ফাহিম মাহমুদ © টিডিসি সম্পাদিত
চব্বিশের মহান গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে শিক্ষাঙ্গনগুলো যখন একটি নতুন ভোরের প্রতীক্ষায়, তখন সেখানে দানা বাঁধছে এক জটিল ও উদ্বেগজনক রাজনৈতিক সমীকরণ। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনে ছাত্রলীগের 'হল দখল', 'টর্চার সেল' এবং 'গেস্টরুম' সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোর আকাঙ্ক্ষায়। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান দ্বৈরথ এবং কিছু অদৃশ্য শক্তি কর্তৃক ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টা সেই আশার ওপর নতুন করে আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে তুলেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের চিরাচরিত রীতি হল ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনগুলো পেশিশক্তির জোরে হল দখল করে সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। সেই বিবেচনায় ছাত্রদলের সাম্প্রতিক অবস্থান উল্লেখযোগ্য। ছাত্রলীগের কুখ্যাত মিছিলে জোরপূর্বক অংশগ্রহণ করানো কিংবা হল বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলোর কোনোটিই ছাত্রদল তার সাংগঠনিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করেনি। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নির্দেশনা ছিল সুস্পষ্ট: ছাত্রলীগের সেই অপরাজনীতির প্রেতাত্মাকে কোনোভাবেই পুনরুজ্জীবিত হতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু এই সংযমের মধ্য দিয়েই জন্ম নিয়েছে এক গভীর কাঠামোগত সংকট।
ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতনের পরপরই এক শ্রেণির সুচিন্তিত মহল অত্যন্ত কৌশলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে 'ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের' একটি আবহ তৈরি করে। এই দাবির অন্তরালে বিগত দিনগুলোতে নির্যাতিত ছাত্রদলের কর্মীদের হলে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়; যা অনেকাংশেই ছাত্রলীগীয় কায়দার প্রতিচ্ছবি। অথচ নেপথ্যের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। 'রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস' এর মোড়কে প্রতিটি হলে সক্রিয় হয়ে ওঠে রহস্যময় কিছু টিম। এই তথাকথিত টিমগুলোই নির্ধারণ করতে শুরু করে কে হলের আসন পাবে আর কে পাবে না। অর্থাৎ, ছাত্রলীগের দৃশ্যমান দখলদারির বদলে প্রতিষ্ঠিত হয় এক ধরনের অদৃশ্য ছায়াতন্ত্র, যার কোনো আনুষ্ঠানিক নাম বা ঠিকানা নেই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পরিপূর্ণ।
ঘটনার নাটকীয় মোড় পরিলক্ষিত হয় যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধের আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ একে একে ছাত্রশিবিরের শীর্ষ নেতৃত্বে অভিষিক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণটি এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সক্রিয় থেকে রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগ সংহত করেছিলেন যিনি, সেই আন্দোলনের সামনের সারির মুখ আবু সাদাত সায়েমকে হঠাৎ করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে জনসমক্ষে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। একইভাবে দীর্ঘদিন নিজেকে সাধারণ শিক্ষার্থী পরিচয়ে উপস্থাপন করে হঠাৎ সভাপতি পদে আবির্ভূত হন সাদিক কায়েম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য ক্যাম্পাসেও অভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়; যারা প্রকাশ্যে রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুলেছেন, দিনশেষে তারাই শিবিরের সাংগঠনিক বলয় থেকে আবির্ভূত হয়েছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই উন্মোচন তৈরি করেছে এক গভীর আস্থার সংকট, যা কেবল একটি সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট নয়, বরং সমগ্র ছাত্ররাজনীতির নৈতিক ভিত্তির প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে আসে।
