জাতীয় প্রেসক্লাবে মিডিয়া ওয়াচের সংবাদ সম্মেলন © টিডিসি ফটো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গণমাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারণামূলক সংবাদ কাভারেজের পরিমাণগত বিশ্লেষণ করেছে মিডিয়া ওয়াচ। তারা বলছে, নির্বাচনী প্রচারণা কাভারেজে অধিকাংশ গণমাধ্যম ভারসাম্য রাখতে পারেনি। তারা বিএনপির প্রচারণাকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। আজ বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। মিডিয়া ওয়াচের রিসার্চ কো অর্ডিনেটর প্লাবন তারিক বিস্তারিত তুলে ধরেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২২ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময়ে প্রার্থীদের পাশাপাশি তাদের সমর্থকরা অনলাইন ও অফলাইনে প্রচার-প্রচারণা, সমাবেশ, মিছিল, বৈঠকসহ নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রার্থীরা বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস প্রদান করেন, নিজেদের সাফল্য তুলে ধরেন এবং বিরোধী দলের সমালোচনা করেন।
দেশের প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমগুলো এসব কার্যক্রম কম-বেশি প্রচার করেছে। পাশাপাশি কোন প্রার্থী কখন ও কোথায় সমাবেশ করছেন, সমাবেশের প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য জনসমাগম নিয়েও সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এ কাভারেজ দিতে গিয়ে অনেক গণমাধ্যমই প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি পক্ষের প্রচারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সংখ্যার পাশাপাশি ছবির ব্যবহার, সংবাদের অবস্থান (বিশেষত প্রথম পাতায়) এবং প্রচারের সময়ের দিক থেকেও এই বৈষম্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এর ফলে গণতান্ত্রিক একটি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
এর প্রেক্ষাপটে মিডিয়া ওয়াচ বাংলাদেশ দেশের প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যমে ২২ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত ও প্রচারিত নির্বাচনী প্রচারণা সংক্রান্ত সংবাদ নিয়ে একটি পরিমাণগত বিশ্লেষণ পরিচালনা করেছে। এতে প্রিন্ট মিডিয়ায় সংবাদ সংখ্যা, ছবির সংখ্যা এবং প্রথম পাতার ট্রিটমেন্ট আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর সংবাদের তুলনামুলক উপাত্ত বের করা হয়েছে।
ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সব কনটেন্ট বিশ্লেষণ করা দুরূহ হওয়ায় প্রতিদিন সন্ধ্যা ও রাতের প্রধান বুলেটিন বিশ্লেষণ করে প্রধান দুই দলের মধ্যে কার প্রচারণা কত সময় ধরে প্রচার করা হয়েছে, তা নিরূপণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এখানে কেবল প্রচারণা সংক্রান্ত সংবাদগুলো গণনা করা হয়েছে। সভা-সমাবেশ, আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি, ইশতেহার, নিজের গুনগান, বিরোধী পক্ষের সমালোচনা, প্রচারণাকালীন বক্তব্য, সভা-সমাবেশের শিডিউল ইত্যাদি বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদকে এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংঘর্ষ, বিবৃতি, সংবাদ সম্মেলন, প্রচারণার বাইরে অন্যান্য দলীয় কার্যক্রমকে এর মধ্যে গণ্য করা হয়নি।
