যশোরে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির সুবিধাভোগী তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে © সংগৃহীত
যশোরে প্রধানমন্ত্রীর ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির সুবিধাভোগী তালিকায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বাছাই করা ১ হাজার ৯৮০ উপকারভোগীর মধ্যে এমন ৬২ জনকে পাওয়া গেছে, যারা সচ্ছল। পাশাপাশি সরকারি তহবিল থেকে তাদের অ্যাকাউন্টে পাঠানো অর্থ ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
এদিকে উপকারভোগী যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত সমাজসেবা অধিদপ্তরের দপ্তরপ্রধানসহ তিনজনকে বদলি করা হয়েছে। যদিও এই বদলি শাস্তিমূলক, নাকি ‘রুটিন ট্রান্সফার’ তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
গত ১৬ মে যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচি ভার্চ্যুয়ালি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই অনুষ্ঠানে যশোর সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত উপস্থিত থেকে তালিকাভুক্ত নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন। অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. দেলোয়ার হোসেন খান খোকন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান, জেলা বিএনপির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে ১৩ মে জেলা তথ্য অফিসের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত অবহিতকরণ সভায় জানানো হয়, দেশজুড়ে ফ্যামিলি কার্ড চালুর লক্ষ্যে দ্বিতীয় দফায় যে পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রম শুরু হচ্ছে, তার আওতায় যশোরের চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডটিকে রাখা হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাঠকর্মীরা কীভাবে এই কার্যক্রমের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের বাছাই করেছেন, তার বিশদ বর্ণনাও দেওয়া হয় জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে।
আরও পড়ুন: প্রথমবারের মতো ভিসি পেল লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, যেহেতু ‘ফ্যামিলি কার্ড’ হলো প্রধানমন্ত্রীর ‘ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প’। তাই এর উপকারভোগীদের নিয়ে যাতে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না হয়, তার জন্য যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান খুবই তৎপর ছিলেন। তিনি বারবার এই বিষয়ে তাগাদা দেন সমাজসেবা অধিদপ্তর জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক হারুন অর রশিদকে। উপপরিচালকও জেলা প্রশাসককে বিষয়টি নিয়ে আশ্বস্ত করেন। তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে জেলা প্রশাসক এই বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) শরণাপন্ন হন।
এনএসআইয়ের পক্ষ থেকে ১৪ মে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসককে জানানো হয়, তাদের কর্মীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করে সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের মধ্যে অন্তত এমন ৬২ জনকে পেয়েছেন, যাদের পরিবার সচ্ছল। জেলা প্রশাসক তখনই বিষয়টি সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালককে অবহিত করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই অনুযায়ী উপপরিচালক সমাজসেবা অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালককে ইমেইল করেন। কিন্তু একদিন পর শনিবার যখন প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন, তখন দেখা যায়, গোয়েন্দা তথ্যে সচ্ছল হিসেবে চিহ্নিত ওই ৬২ জনের নামও রয়েছে এবং যথারীতি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাদের অ্যাকাউন্টেও টাকা ঢুকে যায়।
এ বিষয়ে প্রশ্নে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘উদ্বোধন অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে আমি জানতে পারি, গোয়েন্দা রিপোর্টে সচ্ছল হিসেবে চিহ্নিত নারীদের নামও চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে। এতে আমি খুবই বিরক্ত হই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভার্চ্যুয়ালি অনুষ্ঠান উদ্বোধনের ঠিক আগে আমি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মহোদয়কে ফোন করে বিষয়টি জানাই। কিন্তু তখন হয়তো আর করার কিছু ছিল না।’
তিনি আরও বলেন, “গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালককে আমি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার নেওয়ার নির্দেশ দিই। কিন্তু তিনি তার মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের ঢাকাস্থ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ না করে ইমেইল পাঠান খুলনায়। পরদিন শুক্রবার হওয়ায় হয়তো খুলনার পরিচালক অফিসিয়াল ইমেইল ওপেন করেননি। ফলে আমাদের ‘জিরো এরোর’ রাখার চেষ্টা হোঁচট খায়।”
আরও পড়ুন: বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ‘ব্রেইন ড্রেইন’ গন্তব্য?
