লুটপাটের মহোৎসব সিদ্ধেশ্বরী বিদ্যালয়ে, অর্ধ শতাধিক শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, লোপাট ১৪ কোটি টাকা

১৮ মে ২০২৬, ০৭:১৬ PM , আপডেট: ১৮ মে ২০২৬, ০৮:৩৫ PM
সিদ্ধেশরী বালিকা বিদ্যালয়ে অনিয়মের চিত্র

সিদ্ধেশরী বালিকা বিদ্যালয়ে অনিয়মের চিত্র © টিডিসি সম্পাদিত

রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বিগত সময়ে অবৈধ নিয়োগ, অর্থ আত্মসাৎ, হিসাব জালিয়াতির মাধ্যমে প্রায় ১৪ কোটি টাকা লুট করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিতে অর্ধ শতাধিক শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ও বর্তমান প্রতিষ্ঠান প্রধান শিক্ষকসহ একাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)।

গত এপ্রিল মাসে সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন করে ডিআইএ। পরিদর্শন শেষে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে সংস্থাটি। জমা দেওয়া প্রতিবেদন থেকে এসব অনিয়নের তথ্য জানা গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়া ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নিয়োগ বাণিজ্য, অবৈধ বেতন-ভাতা গ্রহণ, পিপিআর বহির্ভূত ক্রয়, ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি, হিসাব গোপন, ক্যাশবুক জালিয়াতি, অতিরিক্ত ফি আদায়, তহবিল আত্মসাৎসহ ৩৮ ধরনের অনিয়ম হয়েছে।

এসব অনিয়মের কারণে ১৩ কোটি ৯৬ লাখ ৪০ হাজার ৭৮৭ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এই টাকা আদায় করে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিদর্শনকালে যেসব খাতে সুনির্দিষ্ট হিসাব উপস্থাপন করা হয়নি, সেগুলো যুক্ত করলে আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ আরও বাড়বে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইএ পরিচালক অধ্যাপক এম. এম সহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘ সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের আর্থিক অনিয়মের প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

দ্বিগুণ উৎসব ভাতা গ্রহণ
সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. সাহাব উদ্দিন মোল্লা এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দ্বিগুণ হারে উৎসব ভাতা গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে মো. সাহাব উদ্দিন মোল্লা ২০১৪ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান থেকে বেসরকারিভাবে বেতন বাবদ অতিরিক্ত ৯৭ লাখ ১৯ হাজার টাকা নিয়েছেন। একইভাবে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেন একই সময়কালে অতিরিক্ত ৮০ লাখ ২৮ হাজার ৬১২ টাকা গ্রহণ করেছেন। এই টাকা ফেরৎযোগ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. দেলুয়ার হোসেনের নিয়োগ বিধি সম্মত না হওয়ায় বেতন ভাতা বাবদ নেওয়া ৩৮ লাখ ৯ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, চল বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বেতন-ভাতা বাবদ নেওয়া অর্থও ফেরৎ দিতে হবে।

অবৈধ নিয়োগে ৬৮ শিক্ষকের চাকরি
ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬৮ জন শিক্ষকের বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) নিবন্ধন সনদ নেই। এর ফলে তাদের নিয়োগ বিধি সম্মত হয়নি। ফলে চাকরিকালীন নেওয়া বেতন-ভাতা ফেরতের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটিতে ১৫২ জন শিক্ষক-কর্মচারী খণ্ডকালীন হিসেবে চাকরি করছেন। তারা প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন পাচ্ছেন। তবে এই শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি বেতন-ভাতা পাওয়ার যোগ্য নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৮ কোটি টাকার এফডিআর
প্রতিষ্ঠানটি সংরক্ষিত তহবিলের অর্থ বিধি বহির্ভূতভাবে বিভিন্ন বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮ কোটি টাকার এফডিআর করেছে। এর মধ্যে ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডে ৫ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার টাকা, পিপলস লিজিংয়ে ২ কোটি ১২ লাখ ১২ হাজার এবং জিএসপি ফাইন্যান্স-এ ৪ লাখ ৩৭ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। এসব অর্থ তুলে তফসিলি ব্যাংকে এফডিআর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতনেও অনিয়ম
২০২৩ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানটির তহবিল থেকে মোট ২ কোটি ৩২ লাখ ৬০ হাজার ৫০৬ টাকা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ ফেরতযোগ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে ডিআইএ।

ভুয়া তথ্য দিয়ে এমপিও
সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শামীম আক্তার (শামা) বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য দিয়ে এমপিওভুক্তির প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ। তদন্ত দল জানিয়েছে, শামীম আক্তারের নিয়োগের টেবুলেশন শিট এবং এমপিও সংক্রান্ত তথ্য ফরমে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় শ্রেণি উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে কাগজপত্র যাচাইকালে এই ডিগ্রিগুলো তৃতীয় শ্রেণি পেয়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি
সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট বাবদ ৮১ লাখ ৯৪ হাজার ২২৪ টাকা এবং আয়কর বাবদ ২৪ লাখ ৫৫ হাজার ৩৭ টাকা ফাঁকি দিয়েছে। এই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার কক্ষ পর্যবেক্ষকদের সম্মানী বণ্টনের সময় উৎসে আয়কর বাবদ আরও ৩ লাখ ১৪ হাজার ৯৭১ টাকা জমা দেয়নি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।

