মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প © সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন দেশটির ভোটাররা। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস থাকলেও শেষ পর্যন্ত মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে এই ফলকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগামী জানুয়ারি থেকে কংগ্রেসের নতুন অধিবেশন শুরু হলে ক্ষমতার এই পালাবদল ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেবে। এতদিন রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসের দুই কক্ষেই এখন নেতৃত্ব দেবে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে আইন প্রণয়ন, সরকারি বাজেট অনুমোদন, প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের তদন্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।
নির্বাচনের ফল অনুযায়ী, সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদেও প্রয়োজনীয় ২১৮ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ক্যানসাস, টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো অঙ্গরাজ্যেও ডেমোক্র্যাটদের গুরুত্বপূর্ণ জয় এসেছে।
নির্বাচনে জর্জিয়ার গভর্নর পদেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কিশা ল্যান্স বটমস। এর মধ্য দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। বুথফেরত জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ ভোটার কংগ্রেসের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর আরও কঠোর নজরদারি চান।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলের অর্থ কী
মার্কিন শাসনব্যবস্থায় কংগ্রেস দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী সংস্থা। এর দুটি কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ। নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় আইন প্রণয়ন ও সরকারি কার্যক্রমে দলটির প্রভাব বাড়বে। এতদিন রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন প্রস্তাব ও নীতি বাস্তবায়নে কংগ্রেসে তুলনামূলক কম বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এখন ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ছাড়া নতুন আইন পাস বা বাজেট অনুমোদন করা কঠিন হবে। বিশেষ করে সরকারি ব্যয় ও অর্থ বরাদ্দসংক্রান্ত বিল প্রতিনিধি পরিষদে উত্থাপিত হয়। ফলে বাজেট প্রক্রিয়ায় ডেমোক্র্যাটদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে।
এ ছাড়া কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্ব ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি বাড়বে। এসব কমিটি প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, নীতি ও কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত করতে পারবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যক্তিদের তলব করতে এবং নথিপত্র চেয়ে পাঠাতে পারবে।
কেন ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা
মার্কিন রাজনৈতিক পরিভাষায় প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ দিকে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে চলে যাওয়ার পরিস্থিতিকে ‘লেম ডাক’ বলা হয়। এর অর্থ, প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় থাকলেও আইন প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়নে তার রাজনৈতিক প্রভাব অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসনের বাজেট ও অর্থ বরাদ্দসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোতে বিরোধী দলের সমর্থন প্রয়োজন হবে। একইভাবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ থাকায় প্রেসিডেন্টের মনোনীত বিচারক, রাষ্ট্রদূত ও গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল কর্মকর্তাদের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটদের ভূমিকা বাড়বে। ফলে এসব নিয়োগে বাধা বা বিলম্ব তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি, নির্বাহী আদেশ, করনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের সুযোগ পাবে ডেমোক্র্যাটরা। কংগ্রেসের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনকে বিভিন্ন বিষয়ে জবাবদিহির মুখোমুখি করা সম্ভব হবে।
আইন পাসে অচলাবস্থার আশঙ্কা
নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের পছন্দের বিল কংগ্রেসের দুই কক্ষে পাস করে প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠাতে পারবে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোনো বিলে সম্মতি না দিলে ভেটো প্রয়োগ করতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে কংগ্রেসের দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন ছাড়া সেই ভেটো অতিক্রম করা সম্ভব হবে না। ফলে প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হলে আইন প্রণয়নের গতি কমে যেতে পারে। বাজেট, অভিবাসন, করনীতি, সামরিক ব্যয় ও বৈদেশিক সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই পক্ষের সমঝোতা না হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচনের ফল নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর প্রাথমিকভাবে হতাশা প্রকাশ করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তিনি সরাসরি ব্যালট পেপারে না থাকায় রিপাবলিকানদের এই ফলের মুখে পড়তে হয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের সময় রক্ষণশীল গণমাধ্যম ফক্স নিউজের কভারেজ ও বুথফেরত জরিপ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
তবে পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানান ট্রাম্প। সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন। দেশের কল্যাণে তাদের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছি।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানরা জিতত।
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ডেমোক্র্যাটরা এমন কোনো বিল পাঠালে, যা তার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হবে, তিনি তাতে ভেটো দেবেন। তবে বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। বিশেষ করে প্রশাসনের নীতি বাস্তবায়ন, বাজেট অনুমোদন, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তদন্তে বিরোধী দলের ভূমিকা বাড়বে। ফলে ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছর ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক দর-কষাকষি ও মতবিরোধের মধ্য দিয়ে এগোনোর সম্ভাবনা রয়েছে। সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, বিবিসি ও সিবিএস নিউজ।