জরিপ
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজিত হয় © সংগৃহীত
দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও মানোন্নয়নে আসন্ন জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন দেশের সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপে অংশ নেওয়া ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থীই মনে করেন, বর্তমান শিক্ষা বাজেট দেশের প্রকৃত চাহিদা ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
আজ শুক্রবার (৫ জুন) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই জরিপের ফলাফল ও বিশদ সুপারিশমালা প্রকাশ করে নাগরিক সংগঠন ‘শিক্ষা অধিকার সংসদ’। সংগঠনের সদস্যসচিব এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক মো. শাহনেওয়াজ খান চন্দন সংবাদ সম্মেলনে জরিপের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
দেশের উচ্চশিক্ষা স্তরের শিক্ষার্থীদের ভাবনা ও প্রত্যাশা জানতে পরিচালিত এই জরিপে বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৫০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬১ দশমিক ১ শতাংশ স্নাতক এবং ৩৬ শতাংশ স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। জরিপটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষার সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মতে, গোড়ার ভিত্তি মজবুত না হলে উচ্চশিক্ষা বা অন্য কোনো স্তরে কাঙ্ক্ষিত গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের আধুনিকায়নেও জোর দিয়েছেন তারা। শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান বাড়াতে শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকদের জন্য সম্মানজনক ও আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো নিশ্চিতকরণের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন। শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, দৃশ্যমান অবকাঠামো বা প্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি হলেও দক্ষ ও দূরদর্শী শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার আসল রূপান্তর অসম্ভব। বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলে শিক্ষার বৈষম্য দূর করতে দক্ষ শিক্ষক পদায়নই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান বলে তারা মনে করেন।
ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়নের দাবি জানিয়েছেন। এই লক্ষ্যে তারা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, মৌলিক গবেষণা ও উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষা এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বা স্টেম শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির তাগিদ দেওয়া হয়েছে এই জরিপে।
জরিপে শিক্ষার্থীরা কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিই করেননি, বরং শিক্ষা বাজেট যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়গুলোও চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, বাজেটের সুফল না মেলার পেছনে দুর্নীতি, অর্থের অপচয়, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব, আমলাতান্ত্রিক বা প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক নেতিবাচক প্রভাব এবং তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রধান ভূমিকা রাখছে।
শিক্ষার্থীরা মনে করেন, বাজেটের অর্থ বাড়ানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থের স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং সুশাসনভিত্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। জরিপের সার্বিক নির্যাস থেকে এটি স্পষ্ট যে, দেশের তরুণ সমাজ এমন একটি শিক্ষা বাজেট প্রত্যাশা করে, যা কেবল গাণিতিক ব্যয় বৃদ্ধির বৃত্তে বন্দি থাকবে না, বরং গুণগত শিক্ষার প্রসার, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং সুশাসনভিত্তিক শিক্ষা সংস্কারের এক যুগোপযোগী দলিল হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।