হিসাবপত্রে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা
ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির ক্যাশবুক নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়নি। কোথাও আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব নেই, কোথাও কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর নেই, আবার কোথাও মাসিক সমন্বয় করা হয়নি। স্টক রেজিস্টার, নিয়োগ রেজিস্টার ও বাজেটও পাওয়া যায়নি।

এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে পরিদর্শনের দিন অর্থাৎ এপ্রিল পর্যন্ত ক্যাশবুকে আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব লিপিবদ্ধ করা হয়নি। আর্থিক অনিয়ম এবং অবৈধ নিয়োগ ঢাকতে এমন করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

পিপিআর ছাড়াই কোটি টাকার কেনাকাটা
সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে জেনারেটর, লিফট, ফ্যান, সিসি ক্যামেরা, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরাঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় বিধি (পিপিআর) অনুসরণ করা হয়নি। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বিদ্যালয়ের ৩০টি সিসি ক্যামেরা ক্রয়ে ব্যয় দেখানো হয়েছে আড়াই লাখ টাকা। পরবর্তীতে আরও ৩০টি ক্যামেরা ক্রয়ে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা। এই ক্যামেরাগুলোর মধ্যে ৮০টি ক্যামেরা মেরামতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রকৃতপক্ষে কতগুলো ক্যামেরা কেনা হয়েছে তার নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য দেখাতে পারেনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

ল্যাপটপ কিনে গায়েব
সিদ্ধেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য ৫টি ল্যাপটপ ক্রয় করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২টি ল্যাপটপ পাওয়া গেছে। বাকি ৩টি ল্যাপটপের কোনো হদিস মেলেনি। এছাড়া ২০১৮ সালে আরও দুটি ল্যাপটপ কেনায় ৯৯ হাজার টাকা ব্যয় করা হলেও পিপিআর অনুসরণ করা হয়নি।

ত্রাণ তহবিলে অনুদানের নামে টাকা আত্মসাৎ
প্রতিষ্ঠানটির তহবিল থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ৫ লাখ টাকা দেওয়ার সময় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ সংক্রান্ত প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

সভাপতির ছেলেকে অবৈধ বেতন
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতির ছেলে শেখ এমরানুল আলমকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে ২০২৩ সালের মার্চ থেকে একই বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রতি মাসে ৪২ হাজার টাকা করে মোট ৩ লাখ ৪৭ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ আদায় করার সুপারিশ করা হয়েছে।

অতিরিক্ত ফি আদায়
বাংলা মাধ্যম ও ইংলিশ ভার্সনের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নীতিমালা বহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত ফি আদায়ের প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএর তদন্ত দল। তবে কত টাকা আদায় করা হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি।

কোচিং, শিক্ষা সফর ও পিঠা উৎসবের হিসাব গায়েব
গত ১০ বছরের কোচিং ফি, শিক্ষা সফর, পিঠা উৎসব ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ব্যয়ের রেকর্ড সরবরাহ করা হয়নি। এছাড়া বিদ্যালয়ের ক্যান্টিন ইজারা, গাছ বিক্রি, ভবন রং করা, বেঞ্চ তৈরি, বাথরুম নির্মাণ, অভিভাবক শেড নির্মাণসহ বিভিন্ন খাতের বিল-ভাউচারেও অসংগতি পাওয়া গেছে।

অনুমোদনহীন শিফট ও ইংলিশ ভার্সন
প্রতিষ্ঠানে অনুমোদন ছাড়াই প্রভাতী ও দিবা শিফট এবং ইংলিশ ভার্সন চালু থাকার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। বিদ্যালয়টিতে প্রভাতী শিফটে ২৮টি শাখা, দিবা শিফটে ২৬টি এবং ইংলিশ ভার্সনে ৩০টি শাখা চালু রয়েছে। তবে এসব শাখার সরকারি কোনো অনুমোদন নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা অধিশাখা) মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনটি এখনো আমার কাছে আসেনি। প্রতিবেদন পেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঈদে পত্রিকা বন্ধ থাকবে ৫ দিন 
  • ১৮ মে ২০২৬
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের অধীন চাকরি, পদ ৬৯, আবেদন…
  • ১৮ মে ২০২৬
স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়নসহ ৫ দফা দাবি টাঙ্গাইল মেডিকেল …
  • ১৮ মে ২০২৬
সপ্তাহ ব্যবধানে একই উপজেলায় মাদকসহ ৩ ইউপি সদস্য গ্রেপ্তার 
  • ১৮ মে ২০২৬
বিনা মূল্যে স্নাতকোত্তর-পিএইচডিতে অধ্যয়নের সুযোগ পাকিস্তানে…
  • ১৮ মে ২০২৬
আসছে যুবদলের নতুন কমিটি, নেতৃত্বে অগ্রগণ্য যেসব নেতা
  • ১৮ মে ২০২৬
×
ADMISSION
GOING ON
SPRING 2026
APPLY ONLINE
UP TO 100% SCHOLARSHIP
UNIVERSITY OF ASIA PACIFIC 🌐 www.uap.ac.bd
Last Date of Application:
21 June, 2026
📞
01789050383
01714088321
01768544208
01731681081