ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের সামনে রোগীর স্বজনেরা © টিডিসি
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ৯ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় চলতি মে মাসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ জনে। ১৭ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত মোট ৩৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্রে জানা গেছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩৩ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এতে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৭২ জনে। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে ১ হাজার ২১৭ জন শিশু ছাড়পত্র পেয়েছে। বর্তমানে ১২২ জন শিশু বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্র আরো জানা যায়, রোগীর চাপ বাড়ায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। অনেক শিশু গুরুতর অবস্থায় ভর্তি হচ্ছে, যাদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা বেশি দেখা যাচ্ছে। আইসিইউ সংকটের কারণে অনেক শিশুকে প্রয়োজনীয় উন্নত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক ও অভিভাবকরা।
চিকিৎসকদের মতে, হামের পর সবচেয়ে বড় জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া দেখা দিচ্ছে। আক্রান্ত অনেক শিশুর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া এবং হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা তৈরি হচ্ছে, যা মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, হামে আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত কমে যাওয়ায় অন্যান্য সংক্রমণ সহজেই শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে ভর্তি হওয়ার এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই অবস্থার অবনতি ঘটছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো থেকে ৪৭৬টি নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ জেলায় ১২৩ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক শিশু প্রাথমিক পর্যায়ে হাসপাতালে না এসে বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছে অথবা দেরিতে হাসপাতালে আসছে।
চলমান সংকটের পেছনে টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি ও বিলম্বকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, সময়মতো টিকা না পাওয়া কিংবা একাধিকবার টিকাকেন্দ্রে গিয়েও টিকা না পাওয়ার কারণে শিশুদের সঠিক সুরক্ষা নিশ্চিত হয়নি।
হৃদয় মিয়া নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘আমার সন্তানের টিকা নিতে বারবার টিকাকেন্দ্রে গিয়েছি, কিন্তু সময়মতো পাইনি। এক মাসের টিকা আরেক মাসে দেওয়া হয়েছে। এখন সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়েছে।’
আরেক অভিভাবক জানান, টিকাকেন্দ্রে নিয়মিত টিকার সরবরাহ না থাকায় অনেক শিশুর টিকাসূচি বিঘ্নিত হয়েছে।
জেলা ইপিআই স্টোর সূত্রে জানা গেছে, নিউমোনিয়া প্রতিরোধে ব্যবহৃত পিসিভি টিকার দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি রয়েছে। প্রায় এক মাস ধরে জেলায় কোনো পিসিভি টিকার মজুত নেই।
জেলা ইপিআই স্টোরের ইনচার্জ মো. ফারুকুল ইসলাম বলেন, ঢাকাতেও পিসিভি টিকার সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। আগে তিন মাসের টিকা একসঙ্গে পাওয়া যেত, এখন নিয়মিতভাবে সীমিত পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, জেলায় মাসে প্রায় ৩৮ হাজার ৯০০ ডোজ পিসিভি টিকার চাহিদা থাকলেও সরবরাহ তা পূরণ করতে পারছে না।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শিশুর বয়স ৪২ দিন হলে প্রথম ডোজ এবং এরপর ২৮ দিন পর পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ডোজ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা সময়মতো দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
অভিভাবকরা জানান, একাধিকবার টিকাকেন্দ্রে গিয়েও প্রয়োজনীয় টিকা না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহ নগরীর মৃত্যুঞ্জয় স্কুল রোডের বাসিন্দা রাজন রায় বলেন, ‘দুই দিন টিকাকেন্দ্রে গিয়েও সঠিক তথ্য বা টিকা পাচ্ছি না। এতে আমরা চরম দুশ্চিন্তায় আছি।’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন ডা. মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, ‘হামে আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে নিউমোনিয়াসহ নানা জটিলতা দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে টিকাদানে ড্রপআউটের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি কেস আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করলে প্রকৃত কারণ বোঝা যাবে। তবে টিকাদান ব্যবস্থার ঘাটতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’
ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফয়সল আহমেদ বলেন, হামে নিউমোনিয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়, এ কারণেই মৃত্যুহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। টিকাদান ব্যবস্থায় কিছু ঘাটতি ছিল, তবে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকাও পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। বর্তমানে টিকা সরবরাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকা সরবরাহ ও সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার সমন্বয় জরুরি।
এদিকে হামের এই প্রাদুর্ভাবকে কেন্দ্র করে অভিভাবকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।