জুলাই সনদ নিয়ে রেটোরিক্স বনাম বাস্তবতা: রাজনীতির আয়নায় জনস্বার্থ

প্রফেসর ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকার

প্রফেসর ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকার © টিডিসি সম্পাদিত

চব্বিশের জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বাংলাদেশের রাজপথ যে অভূতপূর্ব গণজাগরণ দেখেছিল, তার মূলে ছিল এক গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ অতি দ্রুত একটি এক দফা দাবিতে রূপ নেয়, যা ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের ডাক। ছাত্র-জনতার সেই অভ্যুত্থান কেবল একটি সরকার পতন বা শাসন পরিবর্তনের লড়াই ছিল না, বরং তা ছিল একটি বৈষম্যহীন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দাবি। 

আবু সাঈদ, ওয়াসিম, মুগ্ধদের মতো অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত সেই বিপ্লবের চেতনাকে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও নীতিগত কাঠামো দেওয়ার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে সামনে আসে ‘জুলাই সনদ ২০২৫’। ১১টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘ আলোচনার পর ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়া এই সনদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে যে তর্ক-বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি অবস্থানের সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক গভীর সংকটের দিক উন্মোচন করে। জুলাই সনদ নিয়ে যে উচ্চাভিলাষী বক্তৃতা বা রেটোরিক্স আমরা শুনছি, তার সাথে মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার ব্যবধান এখন এক বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জুলাই সনদের মূল নির্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গণমুখী প্রশাসনিক সংস্কারের একটি সমন্বিত প্রতিশ্রুতি। এর মূল দর্শন হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা সমানভাবে গুরুত্ব পায়। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে রাষ্ট্রকে একটি শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর লক্ষ্যেই এই সনদকে একটি বাস্তবমুখী নীতি দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন: পুলিশের এএসআই পদের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন শুরু ২৮ এপ্রিল

বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তা মূলত দীর্ঘমেয়াদে একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। সরকার দাবি করছে যে, এই সনদ প্রণয়নের সময় কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে "কৃষক কার্ড" প্রবর্তন, কৃষি উপকরণের ওপর ভর্তুকি কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাস এবং প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো এতে অত্যন্ত জোরালোভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি যেহেতু মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে, তাই এই সনদের সফল প্রয়োগ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন।

তবে এই মহতী উদ্যোগকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে এক ধরনের দ্বৈত মানদণ্ড ও নেতিবাচক রেটোরিক্সের রাজনীতি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে বিএনপি সরকার যখন এর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তখন অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির মতো রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান বিভিন্ন মহলে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এই দলগুলো বাহ্যিকভাবে জনকল্যাণ ও গণতন্ত্রের বুলি আউড়ালেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে জুলাই সনদের মতো একটি সুদূরপ্রসারী ও জনবান্ধব উদ্যোগকে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাদের রাজনৈতিক প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে যে, তারা এই সনদের নীতিগত উৎকর্ষ বা জনগণের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করার পরিবর্তে এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে সামনে এনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তারা এই নীতিকে অনেক ক্ষেত্রে ‘অকার্যকর’ বা ‘প্রতারণামূলক’ হিসেবে আখ্যা দিলেও এর বিপরীতে কোনো সুস্পষ্ট বা বিকল্প উন্নয়ন রূপরেখা জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এই ধরনের রাজনৈতিক দ্বিচারিতার মূল সমস্যা হলো এটি জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেয় না, বরং সংকীর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী রাজনীতির দায়িত্ব হলো সরকারের ভুল ত্রুটিগুলো ধরিয়ে দেওয়া এবং তথ্যভিত্তিক ও সমাধানমুখী সমালোচনা করা। যদি কোনো রাষ্ট্রীয় নীতি বাস্তবেই জনকল্যাণে সহায়ক হয়, তবে তাকে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে আরও উন্নত করার চেষ্টা হওয়াই হলো সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ। কিন্তু যখন বিরোধিতা শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে বা ক্ষমতা কাঠামোর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে করা হয়, তখন তা এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতারণায় রূপ নেয়। অতিরঞ্জিত বক্তব্য বা মিথ্যা রেটোরিক্সের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করার এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয় এবং জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে কোনটি প্রকৃত সমস্যা আর কোনটি কেবল রাজনৈতিক স্বার্থের বাগাড়ম্বর, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন: যশোর বোর্ডে এসএসসিতে অতিরিক্ত সময় পাবে ১৪৪ পরীক্ষার্থী

