চিরকুট লিখে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে

আত্মহত্যা
স্ট্যাটাস ও সুইসাইড নোট  © টিডিসি ফটো

পরিবারিক সমস্যা, ক্যারিয়ার কিংবা প্রেমঘটিতসহ নানান কারণে হতাশায় ভোগেন তরুণরা, যান দুমড়েমুচ। অনেকেই বেছে নেন আত্মহননের পথ। দেশে এমন ঘটনা প্রতিনিয়তই বেড়েই চলেছে। আবেগী তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখে (স্ট্যাটাস) আত্মহত্যা করছেন। আবার অনেকে চিরকুট (সুইসাইড নোট) লিখেও বেছে নেন আত্মহননের পথ।

সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার (১০ মে) একদিনেই ‘সুইসাইড নোট’ লিখে আত্মহত্যা করছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া দুই শিক্ষার্থী। শুধু তাই নয়, চলতি বছরের আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থীর অনেকেই ফেসবুকে কিংবা চিরকুটে লিখে আত্মহত্যা করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনাকালীন সময়ে গত দুই বছরে শিক্ষার্থীরা মানসিক স্বাস্থ্য সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে। অনলাইন ক্লাসে ঠিক মতো অংশগ্রহণ করতে না পারা, পারিবারিক সমস্যা, একাকীত্বসহ নানান কারণে তারা মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক সামাজিকতার চাপ, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক কারণসহ নানাবিধ কারণ উঠে এসেছিলো।

অভিভাবকেরা জানান, সন্তানরা এখন তুচ্ছ কারণে আত্নহত্যা করছে। শাসন,  বায়না পূরণ করতে না পারা, প্রেমে ব্যর্থতা, আর্থিক টানাপোড়েন, অপমান সহ্য করতে না পারাসহ নানাবিধ তুচ্ছ কারণে আত্নহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। এতে করে  অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। 

গতকাল দুপুরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ রফিক-জব্বার হলের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হলে অমিত কুমার বিশ্বাসকে তাৎক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানে তার মৃত্যু হয়।

পরে রাতে হলের তার রুমমেটরা এসে বালিশের নিচে একটি সুইসাইড নোট পান। সেখানে লিখা ছিল, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী না। আমার মস্তিষ্কই আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী। আমি নিজেই নিজের শত্রু হয়ে পড়েছি অজান্তেই। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আমি ক্লান্ত। আর না। এবার মুক্তি চাই। প্রিয় মা-বাবা, ছোট বোন সবাই পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।’  এছাড়াও তার পড়ার টেবিলে আরও কয়েকটি সুইসাইড বিষয়ক মন্তব্য লেখা পাওয়া যায়।

একইদিনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদিয়া তাবাসসুম নামের এক ছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার নিজ বাড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে নিশ্চিত করেছে তার পরিবার ও পুলিশ। এসময় তার লেখা একটি চিরকুটও পাওয়া গেছে। চিরকুটে সাদিয়া লেখেন, ‘চোরাবালির মতো ডিপ্রেশন, বেড়েই যাচ্ছে, মুক্তির পথ নেই, গ্রাস করে নিচ্ছে জীবন, মেনে নিতে পারছি না।’ 

গত ৩ জানুয়ারি দুপুরে চার পাতার চিরকুট লিখে সিলিংয়ের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেছেন অনিক চাকমা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সায়েন্স বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ছিলেন। 

একইদিন 'আমি জীবনে যত ভুল করছি সব আমার ভুল সরি’ ফেসবুকে এমন স্ট্যাটাস দেওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে গলায় ফাঁসি দিয়ে খাগড়াছড়ির গুইমারা উপজেলায় মো. নুরুল আফসার নামে এক কলেজ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। নিহত নুরুল আফসার চলতি বছর গুইমারা সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে।

গত ১১ জানুয়ারি ময়মনসিংহের গৌরীপুরে তুষার মিয়া নামে এক স্কুলছাত্রের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ সময় তার পকেট থেকে মাকে উদ্দেশ্য করে লেখা একটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়। নিহত তুষার পাছার উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণিতে পড়ালেখা করত।

