গজনী অবকাশ পর্যটনকেন্দ্র ও মধুটিলা ইকোপার্কে © টিডিসি সম্পাদিত
ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটি মানেই প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি আর প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা স্বস্তির সময়। সেই আনন্দকে আরও রঙিন করে তুলতে শেরপুরের গারো পাহাড়ঘেরা পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ছুটে আসছেন হাজার হাজার মানুষ। ঈদের দিন থেকে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার গজনী অবকাশ পর্যটনকেন্দ্র এবং নালিতাবাড়ী উপজেলার মধুটিলা ইকোপার্কে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। পাহাড়, লেক, সবুজ প্রকৃতি ও আধুনিক বিনোদন সুবিধার সমন্বয়ে ঈদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে এই দুই পর্যটনকেন্দ্র।
রবিবার সরেজমিনে গজনী অবকাশ পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর পুরো এলাকা। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পর্যটকদের উপস্থিতিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে গারো পাহাড়ের পাদদেশ। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব ও স্বজনদের নিয়ে অনেকেই সময় কাটাচ্ছেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মধ্যে।
ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ের মনোরম পরিবেশ, সবুজে ঘেরা উঁচুনিচু টিলা, বিশাল লেক এবং দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো পর্যটকদের সহজেই আকৃষ্ট করছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পাহাড়ের বুক চিরে নির্মিত সুদীর্ঘ ওয়াকওয়ে পর্যটন কেন্দ্রটির অন্যতম আকর্ষণ। এই ওয়াকওয়ে ধরে লেকের পাড় ঘেঁষে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে হেঁটে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা। অনেকেই লেকে নৌবিহার করছেন, কেউবা পাহাড়ের পাদদেশে বসে আড্ডা দিচ্ছেন কিংবা প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগে মগ্ন হয়ে সময় কাটাচ্ছেন।
গারো মা ভিলেজে গিয়ে দেখা যায়, মাশরুম আকৃতির ছাতা ও পাখি বেঞ্চে বসে পর্যটকরা উপভোগ করছেন পাহাড়ি জনপদের জীবনচিত্র। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে দিগন্তজোড়া সবুজ ধানক্ষেত ও পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে থাকা বসতি। এসব দৃশ্য অনেককেই মোবাইল ফোন ও ক্যামেরায় বন্দি করতে দেখা যায়।
শিশুদের বিনোদনের জন্য চুকুলুপি চিলড্রেনস পার্ক এবং নতুন সংযোজিত শিশু কর্নারেও ছিল উপচে পড়া ভিড়। পাশাপাশি ঝুলন্ত সেতু, লাভ সেলফি ব্রিজ, সেলফি পয়েন্ট এবং লেকের ওপর নির্মিত ভাসমান সেতু দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
গজনী অবকাশ পিকনিক স্পটের ঝুলন্ত সেতুর ইজারাদার সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘এবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে গজনী অবকাশ পিকনিক স্পটের ঝুলন্ত ব্রিজে ভ্রমণপিপাসুদের অসাধারণ ভিড় দেখা যাচ্ছে। পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ে পুরো স্পটটি জমজমাট হয়ে উঠেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে প্রকৃতির কোলে সময় কাটাতে আসা দর্শনার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ সেবা দিতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পর্যটকদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা প্রাণবন্ত হয়ে থাকছে।’
জামালপুর জেলার এক পর্যটক আরিফ মিয়া পরিবার নিয়ে গজনী অবকাশে বেড়াতে এসে বলেন, ‘ঝুলন্ত সেতুটি আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করেছে। প্রকৃতির এত সুন্দর পরিবেশে সময় কাটিয়ে সত্যিই ভালো লাগছে।’
জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক জাহিদ বলেন, ‘প্রতিবারই এই সময়ে এখানে আসি। এবার নতুন নতুন রাইড ও বিনোদন সুবিধা যোগ হওয়ায় আরও ভালো লাগছে।’
ঢাকা থেকে আগত এক দর্শনার্থী বলেন, ‘শহরের যান্ত্রিক জীবন আর কোলাহল থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে গারো পাহাড়ে চলে এসেছি। ঈদের ছুটিতে এখানে না এলে যেন আনন্দের পূর্ণতা আসে না।’
একই সময়ে নালিতাবাড়ীর মধুটিলা ইকোপার্কেও ছিল দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি। পাহাড়ঘেরা পরিবেশ, বিশুদ্ধ বাতাস ও সবুজ বনভূমির আকর্ষণে প্রতিদিন হাজারো মানুষ সেখানে ভিড় করছেন। ঈদের ছুটিকে ঘিরে মধুটিলার বিভিন্ন স্পটেও ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঝিনাইগাতী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটন এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ টহল জোরদার করা হয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।’
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল-আমীন বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আসছেন। দর্শনার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করতে পারেন এবং কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।’
এদিকে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমে খুশি স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। তাদের মতে, অন্যান্য ঈদের তুলনায় এবার দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে হোটেল-রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান, স্মারকপণ্য বিক্রেতা এবং বিনোদন সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বেচাকেনাও বেড়েছে।
মিনি চিড়িয়াখানার ইজারাদার ফরিদ মিয়া বলেন, ‘পর্যটকদের উপস্থিতি আমাদের ব্যবসায় নতুন গতি এনে দিয়েছে। ঈদের ছুটির শুরু থেকেই ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।’
পর্যটন কেন্দ্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুর রহিম জানান, এবার পর্যটকের সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছেন।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়ি পরিবেশ, বিনোদনের আধুনিক আয়োজন এবং নিরাপদ ভ্রমণ সুবিধার কারণে গজনী অবকাশ পর্যটনকেন্দ্র ও মধুটিলা ইকোপার্ক এখন উত্তরাঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। ঈদের ছুটির বাকি দিনগুলোতেও পর্যটকদের এই ঢল অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।