দুই ট্রেনের সংঘর্ষে ৬৮ জন নিহত হয়েছেন © সংগৃহীত
স্পেনের মধ্যাঞ্চলে দুই দ্রুতগতির ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৭৩ জন, আহতদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা গুরুতর। এ ঘটনায় তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। খবর গার্ডিয়ানের
বুধবার (২৮ অক্টোবর) স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ থেকে সেভিল যাওয়ার রেলপথে একই দিকে চলাচলকারী দুটি ট্রেনের মধ্যে এ সংঘর্ষ ঘটে। একটি ট্রেন থেমে থাকার সময় পেছন থেকে আসা অন্য ট্রেনটি সেটির শেষ অংশে ধাক্কা দেয়। এতে কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়।
চলতি বছরে স্পেনে এটি দ্বিতীয় প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনা। মধ্যাঞ্চলীয় কাস্তিয়া-লা মাঞ্চা অঞ্চলে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, ‘পুরো স্পেন শোকাহত। স্পেনের মতো একটি দেশের একই বছরে দুটি দ্রুতগতির ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।’
আঞ্চলিক টেলিভিশন চ্যানেল সিএমএম টিভিতে সম্প্রচারিত ভিডিওতে লাইনচ্যুত একটি ট্রেনের অন্তত একটি বগিকে উঁচু রেলপথের ওপর আটকে থাকতে দেখা যায়। রেলপথের নিচের ঢালু জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল দুমড়েমুচড়ে যাওয়া ধাতব অংশ, ভাঙা প্যানেল ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন সরঞ্জাম।
সাংবাদিকদের স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে বলেন, এ ধরনের পেছন থেকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক’। তার ধারণা, ‘ব্যাখ্যাতীত’ পরিস্থিতিতে মানুষের ভুলের কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে।
তিনি জানান, সামনের রেলপথে অন্য ট্রেন থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেন থামিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে এলজেডবি সিগন্যালিং সিস্টেমে। তবে কম্পিউটারের ত্রুটির কারণে স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে সিস্টেমটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার রেলপথজুড়ে আনুমানিক ছয়টি ট্রেন থেমে যায়।
এরপর রেলপথ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পড়ে মাদ্রিদে অবস্থিত ২৪ ঘণ্টা চালু থাকা একটি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের ওপর। পরিবহনমন্ত্রী জানান, লাইনে তখনও ‘থামার সংকেত’ বহাল থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রটি অন্তত দুটি ট্রেনকে স্বাভাবিকভাবে চলাচল শুরু করার নির্দেশ দেয়।
পুয়েন্তে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কর্মীরাই ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। আমাদের দৃষ্টিতে, যে পরিস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা ব্যাখ্যাতীত।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্পষ্টতই এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। আমি কাউকে দায়ী করছি না, শুধু ঘটনাগুলো তুলে ধরছি।’
কাস্তিয়া-লা মাঞ্চার আঞ্চলিক সরকার বুধবার বিকেলে জানায়, দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৮ হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা তখনও লাইনচ্যুত বগিগুলোর ধ্বংসাবশেষের মধ্যে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন। অঞ্চলটির প্রধান এমিলিয়ানো গার্সিয়া-পাখে সাংবাদিকদের বলেন, আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, ‘এখনও বগিগুলোর নিচের অংশে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।’
দুর্ঘটনায় আহত আরও ৭৩ জনকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা গুরুতর বলে জানান তিনি। দুর্ঘটনার সময় একটি ট্রেনের পেছনের বগিতে কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে ভ্রমণ করছিলেন মিগেল নামের এক যাত্রী। স্পেনের কোপে রেডিওকে তিনি দুর্ঘটনার মুহূর্তের বর্ণনা দেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পাই। প্রায় ১০ সেকেন্ড ধরে চলা ভয়াবহ একটি ধাক্কা ছিল সেটি। মনে হচ্ছিল, ট্রেনটি লাইনচ্যুত হতে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডান পাশের জানালা দিয়ে আমরা একটি বিধ্বস্ত ট্রেন দেখতে পাই। আমার ধারণা, সেটি অন্য ট্রেনটি ছিল।’
বুধবার পরিবহনমন্ত্রী নিশ্চিত করেন, দুর্ঘটনায় স্পেনের রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা রেনফে এবং বেসরকারি রেল সংস্থা ইরিওর ট্রেন জড়িত ছিল। গত জানুয়ারিতে আদামুজ এলাকায় ঘটে যাওয়া আরেকটি ট্রেন দুর্ঘটনাতেও এই দুই প্রতিষ্ঠানের ট্রেন জড়িত ছিল। ওই দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত হয়েছিলেন।
বুধবারের দুর্ঘটনায় ইরিওর ট্রেনটি সামনে চলছিল এবং একপর্যায়ে থেমে ছিল। এ সময় নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে রেনফের ট্রেনটিকে পুনরায় যাত্রা শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর রেনফের ট্রেনটি প্রায় ২৫ কিলোমিটার চলার পর প্রায় ১৭ মিনিটের মাথায় ইরিওর ট্রেনটিকে ধাক্কা দেয়।
রেনফের ট্রেনটি কত গতিতে চলছিল, তা এখনও জানা যায়নি বলে জানান পরিবহনমন্ত্রী। তবে ওই রেলপথে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচলের অনুমতি রয়েছে।
পুয়েন্তে জানান, বুধবার সকালে অন্তত আরও একটি ট্রেনকে একই ধরনের ভুল নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে একটি ট্রেনের চালক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের নির্দেশ সংশোধন করে জানান, তিনি স্বাভাবিক গতিতে চলাচল শুরু করতে পারবেন না। এর পরিবর্তে তাঁকে সামনের রেলপথ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে ধীরে চলতে হবে।
এ পদ্ধতিতে ট্রেন চালককে অনেক কম গতিতে এগোতে হয়, যাতে সামনের লাইনে অন্য কোনো ট্রেন থেমে আছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়। পুয়েন্তে বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের কর্মী বলেছিলেন, ঠিক আছে, সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে চলুন।’
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ জানান, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। তদন্তে নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটি কিংবা অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ঘাটতিগুলোর বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ কঠোরতার’ সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, বুধবারের দুর্ঘটনা ও জানুয়ারির দুর্ঘটনার কারণ সম্পূর্ণ আলাদা। তবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়িত্ব আমার নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দ্রুতগতির রেলব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করার প্রয়োজন হলে তা অবশ্যই করা হবে।’
আগামী মাসের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে স্পেনের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বুধবারের জন্য নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত করেছে। এদিকে স্পেনের ফুটবল ফেডারেশন বুধবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকা কোপা দেল রে টুর্নামেন্টের ২৪টি ম্যাচ স্থগিত করেছে।
বিরোধী দল পিপলস পার্টির নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইহো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘নতুন একটি রেল দুর্ঘটনার বিষয়ে যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা নিয়ে আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই মুহূর্তে অগ্রাধিকার হলো দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের পরিবারকে সহায়তা দেওয়া। ঘটনাস্থলে কাজ করা জরুরি সেবাকর্মীদের প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।’