৬ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে ক্ষমা লিখে স্ট্যাটাস দেওয়ার পরে ‘আত্মহত্যা’ করেছেন প্রিতম কুমার সিংহ নামে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় নিজ বাড়িতে তিনি বিষপান করে আত্মহত্যা করেছেন। প্রিতম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মৃৎশিল্প বিভাগের ২৫তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। 

১০ ফেব্রুয়ারি চিরকুট লিখে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে আত্মহত্যা করেছেন জুবায়ের ইবনে প্রজ্ঞা নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। নিহত জুবায়ের ইবনে নুর প্রজ্ঞা ঢাকার ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির এলএলবি মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন।

বরগুনার তালতলী শিকারপাড়া গ্রামে প্রেমিকের পরিবার মেনে নিবে না- এই সন্দেহে চিরকুট লিখে ১২ ফেব্রুয়ারি রুমা নামে এক কলেজছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। সে শিকারীপাড়া গ্রামের আলাউদ্দিন মোল্লার মেয়ে।

সর্ম্পকের বিচ্ছেদ থেকে হতাশাগ্রস্থ। তারপর ফেসবুকে দীর্ঘ একটি স্ট্যাটাস লিখে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আত্মহত্যা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইশতিয়াক মাহমুদ পাঠান নামের সাবেক এক শিক্ষার্থী। তিনি বাংলা বিভাগের ২০১০-১১ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন। ঘটনার দিন ভোর ৬টার পর কোন এক সময়ে নিজ বাসায় বিষপান করেন।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে ‘শান্তির ঘুম’ স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন ঐশী রায় রিয়া (১৯) নামে এক কলেজছাত্রী। জানা যায়, যশোর সদরের হামিদপুর আল হেরা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিলেন রিয়া। 

১০ মার্চ জামালপুরের মেলান্দহে ধর্ষণের পর আশা মনি নামে এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। চিরকুটে ওই শিক্ষার্থী তামিম আহমেদ স্বপন খান (২৫) নামের এক উত্ত্যক্তকারীর নাম উল্লেখ করেছে। কিশোরী তার একটি চিরকুটে লিখেছে, 'মা, আমারে ওয়াহাব চেয়ারম্যানের ভাতিজা আজকের দিনে এক রুমে কাটাইছে। পারলে ক্ষমা করো। যদি কোনো বিচার করো ছেলেটার নাম তামিম আহমেদ স্বপন খান। মা-বাবা তোমরা ভালো থেকো। আমারে ভুলে যেও। আমি বেছে থাকলে তোমাদের সম্মান শেষ হয়ে যেত। বাবা-মা আবার বলতেছি, ভালো থেকো। বাবা-মা ভালো থেকো। গুড বাই, সোনা বাবা-মা।' আরেকটি চিঠিতেও 'তামিম তার সঙ্গে খারাপ কাজ করেছে' বলে লিখে রেখে গেছে সে।

১৩ মার্চ ময়মনসিংহ শহরের স্বদেশী বাজার এলাকায় পরিবারের সঙ্গে রাগ করে একটি বহুতল ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করেছে অর্কপ্রিয়া ধর সৃজা নামে এক স্কুলছাত্রী। আত্মহত্যার আগে ফেসবুকে নিজের টাইমলাইনে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাসও দেয় অর্কপ্রিয়া। সেখানে তিনি নিজের স্বাধীনতার ওপর বাবা-মা-ভাইয়ের হস্তক্ষেপের কারণে তাদের প্রতি দীর্ঘদিনের ক্ষোভের কথা তুলে ধরেন। সেই রাগ-ক্ষোভ থেকেই এই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সেখানে প্রকাশ করে সৃজা।

গত ২৬ মার্চ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় সকালে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার পর রাতে সিদ্দিকুর রহমান রিজন (২৮) নামে এক কলেজ ছাত্রের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আনন্দমোহন কলেজের স্নাতকের শিক্ষার্থী ছিলেন নিহত রিজন।  

