ফুটবল ও ক্রিকেট বিশ্বকাপ ট্রফি © টিডিসি সম্পাদিত
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবল ও ক্রিকেট দুটি অসম্ভব জনপ্রিয় নাম। সারা বিশ্বে যখন ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে ক্রিকেটের বাইশ গজ কাঁপানো পরাশক্তি দেশগুলো ফুটবলের মহাবিশ্বমঞ্চে কতটা সফল? মাঠের লড়াইয়ে ফুটবল ও ক্রিকেট সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার খেলা হলেও কিছু দেশের ক্রীড়া সংস্কৃতিতে এই দুটি খেলাই সমান গুরুত্ব পেয়ে আসছে।
আগামী ১১ জুন থেকে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার যৌথ আয়োজনে শুরু হতে যাচ্ছে ২০২৬ ফিফা পুরুষ বিশ্বকাপ। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আসরের। কাতার বিশ্বকাপের ৩২টি দলের জায়গায় এবার লড়বে ৪৮টি দল। ফুটবল বিশ্বকাপের এই বিশাল মঞ্চে ক্রিকেটের দাপুটে দেশগুলোর উপস্থিতি দুই খেলার এক অনন্য সংযোগকে সামনে নিয়ে এসেছে। এবারের আসরে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ মোট ৭টি ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ অংশ নিচ্ছে।
ফুটবল ও ক্রিকেট দুটি খেলাই ব্রিটিশদের হাত ধরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফুটবল দ্রুত ইউরোপ পেরিয়ে আফ্রিকা ও দুই আমেরিকায় তুমুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ক্রিকেট মূলত কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকে। দুই ভিন্ন খেলার বিশ্বমঞ্চে একসঙ্গে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া দেশের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও, যারা পেরেছে তারা ক্রীড়াজগতে এক বিরল অর্জনের অংশীদার।
ভারত
ক্রিকেটের বর্তমান মোড়ল ও অন্যতম সফল দেশ ভারত। তারা ক্রিকেটে পুরুষদের ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছে ২ বার এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে ৩ বার। তবে ক্রিকেটে এতটা সফল হলেও ভারত এখন পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেনি। সবশেষ র্যাংকিং অনুযায়ী ফুটবলে তাদের অবস্থান ১৩৬তম।
পাকিস্তান
অন্যদিকে ক্রিকেটে ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান ১ বার ওয়ানডে ও ১ বার টি-টোয়েন্টিসহ মোট দুইবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও ফুটবলে কখনো বাছাই পর্বের গণ্ডি পার হতে পারেনি। সবশেষ র্যাংকিং অনুযায়ী ফুটবলে তাদের অবস্থান ২০০তম।
ইংল্যান্ড
ফুটবল ও ক্রিকেট—দুই খেলারই জন্মভূমি এই দেশ। বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে ইংল্যান্ডের রয়েছে ফুটবল ও ক্রিকেট দুই ধরনের বিশ্বকাপই জয়ের অনন্য ও ঐতিহাসিক কীর্তি। ইংল্যান্ড ১৯৭৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সব ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। দীর্ঘ এই পথচলায় তারা ১৯৭৯, ১৯৮৭ ও ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়ার স্বাদ পায়। ফুটবলে ইংল্যান্ডের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ক্রিকেটের চেয়েও অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও দীর্ঘ। তারা ১৯৫০, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৭০, ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে মাঠ কাঁপিয়েছে। এর মধ্যে ১৯৬৬ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ইংল্যান্ড। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবে ওয়েলস ১৯৫৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে খেলে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল।
অস্ট্রেলিয়া
ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ‘মোড়ল’ ও সফলতম দল অস্ট্রেলিয়া। মাঠের ক্রিকেটে তাদের যে আধিপত্য, ফুটবলে হয়তো সেই স্তরের সাফল্য নেই, তবে বৈশ্বিক জনপ্রিয়তার এই খেলায় তারা নিয়মিত মুখ। অস্ট্রেলিয়া ১৯৭৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত টানা সব ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। ক্রিকেটের ইতিহাসে তারা সবচেয়ে সফল দল, যার প্রমাণ মেলে তাদের বিশ্বজয়ের পরিসংখ্যানে। এই সময়ে তারা মোট চারবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে—১৯৮৭, ১৯৯৯, ২০০৩ ও ২০০৭ সালে। ক্রিকেটের মতো অতটা দাপুটে না হলেও ফুটবল বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া খেলেছে ১৯৭৪, ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ আসরে। ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে তাদের সেরা সাফল্য ছিল ২০০৬ সালে দ্বিতীয় রাউন্ডে পৌঁছানো।
নিউজিল্যান্ড
ক্রীড়াবিশ্বে নিউজিল্যান্ডকে সবসময় অন্যতম সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী দল হিসেবে গণ্য করা হয়। ক্রিকেটে বড় ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা থাকলেও ফুটবলে তারা এখনো অনেকটাই পিছিয়ে। ব্ল্যাক ক্যাপসরা ১৯৭৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রতিটি ক্রিকেট বিশ্বকাপেই অংশ নিয়েছে। তারা ক্রিকেটে অন্যতম ধারাবাহিক দল হলেও ২০১৫ সালের আগে ফাইনালের স্বাদ পায়নি, তবে ১৯৭৫, ১৯৭৯, ১৯৯২, ১৯৯৯, ২০০৭ ও ২০১১ সালে মোটcox ছয়বার সেমিফাইনালে পৌঁছানোর কৃতিত্ব দেখায়। ফুটবলে নিউজিল্যান্ডের উপস্থিতি বেশ সীমিত। তারা এ পর্যন্ত কেবল ১৯৮২ ও ২০১০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল এবং দুইবারই তাদের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকা
