মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প © সংগৃহীত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সাবেক মডেল ও মিস সুইজারল্যান্ড বিয়াত্রিস কিউলকে ধর্ষণের অভিযোগ এবং জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে তার কথিত সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিউল অভিযোগ করেছেন, ১৯৯৩ সালে নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে ট্রাম্প তাকে ধর্ষণ করেন। এদিকে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে এমন সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান ও রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারে বিষয়টি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে প্রতিবেদনটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে হোয়াইট হাউস।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বিচার বিভাগবিষয়ক কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এপস্টেইনের সঙ্গে ট্রাম্পের কথিত সম্পর্ক এবং যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে একাধিক নারীর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে পাঁচজন নারীর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট কর্মীদের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরে সাক্ষাৎকারে কিউল দাবি করেন, ১৯৯৩ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কের প্লাজা হোটেলে একটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাসংক্রান্ত অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তখন তার বয়স ছিল ২৪ বছর। সে সময় হোটেলটির মালিক ছিলেন ট্রাম্প। কিউলের দাবি, ট্রাম্প তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার ব্যবস্থা এবং নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে (এনওয়াইইউ) ভর্তির সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। প্রতিবেদনে তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তাকে বলেছিলেন, ‘আমি তোমার দেখাশোনা করব।’
কিউলের অভিযোগ, ট্রাম্পের সঙ্গে কথোপকথন শেষ হওয়ার পরপরই এপস্টেইন তার কাছে আসেন। এপস্টেইন নিজেকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচয় দেন এবং মার-আ-লাগোতে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরে ট্রাম্পের এক প্রতিনিধি কিউলকে প্লাজা হোটেলের ওপরের তলায় ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে যাওয়ার পর ট্রাম্প তাকে পেছন থেকে ধরে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। এতে তার পোশাক ছিঁড়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তপাত ও কালশিটে পড়ে।
কিউলের ঘটনাটিকে ‘নিষ্ঠুর’ বলেছেন। তিনি আরও দাবি করেছেন, ঘটনার পর ট্রাম্প তাকে বিছানার কিনারায় বসান এবং ভিসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আশ্বাস পুনরায় দেন। পাশাপাশি তাকে নীরব থাকার প্রতিশ্রুতি দিতে বলেন। প্রতিবেদনে ট্রাম্পের কথিত বক্তব্য হিসেবে ‘শো চলতেই হবে’ কথাটিও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ডেইলি মেইল-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিউল ওই ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন বর্ণনা দিয়েছিলেন।
ওই সময় তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ট্রাম্প তাঁকে ঠোঁটে ও ঘাড়ে চুমু দিয়েছিলেন, পোশাক তোলার চেষ্টা করেছিলেন এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করেছিলেন। তবে তার বাধার মুখে ঘটনা আর এগোয়নি বলে দাবি করেছিলেন তিনি। নতুন প্রতিবেদনে তিনি একই ঘটনার বিষয়ে ধর্ষণের অভিযোগ তুলেছেন। আগের বক্তব্যের সঙ্গে নতুন বর্ণনার এই পার্থক্যের কারণ প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।
অভিযোগ প্রত্যাখ্যান হোয়াইট হাউসের
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে হোয়াইট হাউস। এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটদের প্রতিবেদনটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রেসিডেন্টের অর্জন থেকে মার্কিন জনগণের মনোযোগ সরানোর চেষ্টা। অভিযোগগুলোকে ‘উন্মত্ত ডেমোক্র্যাটদের মরিয়া প্রচেষ্টা’ বলে বর্ণনা করেছেন এই মুখপাত্র। তার দাবি, এপস্টেইন-সংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাম্পকে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণ করা হয়েছে।
ট্রাম্পও এপস্টেইনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার দাবি, এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হওয়ার অনেক আগেই তাদের বন্ধুত্বের অবসান ঘটেছিল। ট্রাম্প আরও বলেছেন, এপস্টেইনকে তিনি নিজের মার-আ-লাগো ক্লাব থেকে বের করে দিয়েছিলেন। এর আগে ২০২৪ সালে কিউলের অভিযোগ সামনে আসার পর ট্রাম্পের তৎকালীন প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট অভিযোগগুলোকে ‘ভুয়া’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
এপস্টেইন-সংযোগ নিয়ে তদন্তের দাবি
ডেমোক্র্যাটদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে কিউলের পাশাপাশি আরও কয়েকজন নারীর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, এপস্টেইন ও তার সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েলের মাধ্যমে কিছু নারীকে ট্রাম্পের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে প্লাজা হোটেলে আয়োজিত সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার পরিবেশকে তরুণী ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা নারীদের লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় প্রতিনিধি পরিষদের বিচার বিভাগবিষয়ক কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য জেমি রাসকিন অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্পের বিচার বিভাগ এপস্টেইন-সংক্রান্ত অপরাধের তথ্য গোপন করছে। তিনি এ বিষয়ে আরও তদন্তের দাবি জানান। তবে বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে আনা গোপন করার অভিযোগ ডেমোক্র্যাটদের বক্তব্য।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক চাপ
আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এ নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে ব্যালটে না থাকলেও তার প্রশাসনের কার্যক্রম, এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ, মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণের নতুন অভিযোগ প্রকাশ এবং এপস্টেইন-সংক্রান্ত তদন্ত নিয়ে বিতর্ক রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ ও বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রতিবেদনে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয়টিও রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ইস্যু নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। তবে নতুন অভিযোগগুলোর নির্বাচনী ফলাফলে কী প্রভাব পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। অভিযোগগুলোর সত্যতা, হোয়াইট হাউসের জবাব এবং এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে পরবর্তী তদন্ত সবকিছুই মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মার্কিন রাজনীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে।