মানসম্মত শিক্ষা ও দুর্গম এলাকার শিক্ষার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৮ সালে সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট (সেকায়েপ) প্রজেক্ট গ্রহণ করে সরকার। প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন বিষয়ে নিয়োগ দেয়া হয় অভিজ্ঞ ৫ হাজার ২০০ অতিরিক্ত শিক্ষক (এসিটি)। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে নতুন মেয়াদে এসব শিক্ষকদের স্থায়ী করার আশ্বাস দেয়া হয়। নতুন মেয়াদে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও নিয়োগ স্থায়ীকরণের এই আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি।
অন্যদিকে নতুন মেয়াদে স্থায়ী নিয়োগের আশ্বাসে প্রায় এক বছর ধরে বিনা বেতনে পাঠদান করছেন এসব শিক্ষক। ঈদ উপলক্ষেও পাননি কোন বেতন-বোনাস। দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা ছাড়াই পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন চাকরি স্থায়ী করার কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় চরম হতাশা এবং অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এসিটি শিক্ষকরা।
জানা যায়, ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর সেকায়েপ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের নতুন মেয়াদে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসইডিপিতে সেকায়েপের এ সংক্রান্ত বিভিন্ন কম্পোনেন্টের (পাঠাভ্যাস ও উপবৃত্তি) কার্যক্রম চালু হলেও এসিটিদের চাকরি স্থায়ী করার কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরা।
এর আগে সেকায়েপ এবং সেসিপের আওতায় নিয়োগকৃত অতিরিক্ত শ্রেণি শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছিলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ১১ জুলাই মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের সেকায়েপ ও সেসিপ প্রকল্পের শিক্ষকদের এমপিওভুক্তিকরণের সম্ভাব্য শর্তাবলি ও আর্থিক সংশ্লেষসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. মহিউদ্দিন খান সাংবাদিকদের বলেন, এসিটিরা শিক্ষকদের স্থায়ী করার বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে আমরা তাদেরকে রাখার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে অনেক কিছু সময় লাগে। এসিটিদের হতাশ না হয়ে অপেক্ষা করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে গত ২৮ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে একটি চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রকল্প দুটিতে নিয়োগকৃত শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সম্ভাব্য শর্তাবলি ও আর্থিক সংশ্লেষসহ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এই বিষয়টি নিয়ে আর কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পর গত ৩০ আগস্ট জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। চিঠিতে জেলা ও উপজেলাভিত্তিক নিয়োগকৃত সেকায়েপের অতিরিক্ত শ্রেণিশিক্ষক এবং সেসিপ প্রকল্পের রিসোর্স টিচারদের তালিকার হার্ড কপি এবং সফট কপি তিন কার্যদিবসের মধ্যে অধিদপ্তরে পাঠানোর জন্য জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের বলা হয়েছিলো। কিন্তু ৫ হাজার শিক্ষকের এমপিওভুক্তিতেও আর কোন প্রশাসনিক পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এমপিও নীতিমালা সংশোধন করে এসিটি শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করার দাবি জানানোও হয়।
এ বিষয়ে এসিটি শিক্ষক আজীজুল ইসলাম জানান, এসিটি ম্যানুয়ালের ৩৬নং ধারা অনুযায়ী সরকারি বিশেষ আদেশের মাধ্যমে শিক্ষকদেরকে নতুন প্রকল্পে স্থানান্তরের কথা স্পষ্ট উল্লেখ ছিল। সেকায়েপ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে ও সেকায়েপের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. মো. মাহমুদ-উল হক প্রকল্পভুক্ত এসিটি শিক্ষকদের পরবর্তী সমন্বিত প্রকল্পতে রাখার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেন। শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে সরকারি আদেশ না আসা পর্যন্ত পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার মৌখিক পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন সময়ে আমাদের চাকরি স্থায়ী করার অশ্বাস দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এক বছরেও আমাদের বিষয়ে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
প্রসঙ্গত, বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ২০০৮ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পটি চালু করা হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় তিন হাজার চারশ ৮০ কোটি টাকা। এতে দেশের অতি দুর্গম ৬৪টি উপজেলার দুই হাজার ১১টি স্কুলে গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে ৫ হাজার ২০০ অতিরিক্ত শিক্ষক (এসিটি) নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। যাদের স্নাতকে প্রাপ্ত নম্বর ৫০ শতাংশের বেশি ছিল, কেবল তাদেরই আবেদনের সুযোগ দেওয়া হয়। যাচাই-বাছাই করে সর্বোচ্চ যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। শেষ হওয়া প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, শুরুতে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়াসহ শিক্ষকদের মাসিক বেতন ছিল ১৪ হাজার টাকা। জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী সর্বশেষ ২২ হাজার ২০০ থেকে ২৭ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত এই শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হয়।