এ বিশ্লেষণের মূল উদ্দেশ্য হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রচারণা কাভারেজে কোন রাজনৈতিক দলকে কেমন কাভারেজ দেওয়া হয়েছে তা পরিমাণগত উপাত্তের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা। বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত গণমাধ্যমগুলো হলো- প্রিন্ট মিডিয়া (৯টি): প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, কালের কণ্ঠ, আমার দেশ, সমকাল, ইত্তেফাক, যুগান্তর, ইনকিলাব, নয়া দিগন্ত; ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া (৭টি): যমুনা টেলিভিশন, সময় টিভি, বিটিভি, নিউজ২৪, চ্যানেল২৪, বাংলা ভিশন, ডিবিসি (আংশিক) এবং অনলাইন মিডিয়া (৫টি): বাসস বাংলা, বিডিনিউজ২৪, ঢাকা পোস্ট, বাংলা ট্রিবিউন, জাগো নিউজ।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী ২৩ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত পত্রিকায় নির্বাচনী প্রচারণার সংবাদ- প্রথম আলো: বিএনপি ৬৫টি, জামায়াতে ইসলামী ৩৬টি; দ্য ডেইলি স্টার: বিএনপি ৩৩টি, জামায়াতে ইসলামী ২২টি; সমকাল: বিএনপি ৬৬টি, জামায়াতে ইসলামী ২৯টি; কালের কণ্ঠ: বিএনপি ১০৫টি, জামায়াতে ইসলামী ৩৫টি; যুগান্তর: বিএনপি ১২১টি, জামায়াতে ইসলামী ৪৪টি; আমার দেশ: বিএনপি ৬৩টি, জামায়াতে ইসলামী ৪২টি; ইত্তেফাক: বিএনপি ৮৯টি, জামায়াতে ইসলামী ৩২টি; ইনকিলাব: বিএনপি ১২৯টি, জামায়াতে ইসলামী ৩১টি; নয়া দিগন্ত: বিএনপি ৭৬টি, জামায়াতে ইসলামী ৯৩টি।
২৩ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত পত্রিকায় নির্বাচনী প্রচারণার ছবি: প্রথম আলো: বিএনপি ৭৮টি, জামায়াতে ইসলামী ৪৬টি; দ্য ডেইলি স্টার: বিএনপি ৫০টি, জামায়াতে ইসলামী ৩৩টি; সমকাল: বিএনপি ৭৫টি, জামায়াতে ইসলামী ৩৭টি; কালের কণ্ঠ: বিএনপি ৭৬টি, জামায়াতে ইসলামী ৩১টি; যুগান্তর: বিএনপি ৭৭টি, জামায়াতে ইসলামী ৩৮টি; আমার দেশ: বিএনপি ৫৪টি, জামায়াতে ইসলামী ৪০টি; ইত্তেফাক: বিএনপি ১০৪টি, জামায়াতে ইসলামী ৩০টি; ইনকিলাব: বিএনপি ৭৭টি, জামায়াতে ইসলামী ৩১টি; নয়া দিগন্ত: বিএনপি ৭৫টি, জামায়াতে ইসলামী ৭৬টি।
আরও পড়ুন: ইন্টারনেট বন্ধ নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার
বিশ্লেষণ অনুযায়ী অনলাইন গণমাধ্যমের চিত্র- ২২ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত নির্বাচনী প্রচারণার সংবাদ: বাসস (বাংলা): বিএনপি ৪৩৩টি, জামায়াতে ইসলামী ২১৩টি; বিডিনিউজ২৪: বিএনপি ২২৭টি, জামায়াতে ইসলামী ৬৬টি; ঢাকা পোস্ট: বিএনপি ২৯৫টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭৯টি; বাংলা ট্রিবিউন: বিএনপি ১৪৭টি, জামায়াতে ইসলামী ৮০টি; জাগো নিউজ: বিএনপি ৩৯৬টি, জামায়াতে ইসলামী ২৮৯টি।
২২ জানুয়ারি থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রচারিত নির্বাচনী প্রচারণার সংবাদ: সন্ধ্যা ও রাতের প্রধান বুলেটিন বিশ্লেষণ করে প্রতিদিন গড় প্রচার সময় নির্ধারণ করা হয়। এই দুই সময়ের বুলেটিনে প্রতিদিনের গড় হিসাব নিন্মরূপ: চ্যানেল২৪: বিএনপি জোট ১৫ মিনিট, জামায়াতে ইসলামী জোট ৭ মিনিট; সময় টিভি: বিএনপি জোট ২০ মিনিট, জামায়াতে ইসলামী জোট ১০ মিনিট; বিটিভি: বিএনপি জোট ও জামায়াতে ইসলামী জোট উভয়েই ১৫ মিনিট করে; নিউজ২৪: বিএনপি জোট ২০ মিনিট, জামায়াতে ইসলামী জোট ৫ মিনিট; বাংলা ভিশন: বিএনপি জোট ২০ মিনিট, জামায়াতে ইসলামী জোট ৭ মিনিট; ডিবিসি (আংশিক): বিএনপি জোট ১৫ মিনিট, জামায়াতে ইসলামী জোট ১০ মিনিট।
মিডিয়া ওয়াচ বলছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের ভারসাম্যপূর্ণ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু এই পরিমাণগত বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, নির্বাচনি প্রচারণায় অধিকাংশ গণমাধ্যম কাভারেজে ভারসাম্য রাখতে পারেনি এবং বিএনপির প্রচারণাকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।