গত ৯ এপ্রিল ফেসবুকের নিজ আইডিতে স্ট্যাটাস দিয়ে সোহাগ খন্দকার নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তিনি ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের রাবির চারুকলা অনুষদের ১৫তম ব্যাচের প্রাচ্যকলা ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী ছিলেন।

গত ১১ এপ্রিল চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় রকসি পারভিন জুবলি নামের ১০ম শ্রেণির এক ছাত্রী চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করেছে। তিনি ওই এলাকার আইয়ুব ফাউন্ডেশন টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১০ শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

বছরের (বাংলা) প্রথম দিনটা স্মরণীয় হয়ে থাক— ফেসবুকে এমন স্ট্যাটাস দিয়ে ১৪ এপ্রিল খুলনার ডুমুরিয়ায় অর্পিতা মল্লিক জয়া নামে এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। মৃত অর্পিতা উপজেলার শোভনা গ্রামের অসীত মল্লিকের মেয়ে। অর্পিতা ডুমুরিয়া সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে পড়ত। মা কৃষ্ণা মল্লিক ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্স। অর্পিতার ফেসবুক ঘেটে দেখা যায়, তার সর্বশেষ স্ট্যাটাস ছিলো- বছরের প্রথম দিনটা স্মরণীয় হয়ে থাক।

চলতি বছরে আরও যত আত্নহত্যার ঘটনা

প্রেমিকের বাসায় বিষপানে অসুস্থ হয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় গত ৯ মে মারা গেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অংকন বিশ্বাস। জবির ইংরেজি বিভাগের ২০১৬-১৭ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।  

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বগুড়ার নন্দীগ্রামে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় ফেল করায় অভিমান করে কেয়া খাতুন নামের এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। সে স্থানীয় ভরতেতুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। 

গত ৪ জানুয়ারি মাগুরায় দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আত্মহননকারী করা এই  শিক্ষার্থী হলেন, সদর উপজেলার বরুণাতৈল গ্রামের সুমন আলী (১৭)। সুমন মাগুরা সরকারি কারিগরী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণীর ছাত্র।

গত ৫ জানুয়ারি প্রেমিকের আত্মহত্যার খবর পেয়ে সকাল ১১টার দিকে অ্যানি খাতুন নামে এক শিক্ষার্থী নিজ ঘরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। অ্যানি মাগুরা দুধ মল্লিক বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী।

গত ১২ জানুয়ারি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী জাকিয়া চৌধুরী। ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। একইদিনে যশোরের আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলের পঞ্চম তলার একটি বাথরুম থেকে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় সীমা জোহরা নামে এক বিদেশী শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ২১ বছরের তরুণী সীমা ভারতের জম্বু কাশ্মীরের বথগ্রাম জেলার যাবারপুর গ্রামের বাসিন্দা গোলাম মোহাম্মাদের মেয়ে।

গত ১৫ জানুয়ারি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় এক স্কুল ছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্নহত্যা করেছে।বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে শারমিন আক্তার(১৭) বাড়ীর দক্ষিণ প্বার্শে কাঠাল গাছের ডালার সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস দিয়ে আত্নহত্যা করেছে । নিহত শারমিন আক্তার চন্ডীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। একইদিন  কুমিল্লার  ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার বেজুড়া দক্ষিণ পাড়া গ্রামের মৃত সেকান্দর আলীর মেয়ে স্থানীয় স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাহিমা (১৪) রাত ৯টায় বশত ঘরের দক্ষিণ পাশের জানালার গ্রীলের সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস দিয়ে আত্নহত্যা করে। 

গত ১৬ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তার নাম নোহা (১৮)। একইদিন প্রেমিকের ওপর অভিমান করে সাথী (১৫) নামের এক স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা করার খবর পাওয়া গেছে। প্রেমিক বিয়েতে রাজি না হওয়ায় প্রেমিকা এ আত্নহত্যা। তবে নিহতের পরিবারের দাবি, বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ায় হৃদয় (প্রেমিক) তাকে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছে।

২৫ জানুয়ারি যশোরের ঝিকরগাছায় মোবাইলে ফ্রী ফায়ার গেম খেলতে নিষেধ করায় বাবার উপর অভিমান করে তৌফিক হাসান নামে এক স্কুল ছাত্র গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। নিহত তৌফিক হাসান ওই গ্রামের জাকির হোসেনের ছেলে ও স্থানীয় কাশিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র।

৩০ জানুয়ারি রাজশাহীর পুঠিয়ায় গলায় ফাঁস দিয়ে রুকাইয়া ইসলাম (১৬) নামের এক এসএসসি পরীক্ষার্থী আত্নহত্যা করেছে। নিহত রুকাইয়া  বিড়ালহদ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী।

৪ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যাকারী ওই শিক্ষার্থীর নাম পল্লবী মন্ডল। পল্লবী অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। 

১৫ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা শহরতলীর গদাইবিলে নিজের ঘের সংলগ্ন বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন জেলা ছাত্রসমাজের সাংগঠনিক সম্পাদক রোকুনুজ্জামান সুমন। তিনি জেলা সদর উপজেলার মাছখোলা পশ্চিমপাড়ার ইসহাক সরদারের ছেলে। 

১৬ ফেব্রুয়ারি গাজীপুর কালিয়াকৈর উপজেলার দাড়িয়াপুর এলাকায় গলায় ফাঁস দিয়ে সুমাইয়া আক্তার (১৪) নামে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। নিহত সুমাইয়া স্থানীয় একটি স্কুলের ছাত্রী ছিল।

১৮ ফেব্রুয়ারি প্রেমিকের গায়ে হলুদের দিন সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ওই শিক্ষার্থীর নাম উম্মে সালমা (১৪)। সে স্থানীয় ফাইতং মাস্টার আব্দুল উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। একইদিনে রাজধানীতে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। নিহত ওই শিক্ষার্থীর নাম মহাম্মদ শামসুদ্দোহা রুহান। রুহান মতিঝিল স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।

২৩ ফেব্রুয়ারি অধিক বয়সী ব্যক্তির সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ায় বিষণ্ণতায় গলায় ফাঁস দিয়ে এক কলেজছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন। ওই কলেজছাত্রীর নাম বৃষ্টি রানী (১৯)। তিনি সরকারি জনতা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন।

৩ মার্চ প্রেমিকের সাথে অভিমান করে রাজধানীর গুলশানে জান্নাতুল নরিন এশা নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন। তিনি খুলনার কুখ্যাত সসন্ত্রাসী এরশাদ শিকদারের মেয়ে।

১০ মার্চ প্রেমঘটিত কারণে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মালতি নামে এক স্কুল শিক্ষার্থী আত্নহত্যা করেছে। জানাগেছে যে, মানিকখালী গ্রামে শ্রীনিবাস বর্মণের ছোট মালতি বর্মণ ঘটনার দিন রাত আনুমানিক ১১টার সময় বাড়ির সদস্যদের অবর্তমানে সিলিং ফ্যানের সাথে ওড়না দিয়ে ফাঁস লাগিয়ে আত্মাহত্যা করে ৷ 

গত ১৮ মার্চ দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) ছাত্র মিজানুর রহমানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে পুলিশ জানায়, বান্ধবীর সঙ্গে মনোমালিন্যের হওয়ায় মিজানুর আত্মহত্যা করেছেন।

গত ৩১ মার্চ বগুড়ায় প্রেমিকার সঙ্গে ঝগড়ার পর সাগর সরকার নামে এক কলেজছাত্র গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। একইদিনে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার মনিপুরি পাড়ায় নিজেদের ভাড়া বাসায় গলায় ফাঁস দিয়ে লিথি নামে এক ছাত্রী ‘আত্মহত্যা’ করেছে। ঘটনার দিন সকাল ৭টার দিকে তিনি ফ্যানের সঙ্গে ওড়নায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

