শিক্ষামন্ত্রী মিলনের সাবেক এপিএস মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান © টিডিসি সম্পাদিত
৬ দিন আগে গত ১৪ মে প্রেষণে বিসিএস তথ্য ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ানকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) পরিচালক (প্রশাসন) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে গতকাল সোমবার (১৮ মে) দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসে ‘শিক্ষামন্ত্রীর সেই বিতর্কিত এপিএস এবার ডিপিইর পরিচালকের দায়িত্বে, সমালোচনা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। পরদিন আজ মঙ্গলবার (১৯ মে) তার নিয়োগ বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
বদলি-তদবির বাণিজ্য, আওয়ামী সংশ্লিষ্টতাসহ তথ্য ক্যাডারের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। ফলে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীর ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) নিয়োগের মাত্র ৩ মাসের মাথায় গত ১৪ মে তাকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে তাকে সরিয়ে দেওয়া হলেও পুরস্কৃত করেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী নিজেই। একইদিন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আরেক প্রজ্ঞাপনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) পরিচালক (প্রশাসন) পদে তাকে পদায়ন করা হয়।
প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এমন জায়গায় ফ্যাসিস্টের দোসরদের পুনর্বাসিত করার খবরে ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন খোদ জুলাই যোদ্ধারাও। তারা বলছিলেন, ‘‘এই ধরনের আওয়ামী লীগের দোসর অফিসারকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক-প্রশাসনের মত গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দেওয়া বিএনপির জন্য বিপদ ডেকে আনবে।’’ এ নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে চলেছিল সমালোচনা। অবশেষে তার নিয়োগ বাতিল হলো।
জানা গেছে, মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ানের মূল পদ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য অফিসার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে তার ডজনখানেক পত্রিকায় লেখা কলাম রয়েছে। এছাড়াও ফেসবুকে আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের নিয়ে নিয়মিত প্রশংসামূলক পোস্টও দিতেন তিনি।
শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের আমলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ছিলেন মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান। তখন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি। তার গ্রামের বাড়ি মায়ার জেলা চাঁদপুরে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর বাড়িও চাঁদপুর জেলায়।
জানা যায়, ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে বরিশাল জেলা তথ্য অফিসের পরিচালক পদ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এহসানুল হক মিলন যখন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন, তখন ওমর ফারুক তার জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছিলেন।
সেই দীর্ঘদিনের পরিচিত ও ‘পরীক্ষিত’ কর্মী হিসেবেই মিলন এবার পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তাকে নিজের এপিএস হিসেবে বেছে নেন। তবে নিয়োগের মাত্র ৩ মাসের মাথায় তাকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
জানা গেছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ওমর ফারুক দেওয়ানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি এবং তদবির বাণিজ্যে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে।
এছাড়া দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডগুলো থেকে নিয়মিত মাসোহারা বা চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি দেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা তার এসব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ওপর তদন্ত চালিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠায়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে শিক্ষামন্ত্রী তাকে গত ১৪ মে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেও ওমর ফারুক দেওয়ানকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) পরিচালক পদে পদায়ন করা হয়েছিল। তবে সেটি নিয়েও নতুন করে প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালকের পদটি মূলত তৃতীয় গ্রেডের (যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার)। অন্যদিকে ওমর ফারুক দেওয়ান বর্তমানে চতুর্থ গ্রেডের একজন কর্মকর্তা।
নিয়মানুযায়ী একজন চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তাকে তৃতীয় গ্রেডের পদে পদায়ন করা বিধিযোগ্য নয়। ফলে এই পদায়ন শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। আজ মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, প্রজ্ঞাপন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ১৪ মের প্রজ্ঞাপনে মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান, সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য কর্মকর্তা, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়কে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে প্রেষণে নিয়োগের আদেশটি এতদ্দ্বারা বাতিল করা হলো। জনস্বার্থে জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে এতে বলা হয়।