ইভটিজিংকারীকে জেরা। ইনসেটে ইস্ট ওয়েস্ট ছাত্র © সংগৃহীত (ফেসবুক)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইস্ট ওয়েস্টের দুই ছাত্রী ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছেন। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সংসদ সদস্যের রাজনৈতিক পিএস ও উপজেলার বাহারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম (৪৭) এই ঘটনায় জড়িত বলে জানা গেছে।
যদিও ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় উল্টো ভুক্তভোগী ওই দুই ছাত্রী এবং তাদের এক বন্ধুকে থানায় দিয়েছেন ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন চৌধুরী সুমন। মূলত কীভাবে সেই ঘটনার সূত্রাপাত? বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে খোলামেলা কথা বলেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র নাঈম মাহমুদ রুমি।
‘নারী হ্যারাজমেন্ট, গর্বিত ঢাবিয়ানদের টিএসসি আর নোংরা পলিটিক্যাল পাওয়ার’ শিরোনামে লেখা তার স্ট্যাটাসটি তুলে ধরা হলো-
তিনি লিখেছেন, ‘নারী হ্যারাজমেন্ট, গর্বিত ঢাবিয়ানদের টিএসসি আর নোংরা পলিটিক্যাল পাওয়ার। মূলত এই তিনটি স্টেপে আজ পরাজিত আর ‘দোষি’ হয়েছি। দুই মেয়ে বন্ধুকে নিয়ে আমি-আমরা তিনজন ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট- ঢাকা ভার্সিটির টিএসসি গিয়েছি আড্ডা দিতে। নিজেদের ঘর-বাড়ি মনে করা টিএসসি'তে আজকে ‘বহিরাগত’ হয়ে যাব, সেটা তখনো ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি।’
তার ভাষায়, ঘটনা শুরু যখন, তখন আমরা তিনজন টিএসসি'র বারান্দায় বসে আড্ডা দিচ্ছি। আমার এক মেয়ে ফ্রেন্ড প্রথমে খেয়াল করে এক লোক তার সামনে দাঁড়িয়ে ফোন কানে দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে তার প্যান্টের ভেতর হাতাচ্ছে। আমাদেরকে এটা বলায় আমরা ইনিশিয়ালি পাত্তা দিইনি। কিন্তু পরের ৫-৬ মিনিট ধরে একইভাবে কাজটা চলতে থাকলে আমার ফ্রেন্ড আবার বলে, তখন ওই লোকের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি, সে আমার ফ্রেন্ড দু’জনের দিকে তাকিয়ে প্যান্টের ভেতর হাত দিয়ে তার ‘পুরুষাঙ্গ’ হাতাচ্ছিল, মাস্টারবেট করছিল।
এটা বুঝতে পারায় আমি উঠে দাঁড়াই। আমার দাঁড়ানো দেখে ওই লোক আস্তে করে হাঁটা দেয়া শুরু করে। আমি তাকে থামানোর জন্য তাকে ডাক দিই এবং টিএসসি'র এর গেটে থাকা গার্ডকে জিজ্ঞেস করি যে উনাকে সে চিনে কি-না? গার্ড যখন বলে সে চিনে না, তখনই লোকটা ঘুরে দৌড় দিয়ে টিএসসি’র বাইরে চলে যায়। বাইরে থেকে তাকে ধরতে পারি। ধরার সাথেই সাথে সে মাফ চাওয়া শুরু করে, বলে আর করবো না, ছেড়ে দেন ইত্যাদি।