ক্রিকেটে দক্ষিণ আফ্রিকা এক অন্যতম পরাশক্তি হলেও ফুটবল বিশ্বকাপে তাদের ইতিহাস খুব একটা দীর্ঘ নয়। দুই খেলাতেই বিশ্বমঞ্চে নকআউট পর্বের বৈতরণী পার হওয়া তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরার পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা ১৯৯২, ১৯৯৬, ১৯৯৯, ২০০৩, ২০০৭, ২০১১ ও ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নেয়। তবে প্রতিবারই নকআউট পর্বের ভাগ্য সঙ্গী হওয়ায় তারা ১৯৯২, ১৯৯৯ ও ২০০৭ সালে কেবল সেমিফাইনাল পর্যন্তই পৌঁছাতে পেরেছিল। ফুটবলে ‘বাফানা বাফানা’ নামে পরিচিত দেশটি ১৯৯৮, ২০০২ ও ২০১০ বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে এবং প্রতিবারই তাদের প্রথম রাউন্ডের বাধা টপকাতে ব্যর্থ হয়ে বিদায় নিতে হয়েছে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ
ক্রিকেটের শুরুর দিককার একচ্ছত্র মোড়ল বা পরাশক্তি ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর কারণে ফুটবলে তাদের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ক্যারিবীয়রা ১৯৭৫ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সব ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। ক্রিকেটের শুরুর দুই আসরে অর্থাৎ ১৯৭৫ ও ১৯৭৯ সালে তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে ক্রিকেট বিশ্বে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ মূলত অনেকগুলো ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের সমষ্টি হওয়ায় ফুটবলে তারা কোনো একক দেশ হিসেবে অংশ নেয় না। তবে এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জামাইকা ১৯৯৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে খেলেছিল এবং প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়। একইভাবে ত্রিনিদাদ ও টোবাগো ২০০৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল, কিন্তু তারাও প্রথম রাউন্ড পেরোতে পারেনি।
নেদারল্যান্ডস
ক্রিকেট ও ফুটবলের তুলনামূলক বিচারে নেদারল্যান্ডস একটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী দেশ। কারণ, ক্রিকেটে তারা যেখানে কেবল উদীয়মান দল, ফুটবলে তারা বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি। নেদারল্যান্ডস ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে ১৯৯৬, ২০০৩, ২০০৭ ও ২০১১ সালে, তবে প্রতিবারই তাদের প্রথম রাউন্ডের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে। ফুটবলে ডাচদের সাফল্য ও ঐতিহ্য আকাশচুম্বী। তারা ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৭৪, ১৯৭৮, ১৯৯০, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ বিশ্বকাপে খেলেছে। 'টোটাল ফুটবল' দিয়ে বিশ্বকে মাতানো এই দলটি ১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ২০১০ সালে ফুটবলে রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড
যুক্তরাজ্যের প্রতিবেশী এই দুই দেশ ক্রিকেটের চেয়ে ফুটবলেই বেশি ঐতিহ্যবাহী, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটেও তারা বেশ উন্নতি করেছে। আয়ারল্যান্ড ক্রিকেট বিশ্বকাপে ২০০৭, ২০১১ ও ২০১৫ সালে অংশ নেয় এবং ২০০৭ সালে নিজেদের প্রথম অংশগ্রহণেই ‘সুপার এইটস’ বা সেরা আটে জায়গা করে নিয়ে চমক দেখায়। অন্যদিকে, ফুটবলে রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড ১৯৯০, ১৯৯৪ ও ২০০২ বিশ্বকাপে খেলেছে, যার মধ্যে ১৯৯০ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠাই তাদের সেরা সাফল্য। এ ছাড়া নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ১৯৫৮, ১৯৮২ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে ১৯৫৮ ও ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল। স্কটল্যান্ড ১৯৯৯ ও 200৭ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নিলেও দুইবারই প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেয়। তবে ফুটবলে তাদের ইতিহাস বেশ পুরোনো। তারা ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৭৪, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০ ও ১৯৯৮ বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে। তবে দুর্ভাগ্যবশত কোনোবারই তারা প্রথম রাউন্ডের গণ্ডি পেরোতে পারেনি।
কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত
এই দুটি দেশ ক্রিকেট বা ফুটবল—কোনো খেলাতেই বিশ্বমঞ্চে খুব বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি, তবে দুই আসরেই খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। কানাডা ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নেয় ১৯৭৯, ২০০৩, ২০০৭ ও ২০১১ সালে, তবে কখনো প্রথম রাউন্ড পেরোতে পারেনি। ফুটবলেও তাদের চিত্রটা একই রকম; ১৯৮৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে তাদের একমাত্র অংশগ্রহণ ছিল এবং সেবারও তারা প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ১৯৯৬ ও ২০১৫ ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে দুইবারই প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নেয়। আর ফুটবল বিশ্বকাপে তাদের একমাত্র অংশগ্রহণ ছিল ১৯৮৬ সালে, যেখানে তারা প্রথম রাউন্ড অতিক্রম করতে পারেনি।
ক্রিকেটের মোড়ল দেশগুলোর ফুটবল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো দুই মাঠেই সফলভাবে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে। আবার নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ ফুটবলের পরাশক্তি হয়েও ক্রিকেটে নিজেদের মেলে ধরার চেষ্টা করছে। ফুটবল ও ক্রিকেটের বিশ্বমঞ্চে একসঙ্গে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া দেশের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও, এই দেশগুলো দুই ভিন্ন চরিত্রের খেলায় অংশ নিয়ে ক্রীড়াজগতের অন্যতম বিরল ও বৈচিত্র্যময় অর্জনের অংশ হয়ে আছে।