স্ত্রী সারাহ জুকাকুর সঙ্গে প্রথম মুসলিম মার্কিন সিনেটর আবদুল আল সাঈদ © সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইতিহাস গড়েছেন ড. আবদুল রহমান মোহাম্মদ এল সাঈদ (Abdul El-Sayed)। মিশিগান থেকে মার্কিন সিনেটর নির্বাচিত হয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন ৪২ বছর বয়সী এই রাজনীতিক। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষিত, অক্সফোর্ডের রোডস স্কলার এবং প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচিত এল সাঈদের এই বিজয় মার্কিন রাজনীতিতে নতুন এক রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে।
৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ও সাবেক কংগ্রেসম্যান মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন তিনি। এর আগে গত ৪ আগস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে কংগ্রেসওম্যান হ্যালি স্টিভেন্সকে হারিয়ে দলের মনোনয়ন নিশ্চিত করেন এল সাঈদ। তাঁর এই জয় ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল ধারার জন্যও বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৪ নভেম্বর প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, এল সাঈদ প্রায় ৫২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স পেয়েছেন প্রায় ৪৬ শতাংশ। এই জয় শুধু একজন মুসলিম রাজনীতিকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল ধারার জন্যও বড় রাজনৈতিক সাফল্য।
মিশিগানেই জন্ম, মিশরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান
১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আবদুল এল সাঈদ মিশরীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান। তাঁর বাবা মোহাম্মদ এল সাঈদ উচ্চশিক্ষার জন্য মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। পেশায় তিনি একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তাঁর মা ফাতেন এল কোমি ছিলেন নার্স। শৈশবেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। পরে বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী জ্যাকির কাছে বড় হন এল সাঈদ।
ছাত্রজীবন থেকেই অত্যন্ত মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। হাইস্কুলে ফুটবল, রেসলিং ও ল্যাক্রোস—তিনটি খেলায় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে জীববিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করেন। সেখান থেকে সর্বোচ্চ সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
অক্সফোর্ডের রোডস স্কলার, কলম্বিয়ার চিকিৎসক
এল সাঈদের শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর একটি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাপূর্ণ রোডস স্কলারশিপ। এ বৃত্তি নিয়ে তিনি অক্সফোর্ডে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চতর গবেষণা ও ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমডি ডিগ্রি নেন। কলম্বিয়ায় তাঁর চিকিৎসাবিজ্ঞানের পড়াশোনায় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের অর্থায়নও ছিল।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করলেও হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা পেশায় না গিয়ে জনস্বাস্থ্য গবেষণা ও নীতিনির্ধারণকে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন তিনি। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইলম্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথে এপিডেমিওলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যবৈষম্য ও স্বাস্থ্যনীতি নিয়ে তাঁর শতাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।
স্বাস্থ্য প্রশাসক থেকে রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে
২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ডেট্রয়েট শহরের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এল সাঈদ। দেউলিয়া পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানো ডেট্রয়েটের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন এবং স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওয়েন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানব ও ভেটেরান্স সেবা বিভাগের পরিচালক ছিলেন। এ দায়িত্বে প্রায় ১৮ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবাসংক্রান্ত কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, স্কুলে সিসার দূষণ মোকাবিলা, ওষুধের সহজলভ্যতা এবং চিকিৎসা ব্যয় কমানোর মতো বিষয়গুলো তাঁর প্রশাসনিক কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
এর আগে ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন চেয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এল সাঈদ। তবে সে নির্বাচনে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হন। আট বছর পর সেই মিশিগান থেকেই এবার মার্কিন সিনেটে যাওয়ার পথ তৈরি করলেন তিনি।
স্ত্রী সারাহর পরিবারে কর্ণাটকের শিকড়
