বিসিবি ও আইসিসি লোগো © সংগৃহীত
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)— নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ভারতেই ম্যাচ খেলতে হবে, অন্যথায় টুর্নামেন্ট থেকে বাইরে থাকার পাশাপাশি পয়েন্ট হারানোর ঝুঁকি নিতে হবে। নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো অন্য দেশে আয়োজনের অনুরোধ গ্রহণ করতে নারাজ আইসিসি।
ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার ভার্চুয়াল বৈঠকের পর এই অবস্থান বাংলাদেশের কাছে তুলে ধরে আইসিসি। তবে বিসিবির দাবি, আইসিসির পক্ষ থেকে তাদের কোনো ‘চূড়ান্ত শর্ত’ বা আলটিমেটাম দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত আইসিসি, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) কিংবা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড— কেউই আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে উত্তেজনা
এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন ভারত ও শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে অনুষ্ঠেয় ২০ দলের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু হতে আর এক মাসেরও কম সময় বাকি। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে টুর্নামেন্ট চলবে ৮ মার্চ পর্যন্ত।
পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী গ্রুপ ‘সি’-তে থাকা বাংলাদেশ দল তাদের প্রথম তিনটি ম্যাচ খেলবে কলকাতায়— ৭ ফেব্রুয়ারি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে, ৯ ফেব্রুয়ারি ইতালির বিপক্ষে এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। গ্রুপ পর্বে শেষ ম্যাচ ১৭ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে, প্রতিপক্ষ নেপাল।
রোববার বিসিবি আইসিসিকে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে আয়োজনের বিষয়টি ‘বিবেচনা’ করতে অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতেই আইসিসি জরুরি বৈঠক ডাকে বলে জানিয়েছে ক্রিকইনফো।
মোস্তাফিজ ইস্যু থেকেই সংকটের সূত্রপাত
বর্তমান উত্তেজনার সূত্রপাত হয় বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে। গত ১৬ ডিসেম্বর আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত আইপিএল নিলামে কোলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর) ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মোস্তাফিজকে দলে নেয়। নিলামের পরপরই ভারতের কয়েকটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোস্তাফিজকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয় এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে তাকে দলে নেওয়াকে ‘ভারতীয়দের আবেগের বিরুদ্ধে’ সিদ্ধান্ত বলা হয়। একপর্যায়ে দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনের দিকেও পদযাত্রা করে এসব সংগঠন।
এই প্রেক্ষাপটে গত ৩ জানুয়ারি বিসিসিআই জানায়, কেকেআরকে মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিসিসিআইয়ের সেক্রেটারি দেবজিৎ সাইকিয়া নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করে বলেন, ‘সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে’ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই দিনে কেকেআরও মোস্তাফিজকে ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
বিসিবির প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পরপরই বিসিবি একাধিক বোর্ড সভা করে। রোববার দেওয়া এক বিবৃতিতে বিসিবি জানায়, বাংলাদেশ দল আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে যাবে না এবং ম্যাচগুলো অন্য ভেন্যুতে আয়োজনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে দলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হলেও, মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা ইস্যুর সরাসরি যোগসূত্র স্পষ্ট করা হয়নি।
এদিকে ইএসপিএন ক্রিকইনফো জানিয়েছে, মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দেওয়ার ব্যাখ্যা চেয়ে বিসিবি বিসিসিআইকে চিঠি দিয়েছে। তবে ওই চিঠিতে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো উদ্বেগের কথা উল্লেখ করা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
ক্রীড়া কূটনীতি থেকে রাজনৈতিক মাত্রা
এই ইস্যুতে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সোমবার দেশের সব টেলিভিশন চ্যানেলে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের নির্দেশ দেয়।
ভারতের বিশ্লেষক বোরিয়া মজুমদার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার আগ পর্যন্ত নিরাপত্তা নিয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠেনি। তার মতে, এটি নিরাপত্তার চেয়ে রাজনৈতিক পাল্টা প্রতিক্রিয়া। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এক দিনের ব্যবধানে কীভাবে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হলো।
ভারতের কংগ্রেস এমপি শশী ঠারুর এই সিদ্ধান্তকে ‘অপরিণামদর্শী’ বলে মন্তব্য করেছেন। সাবেক বিসিসিআই প্রশাসক রামাচন্দ্র গুহাও এটিকে ‘মারাত্মক অবিবেচক’ সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সামনে অনিশ্চয়তা
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের সূচি বদলানো বাস্তবসম্মত নয়। সূচি পরিবর্তন হলে টিকিট, ভেন্যু প্রস্তুতি ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় বড় সংকট তৈরি হবে। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক সিরিজ এবং বিসিবির আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ছে।
সব মিলিয়ে মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে শুরু হওয়া এই ঘটনাপ্রবাহ এখন দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্ককে অনিশ্চিত এক মোড়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে, যার সমাধান কবে আসবে— সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত নেই।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।