এই গুপ্ত রাজনীতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিকটি হলো রাজনৈতিক জবাবদিহিতার চরম অনুপস্থিতি। যখন কোনো সংগঠন ছদ্মবেশে বা টিম আকারে পরিচালিত হয়, তখন তাদের কোনো কর্মকাণ্ডের জন্যই আইনগত বা নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ করা যায় না। হলের কোনো শিক্ষার্থী অন্যায়ের শিকার হলে সে কার কাছে অভিযোগ জানাবে? প্রকাশ্য রাজনীতিতে সংগঠনের দায়বদ্ধতা থাকে; কিন্তু এই ছায়াতন্ত্রের কোনো দৃশ্যমান ঠিকানা বা অস্তিত্ব নেই।
এই মডেলটি মূলত একটি 'সফট কন্ট্রোল মেকানিজম' বা একটি অদৃশ্য একনায়কতন্ত্র, যেখানে ক্ষমতা ভোগ করা হয় পূর্ণমাত্রায়, কিন্তু দায়বদ্ধতা গ্রহণ করা হয় শূন্যের কোঠায়। নেতৃত্ব থাকে আড়ালে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা ব্যবহৃত হয় নিছক ঢাল হিসেবে। এটি কেবল রাজনৈতিক কাপুরুষতা নয়, বরং একটি সুচিন্তিত কৌশলগত প্রতারণা। রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ট তাঁর The Human Condition গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, রাজনীতি হলো মানুষের প্রকাশ্য ও স্বতঃস্ফূর্ত ক্রিয়াকলাপের ক্ষেত্র (Public Space)। এটি তখনই বিনষ্ট হয় যখন তা ষড়যন্ত্র বা গোপনীয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। ছাত্রশিবিরের বর্তমান লুকোচুরির রাজনীতি আরেন্টের সেই পাবলিক স্পেস বা মুক্ত রাজনৈতিক চর্চাকেই অবরুদ্ধ করার নামান্ত।
আরও গভীর উদ্বেগের বিষয় হলো, ছাত্রশিবিরের বর্তমান অনেক ঘোষিত নেতার বিরুদ্ধে বিগত সময়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। যারা একসময় নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করে ফ্যাসিবাদী শক্তির ছায়ায় অবস্থান করেছে, তারা যখন বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে নতুন খোলস পাল্টে নীতিনির্ধারক হতে চায়, তখন শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তার রাজনীতি চরমভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে। পরিচয়ের এই চলমান তরলতা, যেখানে একই ব্যক্তি পরিস্থিতিভেদে অবস্থান পরিবর্তন করে, তা ছাত্ররাজনীতিতে একটি গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করে: আদর্শ কি কেবল রাজনৈতিক কৌশলের আরেকটি হাতিয়ার?
শিক্ষার্থীদের মূল চাওয়া ছিল এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে আদর্শের লড়াই হবে প্রকাশ্য দিবালোকে এবং যুক্তির নিরিখে। কিন্তু যদি একদল প্রকাশ্যে রাজপথে সংগ্রাম করে এবং অন্যদল মুখোশের আড়ালে হলের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তবে সেই কাঠামোগত বৈষম্য কখনোই দূরীভূত হবে না।
ছাত্রদল ছাত্রলীগ হতে চায় না বলেই সম্ভবত ছাত্রলীগীয় কায়দায় হল দখল করেনি; এই সংযম প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু এই উদারতাকে যদি কোনো পক্ষ দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করে ছদ্মবেশী রাজনীতির মাধ্যমে ক্যাম্পাস দখল করতে চায়, তবে তা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আর কোনো ছায়াতন্ত্র বা গুপ্ত শাসন প্রত্যাশা করে না। কাম্য হলো এমন একটি শিক্ষাঙ্গন যেখানে রাজনীতি হবে স্বচ্ছ, আদর্শিক এবং সরাসরি শিক্ষার্থীদের অধিকারের স্বপক্ষে। ছদ্মবেশী রাজনীতির অবসান না ঘটলে বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশের স্বপ্নটি, যার জন্য এই প্রজন্ম রক্ত দিয়েছে, তা ক্রমান্বয়ে বিলীন হতে থাকবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অফ দ্য ওয়েস্ট অফ ইংল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও ছাত্রদল নেতা।