাও। তবে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই তাদের সামনে কঠিন পরীক্ষার মঞ্চে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। গ্রুপ ‘ই’-তে তাদের বাকি দুই প্রতিপক্ষও সহজ নয়। আফ্রিকার আইভরি কোস্ট এবং দক্ষিণ আমেরিকার ইকুয়েডর তাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত।
৩. জর্ডান
২০১৪ সালে প্লে-অফে উরুগুয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপের মূলপর্বে জায়গা হারানোর হতাশা জর্ডানের জন্য বড় এক আঘাত ছিল। সেই স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট নিয়ে এবার ইতিহাসই বদলে দেয় জর্ডান। এশিয়ান অঞ্চলের তৃতীয় রাউন্ডে রানার্স-আপ হয়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় তারা। যদিও এবারের আসরে গ্রুপ ‘জে’-তে আলজেরিয়া, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং অস্ট্রিয়াকে মোকাবিলা করতে হবে তাদের।
৪. উজবেকিস্তান
মধ্য এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে ফুটবল বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে ইতিহাস গড়ে উজবেকিস্তান। এবারের আসরে গ্রুপ ‘কে’-তে কলম্বিয়া ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর পাশাপাশি পর্তুগালের বিপক্ষে লড়বে ‘হোয়াইট উলভস’ খ্যাত দলটি।