শাহপরীর দ্বীপ করিডর ও টেকনাফ স্থলবন্দর © সংগৃহীত
নাফ নদের তীরে থেমে গেছে একসময় চাঙ্গা সীমান্ত বাণিজ্যের স্পন্দন। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার প্রভাবে বন্ধ হয়ে পড়েছে টেকনাফ স্থলবন্দর ও শাহপরীর দ্বীপ গবাদি পশু করিডর। ফলে হাজারো শ্রমিক কর্মহীন, ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে এবং সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
সরেজমিনে শাহপরীর দ্বীপ করিডর ও টেকনাফ স্থলবন্দর ঘুরে দেখা গেছে, তিন বছর ধরে বন্ধ থাকা গবাদি পশু করিডরটি এখন কার্যত পরিত্যক্ত। কার্যালয় খোলা থাকলেও নেই কোনো পণ্যবাহী ট্রলার, নেই শ্রমিক বা ব্যবসায়ীদের আনাগোনা। বন্দরের মূল ফটকে কেবল দুজন নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা পরিণত হয় জনশূন্য প্রান্তরে।
করিডর বন্ধ থাকায় বেকার ৩০ হাজার মানুষ
চোরাই পথে গবাদি পশু আমদানি ঠেকাতে ২০০৩ সালে শাহপরীর দ্বীপ গবাদি পশু করিডর চালু করা হয়। এর পরের ১৮ বছরে এই করিডর থেকে সরকার রাজস্ব আয় করেছে প্রায় ৩৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ করিডর আমদানিকারক সমিতির সভাপতি আবদুল্লাহ মনির বলেন, ‘তিন বছর ধরে শত শত দিনমজুর পরিবার এখন দুর্দিনে। অনেক ব্যবসায়ী মায়ানমারে পশু কিনে প্রায় ৩০ কোটি টাকা আটকে পড়ে আছেন। যদি করিডর চালু না হয় তাঁরা পথে বসবেন।’
টেকনাফ স্থলবন্দরের কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৯ মাস ধরে বাণিজ্য বন্ধ থাকায় সরকার ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। বন্দরের গুদামগুলো তালাবদ্ধ। রপ্তানিকৃত পণ্যে পচন ধরেছে। এতে ব্যবসায়ীদের কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।
ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের টেকনাফের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘৯ মাসে আমাদের সরাসরি লোকসান প্রায় তিন কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রায় ১৫ কোটি টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’
স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মুহাম্মদ মানজারুল মান্নান জানান, মাঝেমধ্যে আরাকান আর্মি পণ্যবাহী ট্রলার আটকে দিলেও ব্যবসায়ীরাই সেই সমস্যার সমাধান করেছেন। ব্যবসায়ীদের মতে, পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে এখন আর বড় কোনো বাধা নেই, তবে বিজিবি সংক্রান্ত কিছু বিষয়ে সংকট রয়েছে।
কক্সবাজার বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে বৈধ আমদানি-রপ্তানিতে বিজিবির কোনো বাধা নেই। তবে সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য পণ্যবাহী ট্রলার যাচাই করা হবে। কারণ অতীতে আরাকান আর্মির জন্য অবৈধভাবে সিমেন্ট পাচারের ঘটনা ঘটেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আরাকান আর্মির সঙ্গে কোনো ধরনের লেনদেন গ্রহণযোগ্য নয়।’
টেকনাফ স্থলবন্দরের সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হক বাহাদুর বলেন, ‘আমাদের ব্যবসা মায়ানমার সরকারের সঙ্গে এবং সব আমদানি-রপ্তানি বৈধভাবে হয়।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘টেকনাফ স্থলবন্দর চালুর জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ব্যবসায়ী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে মিয়ানমার থেকে আমদানি-রপ্তানি কখন ও কীভাবে নিরাপদে শুরু করা যাবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। পাশাপাশি শাহপরীর দ্বীপ গবাদি পশুর করিডর চালুর বিষয়েও সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।’