বর্তমান এই উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভেতর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো জনস্বার্থের প্রকৃত প্রশ্নটি অনেক ক্ষেত্রেই আড়ালে পড়ে যাওয়া। জুলাই সনদের প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করছে এর স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়নের ওপর। সরকারের পক্ষ থেকেও দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। একটি চমৎকার নীতিপত্র প্রণয়ন করা যতটা প্রশংসনীয়, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো এর মাঠ পর্যায়ের সফল প্রয়োগ। যদি জুলাই সনদের বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, তথ্য প্রকাশ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না যায়, তবে বিরোধীদের সমালোচনার সুযোগ থেকেই যাবে। নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় যদি জবাবদিহিতার অভাব থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। তাই সরকারকে যেমন তাদের কাজের মাধ্যমে সততার প্রমাণ দিতে হবে, তেমনি বিরোধীদেরও কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করা পরিহার করতে হবে।

জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে বর্তমান এই অস্থির সময় আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সামনে কিছু মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে। আমরা কি আসলেই একটি নীতিনির্ভর ও আদর্শিক রাজনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছি, নাকি আমরা এখনও সেই পুরনো পারস্পরিক অবিশ্বাস, মিথ্যা রেটোরিক্স ও দ্বিচারিতার চক্রেই আবদ্ধ আছি? রাজনৈতিক দলগুলো কি সত্যি জনগণের বাস্তব সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হবে, নাকি তারা কেবল গালভরা বক্তৃতার মাধ্যমেই নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখবে? এই প্রশ্নগুলো আজ প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। জনগণ এখন আর কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা নীতিপত্রের কালো অক্ষরে তুষ্ট থাকতে চায় না; তারা চায় বাস্তব ফলাফল। সাধারণ মানুষের চাওয়া হলো তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, নিত্যপণ্যের দামের স্থিতিশীলতা এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

বাংলাদেশের আগামীর সমৃদ্ধি নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সঠিক দর্শনের ওপর। জুলাই সনদ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের কৃষি ও অর্থনীতির জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিতে পারে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। রাজনীতি যেন কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই না হয়ে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়, সেটিই এখন বড় প্রত্যাশা। নীতিকে রাজনীতির উপরে স্থান দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে না পারলে উন্নয়নের সকল নীল নকশা কেবল নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। 

রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় থাকুক বা বিরোধী দলে, তাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনস্বার্থ। অন্যথায় রেটোরিক্স আর পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ির ভিড়ে সাধারণ মানুষের স্বপ্নগুলো আবারও ধুলিসাৎ হয়ে যাবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে নীতিনির্ভর রাজনীতির চর্চা এবং গঠনমূলক ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই। এই পথেই হয়তো একদিন বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

বিএনপির এমপি হচ্ছেন ‘মায়ের ডাক’র তুলি
  • ২০ এপ্রিল ২০২৬
নাহিদের জোড়া আঘাতে দাপুটে শুরু বাংলাদেশের
  • ২০ এপ্রিল ২০২৬
লেবাননে হাতুড়ি দিয়ে যিশুর মূর্তি ভাঙলেন ইসরায়েলি সেনা, তীব্…
  • ২০ এপ্রিল ২০২৬
জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির ৩৬ প্রার্থীর তালিকা…
  • ২০ এপ্রিল ২০২৬
কলসি কাঁখে সুপেয় পানির দাবিতে ম্যারাথনে অংশ নিলেন দুই শতাধি…
  • ২০ এপ্রিল ২০২৬
ঢাবির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক প্রদীপ কুমার আর নেই
  • ২০ এপ্রিল ২০২৬