রাজধানীতে পুলিশের অভিযানে উদ্ধার করা হয় মানুষের ৪৭টি মাথার খুলি ও হাড় © সংগৃহীত
উত্তরার সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ইন্টার্নশিপের জন্য অপেক্ষা করছেন মো. ফয়সাল আহম্মেদ (২৬)। আর একই কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী কাজী জহুরুল ইসলাম ওরফে সৌমিক (২৫)। তারা গত কয়েক বছর ধরেই কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছে এবং অনলাইনে নিজেদের গ্রুপের মাধ্যমে কঙ্কাল বিক্রি করতেন। এ কাজে জড়িত প্রায় সাতজনের একটি সক্রিয় চক্র। কবর থেকে চুরি করে এসব কঙ্কাল বিক্রি করতেন ফয়সাল ও সৌমিক।
সোমবার (৯ মার্চ) রাতে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের মণিপুরীপাড়া, তেজগাঁও কলেজ ও উত্তরা এলাকা থেকে ফয়সল, সৌমিকসহ আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪৭টি মাথার খুলি ও বিপুল পরিমাণ মানবদেহের হাড়সহ কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।
আজ মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তেজগাঁও বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইবনে মিজান।
আরও পড়ুন : সলিমপুর জঙ্গলে যৌথবাহিনীর অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার, আটক ২২
মোহাম্মদ ইবনে মিজান বলেন, রমজানের শুরু থেকে আমাদের বিশেষ অভিযান চলছে। গতকাল রাতে তেজগাঁও থানা-পুলিশ বিশেষ অভিযানের প্রস্তুতিকালে জানতে পারে তেজগাঁও মণিপুরীপাড়ার একটি জায়গায় মানব কঙ্কাল বিক্রির চেষ্টা হচ্ছে। পুলিশ সেখানে গিয়ে এক ব্যক্তির সন্দেহজনক চলাচল দেখে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। একপর্যায়ে তার হেফাজত থেকে একটি মানব কঙ্কাল জব্দ করা হয়। কাজী জহুরুল ইসলাম ওরফে সৌমিক (২৫) নামের ওই ব্যক্তিকে আটকের পর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে এর সঙ্গে জড়িত আরও বেশ কয়েকজনের নাম পাওয়া যায় এবং আরও দু’জন কঙ্কালসহ তেজগাঁও কলেজের সামনে অবস্থা করছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। পরে সেখান থেকে মো. আবুল কালাম (৩৯) ও আসাদুল মুন্সী (৩২) নামের দু’জনকে দুটি মানব কঙ্কালসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি বলেন, সৌমিক উত্তরার সাপুরা ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতালের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তবে বাকি দু’জন শিক্ষার্থী নয়। এঁদের মধ্যে মো. আবুল কালামের (৩৯) বিরুদ্ধে ২০০৯ সালে কঙ্কাল উত্তোলনের অভিযোগেও মামলা হয়েছিল। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে মাদকসহ মানব কঙ্কাল উত্তোলন ও চুরির ঘটনায় বিভিন্ন থানায় ২১টি মামলা রয়েছে। আর আসাদুল মুন্সীর (৩২) বিরুদ্ধে দু’টি মামলা রয়েছে।
ডিসি মিজান বলেন, গ্রেপ্তার তিনজনকে থানায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় তারা একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তারা দেশব্যাপী এটা পরিচালনা করে আসছে। এ সময় তারা জানায়, জব্দ করা তিনটি কঙ্কাল ছাড়াও উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ৯ নম্বর সেক্টরে সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজের হোস্টেলের একটি কক্ষে ৪৪টি মাথার খুলি ও মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের হাড় রয়েছে। পরে সেখান থেকে বিভিন্ন ব্যাগ ও বস্তায় রাখা আরও ৪৪টি মাথার খুলি ও মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গের হাড় উদ্ধারসহ চক্রের মূল হোতা মো. ফয়সাল আহম্মেদকে (২৬) আটক করা হয়। তিনি সাপুরা ডেন্টাল কলেজ থেকে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে ইন্টার্নশিপের জন্য অপেক্ষা করছেন।
আরও পড়ুন : যশোর র্যাবের অভিযানে ককটেলসহ যুবক আটক
জিজ্ঞাসাবাদে ফয়সাল জানায়, বোন্স সেলিং (হাড় বিক্রি) নামে তাদের একটি অনলাইন গ্রুপ আছে। সেখানে তাদের ৭০০ জন কাজ করে। গ্রুপটিতে ২০ হাজার সদস্য রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে দুই শিক্ষার্থী এই কঙ্কাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত। এখন পর্যন্ত তাঁরা কেউ ৫০টি, কেউ ২০টি কঙ্কাল বিক্রি করেছেন। তাঁদের সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত রয়েছে যারা কবর থেকে লাশগুলো উত্তোলন করে। তারা মূলত গাজীপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর অঞ্চল থেকে এসব কঙ্কাল নিয়ে আসে।
ডিসি ইবনে মিজান বলেন, মাঠপর্যায় থেকে তারা ৬-৮ হাজার টাকায় কঙ্কালগুলো কেনেন। পরে সেগুলো ১৫-২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। তাঁরা কঙ্কাল বিক্রি করেন, তাঁদের কলেজে শিক্ষার্থীরা জানতেন। যখন কেউ অনলাইনে কঙ্কাল কেনার জন্য বুকিং দেয় তখন তাঁরা ১-২ সপ্তাহ সময় নেয়। শিক্ষার্থীদের কাছে এবং যারা বিক্রি করত তাদের কাছেই তাঁরা এসব কঙ্কাল বিক্রি করতেন। তাঁরা চারজনই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। লাশ কবরস্ত করার এক বছর পর তারা সেটা পর্যবেক্ষণ করে তুলে নিয়ে আসে। এ ক্ষেত্রে অরক্ষিত কবরগুলোতেই এই কাজগুলো করত। যেসব কবরে সিসি ক্যামেরা নাই, পর্যাপ্ত আলো নাই, নিরাপত্তা নেই সেসব কবর থেকেই তাদের লোকবল দিয়ে কঙ্কালগুলো সংগ্রহ করতেন। পরে কেমিক্যালের মাধ্যমে সেগুলো প্রক্রিয়া করে শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করতেন।
তাদের আজই আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নিয়ে আসা হবে। জিজ্ঞাসাবাদে আরও কারা কারা জড়িত সেই বিষয়গুলো বের করে আনার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান ইবনে মিজান।
এদিকে কোনো পরিবার বা স্বজন যদি তাদের স্বজনদের লাশের জন্য অভিযোগ করেন তাহলে সেগুলো ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে বলে জানান ডিসি ইবনে মিজান।