গত ১ এপ্রিল মার্কেটে নিয়ে না যাওয়ায় অভিমানে গলায় ফাঁস দিয়ে অষ্টম শ্রেণির এক স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন। নিহত ছাত্রীর নাম সোনালী। সে শিবরামপুর আরডি অ্যাকাডেমির অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী।

গত ৪ এপ্রিল খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অন্তু রায় নামে এক ছাত্র আত্মহত্যা করেছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

মেসের দরজা ভেঙে ৬ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জ নয়েল নামের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনার দিন রাত ১০টার দিকে মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিমে অবস্থিত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সংলগ্ন মেস থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়।তিনি ইনস্টিটিউটে কম্পিউটার বিভাগে পড়তেন।

গত ৭ এপ্রিল ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলায় খালার বাসায় বেড়াতে গিয়ে সাবরিনা আফরিন নামে এক স্কুলছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। তিনি দাগনভূঞা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়তো। একইদিনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পাগলা এলাকার নুরবাগ খাতুনে জান্নাত মহিলা মাদ্রাসার একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে এক ছাত্রীর (১৩) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ওই শিক্ষার্থীর বাবা ধারণা করছেন, মায়ের সঙ্গে অভিমান করেই আত্নহত্যা করেছে তার মেয়ে।

৯ এপ্রিল প্রাইভেটের টাকা দিতে না পাড়ায় মায়ের সঙ্গে অভিমান করে সিমা নামে এক কলেজছাত্রী আত্মহত্যা করেছে। ঘটনার দিন সকাল ৯টার দিকে বরগুনার তালতলী এলাকার নিজ ঘর থেকে তার ঝুলন্ত মসরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে উপজেলার পূর্ব ঝাড়াখালী গ্রামের খালেক আকন্দের মেয়ে। সিমা তালতলী সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিল।

প্রেমিকার সাথে মনোমালিন্যের জেরে ১৭ এপ্রিল রাজধানীর হাতিরঝিলের লেকে ঝাঁপ নিয়ে আত্মহত্যা করেন রাজ নামে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। পরের দিন তার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ২১ এপ্রিল রাজশাহীর তানোরে বিয়ে করতে রাজি না হওযায় বিষপানে আত্নহত্যা করেছেন রাবিয়া খাতুন (১৬) বনগাঁ উচ্চবিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী।

আত্নহত্যার ভয়ংকর রূপ দেখা গেছে গত বছর। বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০২১ সালে ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। 

এ প্রসঙ্গে সংগঠনটির রিসার্চ লিড মাহফুজুর রহমান হিমেল বলেন, শারীরীক স্বাস্থ্যের দিকে আমরা যতটা না সচেতন মানসিক স্বাস্থ্যের বেলায় ঠিক ততটাই অসচেতন। করোনাকালীন সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়েছে, তার মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার হার সর্বাধিক। অনলাইন ক্লাসে ঠিক মতো অংশগ্রহণ করতে না পারা, পারিবারিক সমস্যা, একাকীত্ব সহ নানান কারণে ছাত্র-ছাত্রীরা মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। কিন্তু নিজের সমস্যাগুলো অন্যদের সাথে ভাগ করতে না পারা, কাছের মানুষের অবহেলা, বন্ধুদের হাসি-ঠাট্টা এবং সর্বোপরি যেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করছে সেখানে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যপারগুলো সঠিকভাবে গুরুত্ব না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশার মাত্রা বাড়ছে এবং তারা মনে করছে নিজেদেরকে শেষ করে দেওয়াই হতাশা থেকে উত্তরণের পথ।

তিনি আরও বলেন, আত্মহত্যার পেছনের কারণ অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক সামাজিকতার চাপ, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক কারণসহ নানাবিধ কারণ উঠে এসেছিলো। আমার মনে হয় শিক্ষার্থীদের এই আত্মহত্যা প্রবণতা কমিয়ে আনতে একটা সুন্দর পারিবারিক কাঠামো,  শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সুস্থ বিনোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সহ সর্বোপরি মানসিক স্বাস্থ্যকে শারিরীক স্বাস্থ্যের মতই একটি সাধারণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা একান্তই জরুরি।


x