আজাদ খান ভাসানী © টিডিসি সম্পাদিত
উপমহাদেশের রাজনীতিতে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর রাজনীতি ছিল গণমানুষের। বিশেষ করে কৃষক ও মেহনতি মানুষের অধিকারকেন্দ্রিক। তাই তাঁর ব্যবহৃত রাজনৈতিক প্রতীকগুলোও কেবল নির্বাচনচিহ্ন ছিল না। এগুলো ছিল তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম ও দর্শনের প্রতিফলন।
নৌকা
১৯৪৯ সালে মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ‘নৌকা’ প্রতিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে 'নৌকা' আওয়ামী রাজনীতির প্রতিক হয়ে যায়। নদীমাতৃক বাংলায় নৌকা শুধু একটি বাহন নয়, এটি মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও টিকে থাকার প্রতীক।
ভাসানীর রাজনৈতিক দর্শনে এই নৌকা সাধারণ মানুষের সাথে গভীর আবেগের বন্ধন তৈরি করেছিল। অনেকেই বলে থাকেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়েও মওলানা ভাসানী অনেক বেশি নৌকাচারী ছিলেন বলে তিনি নৌকাকেই তাঁর প্রথম রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
ধানের শীষ
১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মওলানা ভাসানী তাঁর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলেন। এই দলের প্রতীক ছিল ‘ধানের শীষ’।
ধানের শীষ সরাসরি কৃষক, খাদ্য ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার প্রতীক- যা মওলানা ভাসানীর রাজনীতির মূল ভিত্তিকেই তুলে ধরে। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও ন্যাপ এই প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ করে।
পরবর্তীতে মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর তাঁর অনেক অনুসারী জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-তে যোগ দিলে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকটি বিএনপির দখলে চলে যায়।
লাঙ্গল
উপমহাদেশের রাজনীতিতে মওলানা ভাসানী ছিলেন প্রকৃতই একজন কৃষক দরদী নেতা। আসাম-বাংলা, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানেও তিনি অসংখ্য কৃষক সম্মেলন করেছেন। তাঁর কৃষক সম্মেলনগুলোতে লাল টুপি এবং তার মাঝে লাঙ্গল প্রতিক ব্যবহার হতো। কৃষি বিপ্লবরে প্রতীক ছিল এই লাঙ্গল। তারপর হু ম এরশাদের সাথে কিছু ভাসানী অনুসারী যোগ দিলে জাতীয় পার্টির মার্কা লাঙ্গল হিসেবে গৃহীত হয়। এছাড়া শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে তাঁর কৃষক প্রজা পার্টির (KSP) জন্য 'লাঙ্গল' প্রতীক ব্যবহার করেছিলেন।
প্রসঙ্গত: "ঊনসত্তরে মওলানা ভাসানী মহিপুরে কৃষক সমিতির নেতাদের এক জরুরি সভা ডাকেন। এই সভায় আলোচনার একপর্যায়ে হঠাৎ তিনি প্রস্তাব দিলেন, অক্টোবর মাসে পাকসীর শাহপুরে কৃষক সম্মেলন করতে হবে। সারা দেশ থেকে লাঙল মার্কা লালটুপি পরে লংমার্চ করে ওই সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে হবে। [সূত্রঃ নজমুল হক নান্নু, ইতিহাসের ধারায় মওলানা ভাসানী, পৃষ্ঠাঃ ৮৯।]"
মওলানা ভাসানী ব্যবহৃত প্রতীকগুলো- নৌকা, ধানের শীষ, লাঙল- কেবল রাজনৈতিক চিহ্ন নয়। এগুলো ছিল তাঁর চিন্তা, সংগ্রাম এবং কৃষক-নির্ভর সমাজব্যবস্থার স্বপ্নের বহিঃপ্রকাশ। এই প্রতীকগুলোর বিবর্তন শুধু দলীয় পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি উপমহাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ, নেতৃত্ব এবং জনগণের শক্তির এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস।
লেখক: মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নাতি