ততক্ষণে আমার বান্ধবী দু’জনও চলে আসে আমার পাশে। আমি তাকে ধরি, ধরে বলতে থাকি তার ঘরে বউ, তার কন্যা আছে কিনা। সে হ্যাঁ বলায় আমরা তখন আমাদের রাগ, ক্ষোভ ধরে না রাখতে পেরে ওই শুয়োরের বাচ্চাকে চড়-থাপ্পড় মারি; আমি মারি, আমার হ্যারাজড হওয়া বান্ধবী- সেও মারে এবং তাতেই মূলত আমরা অপরাধী হয়ে যাই অপরাধের প্রতিবাদ করে। কারণ-
১। ততক্ষণে জানা যায় ওই লোক আওয়ামী লীগের কোনো নেতা। তার পলিটিক্যাল ‘ভাই’ আছে ঢাবিতে।
২। আমরা ৩ জন ঢাকা ভার্সিটির বহিরাগত। তাই আমাদের অধিকার নেই প্রতিবাদ করার, সেটা যদি কেউ মাস্টারবেটও করে আমার বান্ধবীকে দেখে।
এই দু'টো ব্যাপার মিলে তখন টিএসসি'র জনরোষ আমাদের বিপক্ষে চলে যায়। লীগের নেতারা আমাকে ‘মেরে পা ভেঙ্গে শিক্ষা দেবার’ জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে এবং আমার দুই বান্ধবীকে তুই তোকারি করে লাঞ্চিত করতে থাকে।আমাদেরকে আশেপাশের সবাই মিলে অ্যাকিউজ করতে থাকে যে, আমরা বাইরে থেকে এসেছি, মেয়ে-ছেলে একসাথে, নেশা করতে, অসামাজিক কার্যকলাপ করতে। আমরা ততক্ষণে অসহায় হয়ে নিয়তিকে মেয়ে নিয়েছিলাম যে আজকে মার খেয়ে হয়তো মরবো, নাহয় ভাঙ্গা শরীর নিয়ে বাসায় যাবো।
যাইহোক, এভাবে আরো ১৫ মিনিটের মত সবার রেষারেষির মাঝে আমরা ৩ জন অসহায়ের মত থাকলাম। অতঃপর ঢাকা ভার্সিটির প্রক্টরিয়াল টিম আর লীগের ‘নেতা’রা আমাদের ৩ জনকেই দোষি সাব্যাস্ত করে পুলিশের গাড়িতে তুলে দেয়। আমাদের শাহবাগ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। তারপরের ৪ ঘন্টা আমাদের ৩ জনের খুবই দুঃসহ গিয়েছে।
হয়তো এই দুঃস্বপ্ন আরো বাড়তো যদি আমার বন্ধুরা সময়মত সাহায্য না করতো। ধন্যবাদ দোলনকে, তানভীর, মইনুল, রোমেল, রিশাদকে– আমাদের এই বাজে সময়ে থানায় এসে আমাদের সাহায্য করার জন্য। আর, ওই যে ওই লীগ, যাদের নোংরা পাওয়ার এর শিকার, সেই লীগেরই কিছু বন্ধুরা আমাদেরকে ছাড়ানোর জন্য হেল্প করেছে, তাদের সাথে চিরকৃতজ্ঞ দোলনের পরিচিত ঢাকা ভার্সিটির ওই ৩ জন ভাইকে, যারা আমাদেরকে এসে থানা থেকে বের করে নিয়ে গেছেন।
শেষে, আমার একটাই রাগ, ক্ষোভ আর হতাশা– মেয়েদেরকে হ্যারাজ করলে, মলেস্ট করলে– সেটার প্রতিবাদের সময় কেন এই দেশে উলটো আরো ডাবল হ্যারাজমেন্টের শিকার হতে হবে? কতদিন আর অপরাধের শিকার হয়েও নোংরা রাজনৈতিক পাওয়ারের কারনে বরং অপরাধী হব?
আমার কন্ঠ ছোট, নগন্য পাওয়ারলেস, তাই আজকে প্রতিবাদ করতে গিয়েও ডার্টি পাওয়ারের কাছে হেরে গেছি, ভুক্তভুগি হয়েছি আমি আর আমার বান্ধবী দু'জন। গড ব্লেস আস। আ ডাউনফল ইজ কামিং টু আস।