এদিকে, সচ্ছল ৬২ নারী ফ্যামিলি কার্ডের আওতাভুক্ত হওয়ার ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক হারুন অর রশীদ, সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম এবং ইতি দত্ত সেন নামের তিন কর্মকর্তাকে যশোর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে উল্লিখিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের তাৎক্ষণিক অবমুক্ত (স্ট্যান্ড রিলিজ) করা হয়েছে, নাকি স্বাভাবিক বদলি করা হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
বিদায়ী উপপরিচালক হারুন অর রশীদ ফোনে বলেন, ‘আমাকে স্ট্যান্ড রিলিজ নয়, স্বাভাবিক বদলি করা হয়েছে।’
একই তথ্য দেন যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন সরকার। তিনি বলেন, ‘উপপরিচালক হারুন ঈদের আগেই আমাকে জানিয়েছিলেন যে তাকে বদলি করা হয়েছে। ঈদের পর তিনি যশোরের কর্মস্থল ছাড়েন।’
সমাজসেবা অধিদপ্তর যশোর কার্যালয়ে এখন কোনো উপপরিচালক নেই। পাবনা থেকে কাজী কাদের মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি নামের একজন সহকারী পরিচালক গত ১ জুন যশোরে যোগ দিয়েছেন। যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি যশোরে যোগ দিয়েই ছুটি নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছি। কারণ আমার আব্বা মারা গেছেন। ফলে যশোরের কোনো কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে কি না, তা আমার জানার সুযোগ হয়নি।’
যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানও সমাজসেবার কর্মকর্তাদের স্ট্যান্ড রিলিজ নাকি স্বাভাবিক বদলি করা হয়েছে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন। তিনি বলেন, ‘অফিস অর্ডার না দেখে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’
এদিকে সচ্ছল হিসেবে চিহ্নিত যে ৬২ নারীকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে, তাদের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘প্রথমত সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তাদের অ্যাকাউন্টে জমা পড়া সরকারি টাকা ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
আরও পড়ুন: ৬ দফা দাবিতে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
প্রসঙ্গক্রমে জেলা প্রশাসক বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তরের ডিডি বা এডি সরাসরি উপকারভোগী বাছাই করেন না। এই কাজ করেন তাদের সমাজকর্মীরা। সেখানে গাফিলতি ছিল। ডিডি আন্তরিক থাকা সত্ত্বেও ত্রুটি থেকে গেছে, যা দুঃখজনক।
অন্য এক প্রশ্নে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘সম্ভাব্য সুবিধাভোগী বাছাই করার ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না। এই প্রসঙ্গে আমি নিজে একাধিকবার সদর আসনের সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি সব ধরনের রাজনৈতিক বাছবিচারের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন।’
জানতে চাইলে যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ‘সমাজসেবা অধিদপ্তরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে যশোর থেকে সরানো হয়েছে বলে শুনেছি। তবে তাদের স্ট্যান্ড রিলিজ নাকি স্বাভাবিক বদলি করা হয়েছে, তা আমার জানা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে ৬২ নারীকে সচ্ছল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, অবশ্যই তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। নতুন করে জরিপ চালিয়ে ওই ওয়ার্ডে আর কাউকে উপযুক্ত মনে হলে তাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। যদিও নতুন কাউকে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কারণ ক্রাইটোরিয়ায় পড়ার মতো ওই ওয়ার্ডে সম্ভবত আর কেউ নেই। এখানে কোনো ধরনের দলবাজির সুযোগ আগেও দেওয়া হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।’
প্রসঙ্গত, ফ্যামিলি কার্ডের সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রস্তুতে যশোরে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডটিতে মাঠপর্যায়ে কাজ করেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের ৫৪ জন সমাজকর্মী।