এল সাঈদের ব্যক্তিগত জীবনও বহুজাতিক সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন। তাঁর স্ত্রী ডা. সারাহ জুকাকু একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। সারাহর পরিবারের শিকড় ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের ভাটকাল অঞ্চলে। তাঁর বাবা ডা. তাইয়েব জুকাকু একজন কিডনি বিশেষজ্ঞ। উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত কারণে তাঁর পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে বসতি গড়ে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় এল সাঈদের সঙ্গে সারাহর পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০০৬ সালের মে মাসে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে দুই কন্যা—এমিলি ও সেরেন। বর্তমানে তাঁরা মিশিগানের অ্যান আরবারে বসবাস করছেন।
অর্থাৎ, মিশরীয় অভিবাসী বাবার সন্তান এল সাঈদের পারিবারিক জীবনে যুক্ত হয়েছে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের ঐতিহ্যও। তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়ের এই বহুমাত্রিকতা যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক সমাজের একটি প্রতিফলন।
প্রগতিশীল রাজনীতি ও বার্নি স্যান্ডার্সের সমর্থন
ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল ধারার রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত এল সাঈদ। তাঁর নির্বাচনী প্রচারের মূল প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে ছিল সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ব্যয় কমানো, আবাসনকে সাশ্রয়ী করা, করপোরেট অর্থের রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং ধনীদের সম্পদের ওপর ন্যায্য কর আরোপ।
বিশেষ করে ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ কর্মসূচির মাধ্যমে সব নাগরিকের জন্য সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। রাজনীতিতে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও বিলিয়নিয়ারদের অর্থের প্রভাব কমানোর বিষয়টিও তাঁর প্রচারের অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল।
তাঁর প্রার্থিতার পক্ষে সরব ছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রভাবশালী প্রগতিশীল নেতা ও সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স। সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন, কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজসহ প্রগতিশীল ধারার আরও অনেক নেতা তাঁর প্রতি সমর্থন জানান। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তাঁর পক্ষে নির্বাচনী বিজ্ঞাপন প্রচার করেন এবং ২৪ অক্টোবর ডেট্রয়েটে নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নিয়ে তাঁর পক্ষে প্রচার চালান।
এল সাঈদের প্রচারের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল করপোরেট রাজনৈতিক অনুদান প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ মানুষের ছোট অঙ্কের অনুদান ও তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনের ওপর নির্ভরতা।
ট্রাম্পের সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে জয়
নির্বাচনে এল সাঈদের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক কংগ্রেসম্যান ও এফবিআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা মাইক রজার্স। রিপাবলিকান দলের মনোনীত এই প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জাতীয় পর্যায়ের রিপাবলিকান নেতাদের সমর্থন পেয়েছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারে এল সাঈদের ধর্মীয় পরিচয়, রাজনৈতিক অবস্থান এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে কথিত সম্পর্কের অভিযোগও তোলা হয়েছিল। এল সাঈদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযোগগুলোর পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণও উপস্থাপিত হয়নি। ডেমোক্র্যাট নেতারা এসব আক্রমণকে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা হিসেবে সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করেও আলোচনায় ছিলেন এল সাঈদ। নির্বাচনে অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয়তা হ্রাসের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কি সম্ভাবনা তৈরি হলো?
মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে এল সাঈদের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একজন মুসলিম, মিশরীয় বংশোদ্ভূত এবং প্রগতিশীল রাজনীতিক হিসেবে তাঁর এই উত্থান ডেমোক্রেটিক পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
বিশেষ করে তরুণ ভোটার, অভিবাসী পরিবার, শ্রমজীবী মানুষ এবং স্বাস্থ্যসেবার অধিকারের পক্ষে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী হবেন কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম পরিচয় নিয়ে নানা বিতর্ক ও বৈষম্যমূলক প্রচারণার মধ্যেও নির্বাচনী বিজয় অর্জন করে এল সাঈদ নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন। তাঁর এই বিজয় আমেরিকার বহুজাতিক ও বহুধর্মীয় গণতান্ত্রিক সমাজে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।